Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সংকটে আশার আলো

Advertisement

শায়রুল কবির খান

শায়রুল কবির খান

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সংকটে আশার আলো

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফাইল ছবি

Advertisement

রাজনীতির অমোঘ নিয়মে দৃশ্যপট বদলায়, কিন্তু কিছু দৃশ্য ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী আসন গেড়ে নেয়। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, লন্ডন থেকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী) তারেক রহমান। ঢাকার ৩০০ ফিট রাস্তার সেই জনসমুদ্র, যেখানে ২০ লাখ মানুষের সামনে তিনি মাত্র ১৭ মিনিটের এক সংক্ষিপ্ত অথচ দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখলেন, তা যেন এক নতুন বাংলাদেশেরই ইঙ্গিত দিচ্ছিল।

তারেক রহমান তার বক্তব্যে অতীতের জরাজীর্ণ প্রতিহিংসার রাজনীতি কিংবা পারস্পরিক অনাস্থার দেওয়াল ভেঙে ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে এই প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার যে অঙ্গীকার তিনি করেছেন, তা নিছক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়; বরং সময়ের দাবি।

বক্তব্য শেষ করেই তিনি কোনো রাজকীয় সংবর্ধনায় না গিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন এভারকেয়ার হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন ‘গণতন্ত্রের মাতা’ বেগম খালেদা জিয়া। জনস্রোত মাড়িয়ে সেই হাসপাতালে যাওয়া এবং সেখান থেকে গুলশানের নিজ বাসভবনে ফেরার পথে দুপাশের মানুষের যে ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন, তা ছিল দীর্ঘ লড়াইয়ের এক বড় স্বীকৃতি।

স্মরণ করা প্রয়োজন, আওয়ামী ফ্যাসিবাদের চরম আগ্রাসনের মুখে যখন বিএনপি শত শত গুম, খুন এবং লাখ লাখ মামলার বেড়াজালে পিষ্ট, তখন সুদূর প্রবাসে থেকেই দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে সব রাজনৈতিক শক্তিকে এক প্ল্যাটফর্মে আনা এবং রাষ্ট্রের অকার্যকর কাঠামো মেরামতে ‘৩১ দফা’ সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করা ছিল তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয়। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর যখন শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন, তখন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিএনপি যে নিঃশর্ত সহযোগিতা দিয়েছে, তার মূলে ছিলেন তারেক রহমান। তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তার একান্ত বৈঠকগুলো জাতির মনে নতুন প্রত্যাশার বীজ বুনেছিল।

সেই প্রত্যাশারই প্রতিফলন আমরা দেখলাম ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ গ্রহণের মাধ্যমে গঠিত হলো নতুন সরকার।

তবে এই অর্জনের পেছনে রয়েছে এক বিশাল ত্যাগের মহিমা। প্রায় দুই দশক ধরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে বেগম খালেদা জিয়া কারাবরণ করেছেন, সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এই কঠিন সময়ে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতারা রাজপথে যেমন সক্রিয় ছিলেন, তেমনি পারিবারিক আঙিনায় শামীম ইস্কান্দার, সেলিনা ইসলাম, সৈয়দা শর্মিলা রহমান এবং লন্ডনে অবস্থানরত ডা. জোবাইদা রহমান বেগম জিয়ার পাশে ছিলেন ছায়ার মতো। অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেনের নেতৃত্বে মেডিকেল বোর্ডের নিরলস পরিশ্রমের কথাও জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে।

কিন্তু নিয়তির লিখন, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ভোরে চিরবিদায় নিলেন বেগম খালেদা জিয়া। ৩১ ডিসেম্বর মানিক মিয়া এভিনিউতে তার জানাজায় মানুষের যে ঢল নেমেছিল, তাতে ঢাকা শহর যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। শেরে বাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশেই শায়িত হলেন তিনি।

জানাজার আগে নজরুল ইসলাম খান যখন বেগম জিয়ার সংক্ষিপ্ত কর্মজীবন তুলে ধরছিলেন, তখন সবার চোখ ছিল তারেক রহমানের দিকে। তিনি মাত্র ৫৮ সেকেন্ড কথা বললেন। তার অনেক কিছু বলার থাকতে পারত; বাবার শাহাদত, মায়ের ওপর হওয়া অমানুষিক অবিচার, বাড়ি থেকে উচ্ছেদ কিংবা কারান্তরালে বিনা চিকিৎসার কথা। কিন্তু মিতভাষী তারেক রহমান কোনো রাজনৈতিক অভিযোগ করলেন না। তিনি কথা বললেন একজন সাধারণ সন্তানের মতো। মায়ের ঋণের কথা বললেন, কোনো ভুল করে থাকলে ক্ষমা চাইলেন।

এই যে আবেগের আতিশয্য বর্জন, প্রতিশোধের বদলে সংযম, এটিই তাকে একজন ‘স্টেটসম্যান’ বা রাষ্ট্রনায়কের উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তিনি রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাননি, বরং প্রমাণ করেছেন বেগম খালেদা জিয়া আজ রাজনীতির ঊর্ধ্বে, তিনি গোটা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতীক।

জনগণের এ আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণ করা এখন নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। ১৭ বছরের রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া মানুষ এখন চায় সুশাসন, ন্যায়বিচার এবং একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র। প্রাপ্তির খাতা কতটুকু পূর্ণ হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে শুরুটা যে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

শায়রুল কবির খান : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মী

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম