Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সোশ্যাল মিডিয়ার আয়নায় মানুষের প্রত্যাশা বিশ্লেষণ

Advertisement

Icon

ড. শাহ জে মিয়া

প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সোশ্যাল মিডিয়ার আয়নায় মানুষের প্রত্যাশা বিশ্লেষণ

Advertisement

বর্তমান যুগে সোশ্যাল মিডিয়া শুধু ব্যক্তিগত যোগাযোগের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার সুবিশাল তথ্যভান্ডার বা ‘বিগ ডেটা’ এখন আমাদের সামনে এক অভাবনীয় সুযোগ তৈরি করেছে নতুন বাস্তবতা বের করে নিয়ে আসার। সোশ্যাল মিডিয়ার মানুষের তৈরি ডেটা মূলত সমাজ মনিটরিং বা সমাজের সার্বিক প্রতিচ্ছবি প্রতিফলনের এক স্বচ্ছ আয়নায় পরিণত হয়েছে, যার মাধ্যমে অনেক বাস্তব ধারণা পাওযা সম্ভব। এ বিগ ডেটার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা এখন খুব সহজেই মনিটর করতে পারি-দেশের মানুষ রাজনৈতিক দলগুলোকে কীভাবে দেখছে, দলগুলো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, রাষ্ট্র বা দল পরিচালনায় কোনো প্রতিবন্ধকতা বা অসুবিধা আছে কিনা এবং সর্বোপরি জনমতের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে যাচ্ছে।

এ বাস্তবতা সামনে রাখলে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের পূর্ববর্তী পরিস্থিতি এবং বিএনপির নতুন সরকার গঠনের পর সাধারণ মানুষ কী ভাবছে, তা বোঝার জন্য সোশ্যাল মিডিয়াকে অবজ্ঞা করা অসম্ভব। এ বিশাল সোশ্যাল মিডিয়া তথ্যভান্ডারে মানুষ কী বলছে, তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু কী? এ রিসার্চ কোয়েশ্চেন সামনে রেখে কিছু অজানা বিষয়বস্তু নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করার জন্য আমরা অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ ফেসবুক সাইটগুলোকে সিলেক্ট করে ওয়েব-স্ক্রাবিং টুলস ব্যবহারের মাধ্যমে ডেটা কালেক্ট করেছিলাম। কনটেন্ট পোস্টের তারিখ ছিল ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি। কনটেন্ট ডেটাগুলোকে আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-প্রযুক্তি প্রয়োগ করেছিলাম। এ গবেষণায় আমরা Positivism paradigm (ইতিবাচকতার দৃষ্টান্ত)-এর মধ্যে থাকছি।

সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ কী বলছে বা মানুষের চিন্তাধারায় কী ধরনের পরিবর্তন আসছে, তা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য জানা অত্যন্ত জরুরি। এটি আমাদের সাধারণ মানুষের প্রকৃত ধারণা সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ চিত্র দেয়। তবে এ ধরনের গবেষণায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তথ্যের নিরপেক্ষতা। তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আমরা এমন সব জায়গা বা ফেসবুক পেজ থেকে ডেটা সংগ্রহ করেছি, যারা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের অংশ নয়। আমরা এটি শতভাগ নিশ্চিত করেছি যে, সংগৃহীত ডেটা যেন কোনোভাবেই বিএনপি, জামায়াত বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম থেকে না আসে।

বাংলাদেশের সম্প্রতিক প্রেক্ষাপট সামনে রেখে আমরা মূলত তিনটি নির্দিষ্ট সময়ের (১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি) ওপর ভিত্তি করে আমাদের গবেষণার ফলাফল প্রস্তুত করেছি : ১. প্রাক-নির্বাচন (ভোটের আগে), ২. নির্বাচন-পরবর্তী সময় এবং ৩. গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারিখের পর নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পরবর্তী সময়। পুরো বিশ্লেষণ প্রক্রিয়াটিকে আমরা তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেছি। প্রথমেই রয়েছে ওয়ার্ড ক্লাউড, এর মাধ্যমে দেখা যায়, মানুষের দৈনন্দিন আলোচনায় কোন শব্দগুলোর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি ছিল এবং কোন শব্দগুলো মানুষ বারবার ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে ইতিবাচক ও নেতিবাচক, উভয় ধরনের শব্দই স্থান পেয়েছে। তারপরে সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিস, এই ধাপে আমরা দেখার চেষ্টা করেছি সোশ্যাল মিডিয়ায় কত শতাংশ মানুষ বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কিত ইতিবাচক, নেতিবাচক বা নিরপেক্ষ কথা বলছেন। বিশেষ করে, নবগঠিত বিএনপি সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে মানুষের মনোভাব কেমন, তার একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র এ সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে তুলে আনা হয়েছে। এরপর রয়েছে শীর্ষ ৫ পরিভাষা। এই ধাপে আমরা নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের পর এবং সরকার গঠনের পর, এ তিন সময়ের প্রতিটি স্তরে মানুষের আলোচনায় উঠে আসা শীর্ষ ৫টি পরিভাষা চিহ্নিত করেছি। সবশেষে, সংগৃহীত তথ্যের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি মজবুত করার জন্য আমরা একটি নির্ভরযোগ্যতার সূচকও ক্যালকুলেট করেছি। এর ফলে আমাদের এ বিশ্লেষণের ফলাফল সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত ও বিজ্ঞানসম্মত হয়েছে। আমাদের এ বিশ্লেষণে প্রাপ্ত তিন ধাপের ‘ওয়ার্ড ক্লাউড’ বা শব্দ-মেঘ বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মানসিকতা, রাজনৈতিক উত্তাপ এবং সরকারের প্রতি তাদের প্রত্যাশার এক চমৎকার পরিবর্তনশীল চিত্র ফুটে ওঠে।

প্রথমেই রয়েছে প্রাক-নির্বাচন। নির্বাচনের ওয়ার্ড ক্লাউডে রাজনৈতিক বিভাজন এবং নির্বাচনি উত্তাপের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেলেও বিএনপির অবস্থান ছিল সর্বত্রই মানুষের আলোচনায়। এখানে ‘বিএনপি’, ‘ভোট’, ‘তারেক’, ‘ধানের শীষ’, ‘আওয়ামী লীগ’, এবং ‘মির্জা আব্বাস’-এ শব্দগুলো সবচেয়ে বেশি মানুষের কমেন্টে ব্যবহৃত হয়েছে, যা বলছে যে মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি, তারেক রহমান এবং তার প্রার্থীরা। পাশাপাশি ‘ইনশাআল্লাহ’ এবং ‘জয়’-এর মতো আশাবাদী শব্দের সঙ্গে সঙ্গে ‘চোর’, ‘বাটপার’, ‘চাঁদাবাজ’, ‘বয়কট’ এবং ‘ভারত’-এর মতো শব্দগুলো প্রমাণ করে যে, সাইবার স্পেসে রাজনৈতিক আক্রমণ, পালটা আক্রমণ এবং ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুগুলো নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছিল সেসময়।

তারপর আসছে নির্বাচন-পরবর্তী বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা। ভোটগ্রহণের পর সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচনার ধরনে দৃশ্যত পরিবর্তন আসে। এ ধাপে ‘বিজয়’, ‘ইনশাআল্লাহ’, ‘আল্লাহ’, ‘ভালো’ এবং ‘আজ’-এর মতো শব্দগুলো বড় হয়ে ওঠে, যা বিজয়ী দল বিএনপির সমর্থকদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, স্বস্তি এবং ধর্মীয় কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ইঙ্গিত দেয়। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ সময়েও ‘ফ্যাসিবাদ’, ‘দালাল’, ‘বাটপার’ ও ‘শকুনের’-এর মতো কড়া নেতিবাচক শব্দগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ শক্তিশালীভাবে উপস্থিত ছিল। এটি প্রমাণ করে, নির্বাচনের ফলাফল আসা সত্ত্বেও অতীতের শাসনব্যবস্থা, ধ্যানধারণা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে জমে থাকা ক্ষোভ তখনো প্রশমিত হয়নি। তবে লক্ষণীয়, মানুষের কাছে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রমাণিত।

তৃতীয় ধাপে রয়েছে সরকার গঠন-পরবর্তী সম্পর্কে আলোচনা। নতুন সরকার গঠনের পর ওয়ার্ড ক্লাউডের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে রাজনৈতিক কাদা-ছোঁড়াছুঁড়ির চেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। ‘প্রধানমন্ত্রী’, ‘তারেক’, ‘সরকার’ ও ‘শপথ’ শব্দগুলো জানান দিচ্ছে মানুষ ক্ষমতার পটপরিবর্তনকে কীভাবে গ্রহণ করেছে। তবে এ ধাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-‘সংস্কার’, ‘সংবিধান’, ‘কাজ’ ও ‘সিদ্ধান্ত’ শব্দগুলোর ব্যাপক ব্যবহার। এর মানে হলো, সাধারণ মানুষ এখন বিএনপির নতুন সরকারের কাছে কাঠামোগত পরিবর্তন ও দৃশ্যমান কাজের আশা করছে। এ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘মাফিয়া’ ও ‘জুলাই’ শব্দ দুটির জোরালো উপস্থিতি প্রমাণ করে, চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা মানুষের মনে এখনো গেঁথে আছে এবং বিগত ‘মাফিয়া’ ব্যবস্থার বিচারের দাবি এখনো সোশ্যাল আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। এটি বিএনপির কাছে গণমানুষের প্রত্যাশার কথাটি মনে করিয়ে দেয় বলে আমি বিশ্বাস করি।

ওয়ার্ড ক্লাউডের এই ডেটা থেকে আমরা বুঝতে পারি, সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশের নাগরিকরা এখন আর শুধু আবেগতাড়িত রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তারা ভোটের মাঠের উত্তেজনা পার করে এখন রাষ্ট্রীয় ‘সংস্কার’, ‘সংবিধান’ ও ‘কাজ’-এর মতো যৌক্তিক ও গঠনমূলক আলোচনার দিকে ধাবিত হয়েছেন।

পরিশেষে বলা যায়, ভবিষ্যৎ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ার যাত্রায় সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং বিএনপির ওপর গণমানুষের মনোভাব এখনো ইতিবাচক অবস্থানে আছে। এখানে বলে রাখি, সোশ্যাল মিডিয়া ডেটার সবকিছু বিশ্বাসযোগ্য, এটা বলা ঠিক না। আমরা যা-ই বলি না কেন, সোশ্যাল মিডিয়া ডেটা অনেক সময়ে বায়াস (পক্ষপাতদুষ্ট) হতে পারে, তাই এ থেকে বের করা ফলাফল বিশ্বাস করা প্রশ্নসাপেক্ষ। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে সোশ্যাল মিডিয়া ডেটা একমাত্র সহজ উপায় মানুষের মতামতের মোটামুটি একটা অবস্থান বোঝার। তাই আমি মনে করি, এআই এবং সোশ্যাল লিসেনিংয়ের মাধ্যমে জনমত মনিটর করার এ পদ্ধতি শুধু সরকার বা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যই প্রয়োজনীয় নয়; বরং রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন প্রশাসনিক দিক এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও এটি সমভাবে জরুরি। প্রযুক্তিনির্ভর এ মনিটরিং ব্যবস্থা আগামী দিনে নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক দল হিসাবে বিএনপি ও সরকারকে নিজেদের ভুলত্রুটি শুধরে জনবান্ধব ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে আরও বেশি সহায়তা করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

ড. শাহ জে মিয়া : প্রফেসর অফ বিজনেস অ্যানালিটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড এআই, নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

যখন মাৎস্যন্যায় ফিরে আসে

যখন মাৎস্যন্যায় ফিরে আসে

জুলাইয়ের বাংলাদেশ : তার ফেরার বার্তা

জুলাইয়ের বাংলাদেশ : তার ফেরার বার্তা

দার্শনিকতায় বিএনপির বিকল্প আছে কি?

দার্শনিকতায় বিএনপির বিকল্প আছে কি?

হালফিল বয়ান রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম