সরকার যেভাবে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারে
Advertisement
ড. শাহ জে মিয়া
প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে সর্বপ্রথম শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আশির দশকে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে ছিলেন। তার এ উদ্যোগের জন্য, হাজার হাজার বাংলাদেশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে চাকরি পেয়েছিলেন এবং সেই ধারাবাহিকতা আজও চোখে পড়ার মতো। যুগোপযোগী দক্ষ মানব সম্পদ তৈরির পরিকল্পনা ব্যক্ত করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কয়েক দিন আগে জাতির উদ্দশে তার প্রথম বিশেষ বক্তৃতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দক্ষতার গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন, যা আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য একটা আকাঙ্ক্ষার নতুন জায়গা তৈরি করবে। যাহোক, আমি মনে করি এটি যথাযথ এবং সময়োপযোগী কারণ বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই ‘এআই অগমেন্টেড ওয়ার্কপ্লেস’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমৃদ্ধ দক্ষতা এবং কর্মক্ষেত্র নিয়ে চিন্তা শুরু করতে হবে।
আধুনিক বিশ্বে ‘এআই অগমেন্টেড ওয়ার্কপ্লেস’ নিয়ে আলোচনা করা এখন সময়ের অন্যতম দাবি। এই ধারণার মূল উদ্দেশ্য মানুষকে প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একটি সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজে লাগিয়ে মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো। দৈনন্দিন পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো এআই-এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় করার ফলে কর্মীদের ওপর থেকে বাড়তি চাপ কমে যায় এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়ে। ফলে একঘেয়ে কাজ থেকে মুক্তি পেয়ে কর্মীরা যখন কৌশলগত বিষয়ে মনোযোগ দেন, তখন তা নতুন উদ্ভাবন বা ইনোভেশন তৈরিতে দারুণভাবে সাহায্য করে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে, যার ফলে পণ্য ও সেবার মান যেমন উন্নত হয়, তেমনি কাজের গতি ত্বরান্বিত হওয়ার পাশাপাশি কর্মপরিবেশের পদ্ধতিগুলোরও সার্বিক উন্নতি সাধন সম্ভব হয়।
বর্তমান যুগে মানুষের জীবনযাত্রা ও পছন্দের বৈচিত্র্য বা জটিলতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে; আর এ জটিলতাকে নির্ভুলভাবে বিশ্লেষণ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমাদের কাছে এখন রয়েছে সুবিশাল ‘বিগ ডেটা’। এ বিশাল তথ্য ভান্ডারকে সঠিকভাবে পরিচালনা, বিশ্লেষণ ও মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার জন্যই এআই প্রযুক্তি আজ প্রতিটি আধুনিক কর্মক্ষেত্রে এতটা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে এআই এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর) খাতের বাজার এক অভাবনীয় ও বিস্ময়কর প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এ বৈশ্বিক বাজারের আকার যেখানে ছিল ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, তা আগামী ২০৩৩ সালের মধ্যে ফুলেফেঁপে ৪৪৬.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এ অবিশ্বাস্য উত্থানের হার বা বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি প্রবৃদ্ধির হার (CAGR) হবে ৩৯.৫ শতাংশ, যা প্রযুক্তি বিশ্বে এক নতুন বিপ্লবেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অভাবনীয় প্রবৃদ্ধির পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করছে মেশিন লার্নিং (ML), ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (NLP) এবং কম্পিউটার ভিশনের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগুলো। এ বাজার সম্প্রসারণ শুধু একটি নির্দিষ্ট খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং গেমিং, খুচরা ব্যবসা (রিটেইল), স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদন শিল্প এবং শিক্ষার মতো বৈচিত্র্যময় শিল্পগুলোতে এর ব্যবহার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। মূলত রিয়েল-টাইম ডেটা প্রসেসিং সক্ষমতার যুগান্তকারী উন্নতি এবং ব্যবহারকারীদের জন্য আরও জীবন্ত ও ইমারসিভ অভিজ্ঞতা তৈরির ফলেই এ প্রযুক্তিগুলোর এমন ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।
আশার কথা হলো, বৈশ্বিক এ প্রযুক্তিগত রূপান্তরের হাওয়া লাগছে বাংলাদেশেও। সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারণী নথিপত্রে বাংলাদেশের উপস্থিতি এ ইঙ্গিতই দেয় যে, বৈশ্বিক এ সুবিশাল প্রযুক্তিগত সম্ভাবনাকে বাংলাদেশের নিজস্ব আঞ্চলিক কৌশল বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক এ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারলে আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতে এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যমতে, এ বৈশ্বিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনায় শীর্ষে অবস্থান করছে সুইডেন; দেশটিতে উৎপাদনশীলতা বা অর্থনৈতিক মান বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে ৩৭ শতাংশ। এই দৌড়ে সুইডেনের পরই রয়েছে ফিনল্যান্ড (৩৬), যুক্তরাষ্ট্র (৩৫) ও জাপান (৩৪)। এ ছাড়াও ইউরোপের অন্য শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোও এই নতুন বাস্তবতায় বিপুল লাভবান হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে অস্ট্রিয়া (৩০), জার্মানি (২৯), নেদারল্যান্ডস (২৭), যুক্তরাজ্য (২৫), ফ্রান্স (২০), বেলজিয়াম (১৭), ইতালি (১২) ও স্পেনের (১১ শতাংশ) প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্টতই প্রমাণ করে, যে দেশ যত দ্রুত এ আধুনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেবে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তারা ততটাই শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে, এমন আশঙ্কা ও ভীতি এখন বিশ্বজুড়েই। কিন্তু বৈশ্বিক বাস্তবতার চিত্রটি বলছে একেবারেই ভিন্ন কথা। সাধারণ মানুষের এই ভীতির বিপরীতে এক অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ও তথ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান উঠে এসেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে। ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কর্মসংস্থানে এআইর প্রভাব কেমন হবে, তা নিয়ে করা এ পরিসংখ্যানে স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মসংস্থান ধ্বংসকারী কোনো প্রযুক্তি নয়, বরং এটি বিপুল পরিমাণ নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টিকারী একটি আশীর্বাদ। তথ্যমতে, এআইর কারণে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ (৯২ মিলিয়ন) মানুষ চাকরি হারাবে বলে যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তার বিপরীতে পরম বাস্তবতা হলো, এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির হাত ধরেই ১৭ কোটি (১৭০ মিলিয়ন) নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। হিসাব অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত এআই কেড়ে নেওয়ার চেয়ে উলটো ৭ কোটি ৮০ লাখ (৭৮ মিলিয়ন) সম্পূর্ণ নতুন চাকরি বিশ্ববাজারে যোগ করবে।
তবে অপার সম্ভাবনার পরও এই রূপান্তরের পথে বেশ কিছু বাস্তবিক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশ্বের অনেক বড় প্রতিষ্ঠানও এআই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে অবস্থান করছে। কর্মক্ষেত্রে এই প্রযুক্তিকে সফল ও নিরাপদভাবে কাজে লাগাতে হলে কর্মীদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত এআই পরিকাঠামো এবং এর ব্যবহারের ওপর একটি সুস্পষ্ট নির্দেশিকা বা নীতিমালার ব্যাপক প্রয়োজন রয়েছে। সঠিক প্রস্তুতি ও কাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমেই শুধু এআই-সমৃদ্ধ আধুনিক কর্মক্ষেত্রের পূর্ণাঙ্গ সুফল ঘরে তোলা সম্ভব বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, একুশ শতকের পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে টিকে থাকতে এবং সমৃদ্ধি অর্জন করতে হলে এআই এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে দূরদর্শিতার সঙ্গে আশির দশকেই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় আজ আমাদের প্রয়োজন একটি সুপরিকল্পিত ‘এআই অগমেন্টেড ওয়ার্কপ্লেস’ গড়ে তোলা। কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প, ব্যাংকিং এবং আইসিটির মতো প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে এআই-ভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এ রূপান্তরের জন্য শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারই যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন উপযুক্ত অবকাঠামো, যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ এবং সুস্পষ্ট নীতিমালার বাস্তবায়ন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে যদি আমরা এখন থেকেই আমাদের বিশাল কর্মীবাহিনীকে এ আধুনিক প্রযুক্তিগত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সমন্বিত করতে পারি, তবে বাংলাদেশ খুব দ্রুতই একটি সমৃদ্ধ, এবং যুগোপযোগী মানব সম্পদ তৈরির মাধমে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। বৈশ্বিক এই প্রযুক্তি বিপ্লবের দৌড়ে যারা আগে প্রস্তুতি নেবে, আগামী দিনে তারাই বিজয়ী হবে, আর এই বিজয়ের পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়াই আমাদের বর্তমানের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে যুগোপযোগী মানবসম্পদ তৈরির মাধমে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির বাজারে বাংলাদেশ হতে পারে সাউথ এশিয়ার এক উদীয়মান বুদ্ধিনির্ভর জাতি।
ড. শাহ জে মিয়া : প্রফেসর অব বিজনেস অ্যানালিটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড এআই, নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া; উপদেষ্টা, বিএনপি অস্ট্রেলিয়া এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের বহির্বিশ্বে শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী পেশাজীবী এক্সপার্টিজ গ্রুপের সদস্য
