Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

৭ নভেম্বর : এক অবিস্মরণীয় বিপ্লব

Icon

সৈয়দ আবদাল আহমদ

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

৭ নভেম্বর : এক অবিস্মরণীয় বিপ্লব

সংগৃহীত ছবি

Advertisement

রাতের ঢাকা তখন নিথর, স্তব্ধ। বাতাসে এক অদ্ভুত ভারী নিশ্বাস। চারদিকে এক শ্বাসরুদ্ধকর অনিশ্চয়তা। সিপাহিদের ব্যারাকে ব্যারাকে তখন ক্ষোভের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে। বন্দি রাখা হয়েছে স্বাধীনতার ঘোষক, সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। মনে হচ্ছিল, ১৯৭১ সালের যে স্বাধীনতা আমরা কোটি প্রাণের বিনিময়ে অর্জন করেছি, তা বুঝি এক গভীর ষড়যন্ত্রের কুয়াশায় হারিয়ে যেতে বসেছে। সার্বভৌমত্ব কি তবে আজ বিপন্ন?

ঘড়ির কাঁটায় রাত তখন বারোটা। আর ঠিক তখনই যেন গর্জে উঠল ঢাকা সেনানিবাস। সিপাহিদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ রূপ নিল এক দাবানলে। ৬ নভেম্বর দিবাগত রাতের সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে গেল হাজারো বুটের আওয়াজ আর স্লোগানে। গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করা হলো বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে।

ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে বাংলাদেশের কোটি মানুষ সাক্ষী ইতিহাসের অভূতপূর্ব, অবিশ্বাস্য এক জাগরণের ঐতিহাসিক সিপাহি-জনতার বিপ্লব।

সেনানিবাস থেকে রাজপথ : এক অবিস্মরণীয় স্রোত

ভোর হওয়ার আগেই সেনানিবাসের লোহার গেট ভেঙে রাস্তায় নেমে এলো সাঁজোয়াযান, ট্যাংক আর ট্রাক। কিন্তু এবার কোনো ভীতি নয়, কোনো কারফিউর থমথমে পরিবেশ নয়; ট্যাংকের ওপর বসা সিপাহিদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্লোগান দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। ঘুমন্ত ঢাকা শহর এক নিমেষে জেগে উঠল। চারদিকে শুধু একটাই আওয়াজ-‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’।

পিলখানা থেকে বিডিআর, রাজারবাগ থেকে পুলিশ, আর মেহনতি জনতার ঢল এসে মিশে গেল রাজপথে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, বুড়িগঙ্গার মাঝি, চকবাজারের ব্যবসায়ী-সবাই যেন এক মোহনায় এসে দাঁড়াল। অচেনা দুজন মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে, আনন্দাশ্রু মুছছে। কারণ সবাই বুঝতে পেরেছে, দেশের বিরুদ্ধে যে অশুভ ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হয়েছিল, তা এই একাত্মতায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।

বেতারের সেই জাদুকরী কণ্ঠ : ‘আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি...’

সকালে তখন মাত্র আলো ফুটছে। সারা দেশের মানুষ রেডিওর সামনে কান পেতে বসে আছে। হঠাৎ ইথারে ভেসে এলো সেই পরিচিত, গমগমে, ম্যাজিক ছড়ানো কণ্ঠস্বর। ১৯৭১ সালের সেই কালরাত্রির পর, যে কণ্ঠ দিশেহারা মানুষের মনে আশার আলো সঞ্চার করেছিল, ১৯৭৫-এর এই সংকটক্ষণে আবারও সেই কণ্ঠ। রেডিওর স্পিকার থেকে যেন বিদ্যুৎ ছড়িয়ে পড়ল প্রতিটি বাঙালির শিরায় শিরায় :

‘প্রিয় দেশবাসী,

আসসালামু আলাইকুম।

আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি,

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জনগণ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিডিআর, police (পুলিশ), আনসার এবং অন্যান্যদের অনুরোধে আমাকে সাময়িকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ও সেনাবাহিনী প্রধান হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়েছে। এই দায়িত্ব ইনশাআল্লাহ আমি সুষ্ঠুভাবে পালন করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব।

আপনারা সকলে peaceful-ভাবে (শান্তিপূর্ণভাবে) যথাস্থানে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করুন। দেশের সর্বত্র অফিস, আদালত, যানবাহন, বিমানবন্দর, মিল-কারখানাগুলো পূর্ণভাবে চালু থাকবে।

আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হোন।

খোদা হাফেজ

বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।’

এই একটি ঘোষণায় যেন সারা দেশে স্বস্তির হাওয়া বয়ে গেল। মানুষ বুঝতে পারল, দেশ এখন নিরাপদ হাতে। ষড়যন্ত্রকারীদের কালো হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে।

অপরাহ্নের আলো : বিজয়ের পূর্ণতা

দুপুরের পর ঢাকার রাস্তাগুলোয় মানুষের ঢল আরও দ্বিগুণ হলো। ট্যাংকের নলে পরিয়ে দেওয়া হয়েছে গাঁদা ফুলের মালা। সিপাহিরা সাধারণ মানুষকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে, জনতা সিপাহিদের মাথায় তুলে নাচছে। রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে এই জাগরণের ঢেউ ততক্ষণে পৌঁছে গেছে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেটসহ দেশের প্রতিটি প্রান্তে। গ্রামীণ জনপদের মানুষ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পাহারায় নেমে গেছে।

বিকালের মৃদু আলোয় রেডিওতে আবারও ভেসে এলো মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের কণ্ঠ। এবার তার কণ্ঠে ছিল কৃতজ্ঞতা, শৃঙ্খলা আর আগামীর প্রত্যয় :

‘প্রিয় দেশবাসী,

আসসালামু আলাইকুম,

বাংলাদেশের জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে ও নিরাপত্তা বিধানে অংশগ্রহণকারী সেনা, নৌ, বিমান, বিডিআর, police (পুলিশ), আনসার বাহিনীর ভাইদের এবং মুক্তিযোদ্ধা ও প্রাক্তন সৈনিকদের আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। সশস্ত্র বাহিনীর ভাইদের স্ব স্ব কর্মস্থলে প্রত্যাবর্তনের জন্য আমি অনুরোধ করছি।

মহত্তর উদ্দেশ্য সাধনে সর্বান্তঃকরণে সমর্থন জ্ঞাপনের জন্য এবং আল্লাহতালার উপর অবিচল আস্থা স্থাপনের জন্য আমি দেশপ্রেমিক জনসাধারণের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

আল্লাহতায়ালা আমাদের সকলের সহায় হোন।

খোদা হাফেজ

বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।’

ইতিহাসের দায়মুক্তি

৭ নভেম্বরের সেই দিনটি শুধু একটি সামরিক বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ছিল না। এটি বাংলাদেশের মানুষের আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতা রক্ষার দিন হিসাবে চিহ্নিত হলো। ষড়যন্ত্রকারীরা ভেবেছিল বন্দি জিয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের ভাগ্যকেও তারা বন্দি করে ফেলবে। কিন্তু সিপাহি ও জনতার সেই ইস্পাতকঠিন ঐক্য প্রমাণ করে দিল-এ দেশের স্বাধীনতা কোনো ঠুনকো বিষয় নয়।

আজ ৫১ বছর পরও, যখনই সেই দিনটির কথা মনে পড়ে, চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফুল ছিটানো সেই রাজপথ, ট্যাংকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা উৎফুল্ল সিপাহি আর সাধারণ মানুষের সেই আকাশ ফাটানো স্লোগান। ৭ নভেম্বর শিখিয়েছে-সংকটে, ষড়যন্ত্রে কীভাবে এক হয়ে রুখে দাঁড়াতে হয়। এটি সার্বভৌমত্বের এক অবিনাশী স্মারক।

সৈয়দ আবদাল আহমদ : প্রধান তথ্য কর্মকর্তা, সিনিয়র সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

অর্থ কি আসলেই অনর্থের মূল

অর্থ কি আসলেই অনর্থের মূল

৭ নভেম্বর : এক অবিস্মরণীয় বিপ্লব

৭ নভেম্বর : এক অবিস্মরণীয় বিপ্লব

ট্রাম্পের সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

ট্রাম্পের সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

নিউইয়র্কের চিঠি ট্রাম্পের প্রতি আমেরিকান ভোটারদের অনাস্থা

ট্রাম্পের প্রতি আমেরিকান ভোটারদের অনাস্থা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম