Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

ট্রাম্পের সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

Icon

আহবাব চৌধুরী খোকন

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ট্রাম্পের সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

Advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে এসেছে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম ব্যালটে না থাকলেও নির্বাচনের ফলাফলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের প্রতি ভোটারদের সমর্থন নেই। এ নির্বাচনে ট্রাম্প নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকানদের বহু ঘাঁটিতেও জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। এর মধ্য দিয়ে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাল। ফলে প্রেসিডেন্ট হিসাবে ট্রাম্পের জন্য বাকি দুই বছর দেশ পরিচালনা করা খুব কঠিন হবে।

গত ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ-দুই জায়গাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ডেমোক্র্যাটরা। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, রিপাবলিকানদের দখলে থাকা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন বিরোধী দলের প্রার্থীরা। এ ফলাফল শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যার পরিবর্তন নয়, বরং ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি জনসমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসাবেও বিবেচিত হচ্ছে।

নির্বাচনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, যেসব অঙ্গরাজ্যকে এতদিন রিপাবলিকানদের নিরাপদ নির্বাচনি এলাকা হিসাবে বিবেচনা করা হতো, সেসব এলাকাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। টেক্সাসে কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস ট্যালারিকো। কানসাসে রজার মার্শালকে হারিয়েছেন অ্যাডাম হ্যামিল্টন। ওহাইওতে জয় পেয়েছেন ডেমক্র্যাট প্রার্থী শেরড ব্রাউন। সাউথ ক্যারোলাইনাতেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট অ্যানি অ্যান্ড্র–জ। এসব আসনে দীর্ঘদিন ধরে বিপাবলিকান পার্টি নেতৃত্ব দিয়েছে। এছাড়া মেইনে সুসান কলিন্সকে হারিয়ে জয় পেয়েছে ট্রয় জ্যাকসন। আইওয়ায় অ্যাশলি হিনসনকে পরাজিত করেছেন জশ টুরেক। নর্থ ক্যারোলাইনায় সাবেক গভর্নর রয় কুপারের জয়ও ডেমোক্র্যাটদের জন্য বড় অর্জন। এসব রাজ্যে রিপাবলিকানদের পরাজয় দলটির নির্বাচনি ভিত্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

মিশিগানের ফলাফলও বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করছে। রিপাবলিকান মাইক রজার্সকে পরাজিত করে সিনেট আসনটি নিজেদের করে নিয়েছেন ডেমোক্র্যাট আবদুল এল সায়েদ। মিশরীয় অভিবাসী এল সায়েদের এ জয় মার্কিন রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তার নির্বাচিত হওয়া দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

নির্বাচনি ফলাফলে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে তরুণ ও হিস্পানিক ভোটারদের অবস্থান থেকে। আগের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে যেসব ভোটারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সমর্থন জানিয়েছিল, এবার তাদের অনেকে রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রতি আগের মতো আস্থা রাখতে পারেননি। ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, সরকারের কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা ভোটারদের সিদ্ধান্তে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে বলে নির্বাচনি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

এ ফলাফল ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার জন্যও একটি বড় পরীক্ষা। নির্বাচনি প্রচারে তার সক্রিয় ভূমিকা এবং রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রতি সমর্থন থাকা সত্ত্বেও দলটি প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেনি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে যে জনসমর্থনের ভিত্তিতে তিনি হোয়াইট হাউজে ফিরেছিলেন, সেই সমর্থন কতটা স্থায়ী রয়েছে?

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে আইন প্রণয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্টের মনোনীত বিচারপতি এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদের প্রার্থীদের অনুমোদন আটকে দেওয়ার সুযোগ পাবে। একইসঙ্গে বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি জোরদার করতে পারবে তারা।

অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর জবাবদিহির চাপ বাড়বে। কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটি সরকারি নথি তলব, কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত পরিচালনা করতে পারবে। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিনির্ধারণ, সরকারি ব্যয় এবং প্রেসিডেন্টের পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়েও নতুন করে অনুসন্ধানের উদ্যোগ আসতে পারে।

প্রতিনিধি পরিষদের নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিস স্পিকার নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হওয়ার সুযোগ পাবেন। তার নেতৃত্বে প্রতিনিধি পরিষদের কমিটি, শুনানি ও আইন প্রণয়নের অগ্রাধিকার নির্ধারণে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়বে। তবে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই ডেমোক্র্যাটরা সব ক্ষেত্রে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারবে, এমন নয়। প্রেসিডেন্ট হিসাবে ট্রাম্পের হাতে এখনো ভেটো প্রয়োগ এবং নির্বাহী আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। ফলে কংগ্রেসে পাশ হওয়া বিরোধীদের কোনো আইন আটকে দিতে পারবেন তিনি। আবার গুরুত্বপূর্ণ বাজেট ও সরকারি অর্থায়ন নিয়ে দুই পক্ষের মতবিরোধ দেখা দিলে প্রশাসনিক অচলাবস্থার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এনেছে। এতদিন কংগ্রেসে নিজ দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবিধা নিয়ে ট্রাম্প যেভাবে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি এগিয়ে নিচ্ছিলেন, এখন সেই পথ অনেকটাই কঠিন হয়ে উঠবে। বিরোধীদের নজরদারি, তদন্ত এবং আইন প্রণয়নের প্রতিরোধের মুখে তাকে নতুন রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে হতে পারে।

নির্বাচনের এ ফলাফল তাই শুধু ডেমোক্র্যাটদের জয় নয়, বরং ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। হোয়াইট হাউসের ক্ষমতা ধরে রাখলেও আইনসভার নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর সংকুচিত হবে। মেয়াদের বাকি দুই বছর ট্রাম্প প্রশাসন কতটা কার্যকরভাবে এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, সেটিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

আহবাব চৌধুরী খোকন : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

অর্থ কি আসলেই অনর্থের মূল

অর্থ কি আসলেই অনর্থের মূল

৭ নভেম্বর : এক অবিস্মরণীয় বিপ্লব

৭ নভেম্বর : এক অবিস্মরণীয় বিপ্লব

ট্রাম্পের সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

ট্রাম্পের সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

নিউইয়র্কের চিঠি ট্রাম্পের প্রতি আমেরিকান ভোটারদের অনাস্থা

ট্রাম্পের প্রতি আমেরিকান ভোটারদের অনাস্থা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম