Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

শতফুল ফুটতে দাও

জঙ্গল সলিমপুর : রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি

ড. মাহবুব উল্লাহ্

ড. মাহবুব উল্লাহ্

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জঙ্গল সলিমপুর : রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি

জঙ্গল সলিমপুর। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র, যেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে পড়েছিল। আমরা রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের প্রতি ইঞ্চি জায়গায় রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের কথা বলি। এর অর্থ হলো, সর্বত্র রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ হবে। কেউ রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগে বাধা দিতে পারবে না। কেউ নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। এ রকম একটি ক্ষেত্রে প্রবেশ ও বহির্গমনে কেউ বাধা দিতে পারবে না। কিন্তু এর বিপরীতটিই ঘটেছিল জঙ্গল সলিমপুরে। জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান সীতাকুণ্ডে। এলাকাটির আয়তন ৩ হাজার ১০০ একর। এটি খাসজমি। এখানে পাহাড় রয়েছে ৩৭টি, রয়েছে ৮টি টিলা। এখানকার জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। সন্ত্রাসীরা এখানে অবৈধ প্লট বাণিজ্য ও দখলদারত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদের নামে ৩৪টি পাহাড় কেটে এখানে ২০ হাজার প্লট তৈরি করেছিল। আলীনগর সমবায় সমিতি ৩টি পাহাড় কেটে গড়ে তুলেছে ৫ হাজার প্লট। এ ভূখণ্ডে প্রবেশ বা অবস্থানের জন্য বাহিনীপ্রধানের স্বাক্ষরিত পাশের প্রয়োজন হতো। গত ২ দশকে এক ডজনের বেশি খুন হয়েছে। উচ্ছেদ অভিযানে সরকারি বাহিনী গেলে সশস্ত্র হামলার শিকার হতো।

বাংলাদেশে দখলদারত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নামে মুখরোচক কিছু অজুহাত প্রায়ই ব্যবহৃত হয়। জঙ্গল সলিমপুরে ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে পাহাড় কেটে ২০ হাজার প্লট তৈরি করা হয়েছে। একইভাবে সমবায় সমিতি এদেশে একটি ভালো উদ্যোগ বলে বিবেচিত হয়। জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীরা আলীনগর সমবায় সমিতির নামে ৩টি পাহাড় কেটে গড়ে তুলেছে ৫ হাজার প্লট। মোট ২৫ হাজার প্লট হাওয়া থেকে গড়ে ওঠেনি। পাহাড় কাটার জন্য প্রয়োজন হয়েছিল বিশাল জনবল এবং এক্সকেভেটর। এর জন্য নিঃসন্দেহে বিশাল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়েছে। তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের জানতে হবে অর্থের উৎস কী? কারা বা কোন প্রতিষ্ঠান এই অর্থের জোগান দিয়েছে? এও কি সম্ভব, জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসের গডফাদাররা এক ধরনের দাস-শ্রমিক গোষ্ঠী গড়ে তুলেছিল! যাদের দাস-মজুরের মতো পাহাড় কাটার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। শ্রমের বিনিময়ে এই দাস শ্রমিকরা হয়তো পেত কোনোরকমে বেঁচে থাকার সামগ্রী। একজন অর্থনীতির ছাত্র হিসাবে যা বুঝতে পারি, তা হলো গত ২০ বছরে জঙ্গল সলিমপুরের নিজস্ব একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে; যা দেশের অন্য এলাকা থেকে ভিন্ন প্রকৃতির। এটা ঠিক, এখানে যে অর্থের ব্যবহার হতো, তা বাংলাদেশেরই মুদ্রা। হতে পারে, এখানে প্লট তৈরি করার কাজে জাল মুদ্রারও ব্যবহার হয়েছে। শুধু মুদ্রার বিবেচনায় জঙ্গল সলিমপুরের সঙ্গে বাংলাদেশের অবশিষ্ট ভূখণ্ডের একটা যোগাযোগ ছিল। প্রশ্ন হলো, সব মিলিয়ে যে ২৫ হাজার প্লট তৈরি করা হয়েছিল, তার ক্রেতা কারা? এসব ক্রেতা কি বুঝে বেআইনি লেনদেনে প্রবেশ করেছিল? খাসজমি কারও পক্ষে বেচাকেনা করা সম্ভব নয়। একমাত্র সরকারই পারে খাসজমির ব্যবহার এবং ক্ষেত্রেবিশেষ লিজ নিশ্চিত করতে। এ কাজে সরকারের ভূমি বিভাগের লোকজনের যোগসাজশ না থাকলে, খাসজমি দিয়ে একটি জমির বাজার সৃষ্টি করা সম্ভব নয়; তাহলে সরকারের ভেতরের কোন কোন ব্যক্তি এ অপকর্মে অংশগ্রহণ করেছে, তা-ও জানা প্রয়োজন। এ মুহূর্তে এটুকু বলা যায়, জঙ্গল সলিমপুরকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার লোকজনদের মধ্যে একটি নেক্সাস গড়ে উঠেছিল, যে কারণে গত ২০ বছর ধরে অপরাধী চক্রটি অপরাধ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে।

সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ অভিযান শুরুর আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। গোপন সিসি টিভি ক্যামেরা ও নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে আগেই তথ্য জেনে যায় অপরাধীরা। তাদের কাছে তথ্য ফাঁস করল কারা, তাদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। অভিযান শুরুর আগেই তারা ভেঙে ফেলে সড়ক যোগাযোগের কালভার্ট। সড়কে তৈরি করে প্রতিবন্ধকতা। আত্মগোপনে চলে যায় চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। গত সোমবার দিনভর অভিযান চালিয়েও কোনো দাগি আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। উদ্ধার করা যায়নি ভারী অস্ত্রশস্ত্র। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত একটি পিস্তল, একটি এলজি, ৪টি কার্তুজ, ১১টি ককটেল, ১৭টি দেশীয় অস্ত্র, ১৯টি সিসি ক্যামেরা ও ২টি বায়নোকুলার জব্দ করা হয়। আটক করা হয় সন্দেহভাজন ১২ ব্যক্তিকে। তাদের কারও বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কিনা, সেটি নিশ্চিত করতে পারেনি যৌথ বাহিনী। তবে পরবর্তী সময়ে অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানোর কথা বলা হয়েছে।

সোমবারের অভিযান ছিল একটি বিশাল অভিযান। এ অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ৩ হাজার ১৮৩ সদস্য অংশ নেন। এর মধ্যে ৪৮৭ জন সেনাবাহিনীর সদস্য, ১ হাজার ৬০০ পুলিশ, ৩৩০ এপিবিএন, ৩৭১ র‌্যাব, ১২২ বিজিবি, ১৫টি এপিসি, ৩টি ডগস্কোয়াড, ১২টি ড্রোন ও ৩টি হেলিকপ্টার রিজার্ভে রাখা হয়। এছাড়া সাতজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযানের দায়িত্ব পালন করেন। জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরের প্রায় সবক’টি প্রবেশমুখ ঘিরে রেখে সাঁড়াশি অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী।

দেখা যাচ্ছে, জঙ্গল সলিমপুর অপারেশনে বাংলাদেশের প্রায় সব বাহিনীকেই সংশ্লিষ্ট করা হয়। এ অভিযান চালানোর জন্য সরকারের নিশ্চয়ই অনেক অর্থ ব্যয় হয়েছে। ব্যাপক প্রস্তুতি সত্ত্বেও অভিযানের সাফল্য খুবই সামান্য। আসল দাগি আসামিরা পূর্বাহ্নে খবর পেয়ে পালিয়ে যায় অথবা আত্মগোপন করে। যতদিন এসব অপরাধীকে পাকড়াও করে বিচারে সোপর্দ করা সম্ভব না হবে এবং যথাযথ শাস্তি প্রদান সম্ভব না হবে, ততদিন পর্যন্ত এ অভিযান সফল হয়েছে বলে মনে করা সঠিক হবে না। ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযানের বিষয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য যা ছিল, তা করতে পেরেছি। আজ থেকে পুলিশ ও র‌্যাবের ২টি ক্যাম্প এখানে কাজ করবে। ক্যাম্পের নিরাপত্তায় এখানে যদি কামানও দেওয়া লাগে, আমরা দেব। এ এলাকায় প্রশাসনের নেওয়া পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য অনুরোধ করছি (সূত্র : দৈনিক সমকাল)।

অভিযান শুরুর আগে সন্ত্রাসীরা তথ্য কীভাবে পেল-এমন প্রশ্নে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকা যারা নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের বিভিন্ন সোর্স রয়েছে। কোনোভাবে হয়তো তারা আগে জেনে গেছে। কথা হলো, শর্ষের ভেতরে ভূত থাকলে, সে ভূত তাড়াবে কারা।

জঙ্গল সলিমপুর শহর থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। শহরের সঙ্গে নৈকট্য সত্ত্বেও জায়গাটি হয়ে উঠেছিল অপরাধীদের ‘অভয়ারণ্য’। এখানে অবৈধ অস্ত্রেরও মজুত আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি পাহাড়ি ভূমি প্লট আকারে বিক্রি করতে গিয়েই এলাকাটি অপরাধের স্বর্গ হয়ে ওঠে। অবাক ব্যাপার, এখানে প্রবেশ করতে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকেও অনুমতি নিতে হতো। নিজস্ব পাশ কার্ড চালু করে এ এলাকার নিয়ন্ত্রণ পাকাপোক্ত করে সন্ত্রাসীরা। এটি করতে গিয়ে গত ২ দশকে এখানে ১ ডজনের বেশি খুন হয়েছে। এসব খুনের ঘটনায় আসামি ধরতে গেলেও হামলার শিকার হতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। গত ১৯ জানুয়ারি অভিযান চালাতে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন র‌্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েক সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভুইয়া। এ ঘটনার পরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নড়েচড়ে বসে এবং সোমবারের অভিযান চালায়।

বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বলেন, এখানে প্রশাসনের যে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হওয়ার দরকার ছিল, তা হয়েছে। সরকার আগে এই এলাকা ঘিরে যে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছিল, এখন থেকে সেটা শুরু হবে।

র‌্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ভোরে অভিযানের শুরুতে স্থানীয় কিছু নারী বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল; পরে তারা চলে যায়। আলীনগর প্রবেশের পথে একটি কালভার্ট ভেঙে দিয়ে এতে একটি ট্রাক দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। তা সরিয়ে অভিযান শুরু করা হয়। বিভিন্ন স্থানে অভিযানে তল্লাশি চালানো হয়। এখন থেকে জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ২টি চৌকি প্রতিষ্ঠা করা হবে। ১৯৭০ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়াতে ড্রাগ কার্টেলের কর্তৃত্ব করত মেডেলিন ও ক্যালি কার্টেল। এরা আন্তর্জাতিক কোকেন ব্যবসায় বিপ্লব সৃষ্টি করেছিল। এদের নেতৃত্বে ছিল পাবলো স্কোভার-এর মতো ব্যক্তিত্ব। এ সংগঠনগুলো ছিল অত্যন্ত ক্ষমতাশালী এবং প্রায়ই তারা রাষ্ট্রের সঙ্গে সহিংসতায় লিপ্ত হতো। এদের ছিল প্যারামেডিটারি বাহিনী। এরা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ছিল, এ গোষ্ঠীগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাচার করে। ড্রাগের এই ব্যবসা ভয়াবহভাবে কলম্বিয়ার সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। এর ফলে দেখা যায়, ব্যাপক দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। কলম্বিয়ার ড্রাগ কার্টেলের সঙ্গে বামপন্থি রাজনীতির একটা যোগসাজশ ঘটেছিল। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাবো পেট্রো ড্রাগ কার্টেলগুলোকে প্রশ্রয় দিতেন এবং তাদের কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে অস্বীকার করেন। গুস্তাবো পেট্রো ছিলেন বামপন্থি। তিনি ছিলেন সাবেক বিদ্রোহী যোদ্ধা; যিনি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের পদ অলংকৃত করেন। ২০২৫-এর অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাবো পেট্রো ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরমান্ডো বিনিডেক্টের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এভাবে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক মাদক ব্যবসা ও রাজনৈতিক মতাদর্শ তালগোল পাকিয়ে কলম্বিয়ার জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। জঙ্গল সলিমপুরে যে ধরনের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মৌরসি পাট্টা গড়ে তুলেছিল, তা আরও গভীর হলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ত।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম