হালফিল বয়ান
দলীয় ভাষ্যে জিম্মি মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস
ড. মাহফুজ পারভেজ
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মার্চ এলেই জাতি অনুভব করে মুক্তিযুদ্ধের অমলিন স্মৃতি। কিন্তু একই সঙ্গে সামনে আসে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা, তা হলো-এখন পর্যন্ত দলীয় ভাষ্যের শৃঙ্খলে জিম্মি হয়ে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের মতো জাতীয় ইতিহাস এখনো নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য রূপ পায়নি। দলীয় ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রভাবে থাকায় তা ঐক্যের বদলে বিতর্ক ও বিভাজনের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে; যা ক্ষতিকর এজন্য যে, এর কুপ্রভাব কেবল ইতিহাসচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ ও জাতীয় চেতনার ওপর গভীর সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
যখন মুক্তিযুদ্ধের মতো জাতীয় ইতিহাস দলীয় ব্যাখ্যার অধীন হয়ে পড়ে, তখন সত্য আংশিক বা বিকৃতভাবে উপস্থাপিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে নতুন প্রজন্ম, ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক বা ঐতিহাসিক ভাষ্য বদলের জেরে একটি অসংলগ্ন ও বিভ্রান্তিকর ইতিহাসের মুখোমুখি হয়, যা তাদের জাতীয় পরিচয় গঠনে অস্পষ্টতা সৃষ্টি করে। মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি যদি বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবাধীন হয়, তবে প্রকৃত অবদানকারীরা বঞ্চিত হতে পারেন এবং দলীয় কারণে অযোগ্য ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি হওয়া স্বাভাবিক।
একটি জাতির সর্বোচ্চ অর্জন মুক্তিযুদ্ধ-যদি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তি ও লুটপাটের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে তা জাতীয় ঐক্য ও সুশাসনের ভিত্তি হিসাবে কাজ করতে পারে না। বরং এটি বিভাজনকে আরও প্রগাঢ় করে, দুর্নীতির কারণ হয় এবং সামাজিক সংহতি দুর্বল করে। তাছাড়া, ইতিহাসের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা সৃষ্টি করে। গবেষণা, আর্কাইভ এবং জ্ঞানচর্চা স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে পারে না। ফলে একটি শক্তিশালী ও শুদ্ধতর বৌদ্ধিক ঐতিহ্য গড়ে ওঠে না।
এসব কারণেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়কে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা শুধু একাডেমিক প্রয়োজন নয়, জাতীয় স্বার্থেই অপরিহার্য কর্তব্য। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত পাঁচবার মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯৭২ সালের ৭ আগস্ট প্রণীত ‘The Bangladesh (Freedom Fighters) Welfare Trust Order, 1972’ ছিল এ সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ সালে সীমিত সংশোধন, ২০১৮ সালে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস, ২০২২ সালে আংশিক পরিবর্তন এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালের জুনে আবারও সংজ্ঞা পরিবর্তন-এ ধারাবাহিকতা একটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে আনে : রাষ্ট্র কি এখনো মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় নির্ধারণে স্থায়ী ও সর্বজনস্বীকৃত মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারেনি? কেন বা কার স্বার্থে তা পারেনি?
আরও প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘মুক্তিযোদ্ধা’ সংজ্ঞার পরিবর্তন প্রয়োজনীয় ছিল, নাকি দলীয় স্বার্থে পুনর্লিখন হয়েছে বারবার? ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সংজ্ঞা বদলে ফেলা কেবল প্রশাসনিক বিষয় হয়ে থাকেনি; বরং তা ক্ষমতাসীন দলের নিজস্ব ভাষ্যের আলোকে রাজনৈতিক ও আদর্শিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সংজ্ঞা পুনর্বিন্যাসের প্রবণতা বাস্তবে ছিল দলীয়করণের নিকৃষ্ট উদাহরণ। অর্ধশতাব্দীর অধিককাল পেরিয়েও ‘মুক্তিযোদ্ধা’ সংজ্ঞার একটি স্থিতিশীল কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে না পারার কারণ হলো দলীয় মানসিকতা। এজন্যই দলীয় ভাষ্যে জিম্মি হয়ে আছে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।
একই ভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নামে যে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা দীর্ঘদিন ধরে চলমান, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। ইতিহাস, যা একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ঐক্যবদ্ধ ভিত্তি-যদি বারবার দলীয় স্বার্থে পুনর্লিখিত ও খণ্ডিত হয়, তাহলে তা কেবল অতীতকে বিকৃতই করে না, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চেতনাকেও বিভ্রান্ত এবং বিভাজিত করে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ‘কারা মুক্তিযোদ্ধা’-এ প্রশ্ন নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে। ফলে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা, স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক পুঁজি হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা ইতিহাসকে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের পরিবর্তে দলীয় প্রতিযোগিতামূলক বয়ানে পরিণত করেছে।
সংজ্ঞার পুনঃপুন পরিবর্তনের প্রভাব কেবল নীতিগত নয়। এটি গভীর সামাজিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। প্রথমত, প্রকৃত অংশগ্রহণকারীদের বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে দুর্বল করে। দ্বিতীয়ত, দলীয় স্বার্থে অযোগ্য অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ সামাজিক আস্থা ক্ষুণ্ন করে। তৃতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি একটি সর্বজনীন শ্রদ্ধার ক্ষেত্র না হয়ে বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি ঐক্যবদ্ধ অভিজ্ঞতাও দুর্নীতি ও বিভাজনের উৎসে পরিণত হয়। তাছাড়া দলীয় ভাষ্যে জিম্মি মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুক্ত করতে হলে কয়েকটি কাঠামোগত সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করাও অপরিহার্য। যেমন-ক. স্বাধীন ইতিহাস কমিশন গঠন, যা হবে দলনিরপেক্ষ, বহুবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বশাসিত ও অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। খ. ডিজিটাল আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা, যেখানে দেশি-বিদেশি সব প্রামাণ্য নথি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও উন্মুক্ত থাকবে। গ. সংজ্ঞার আইনি স্থায়িত্ব নির্ধারণ করাও জরুরি। এতে মুক্তিযোদ্ধার একটি চূড়ান্ত, সর্বসম্মত সংজ্ঞা নির্ধারণ করে তা আইনি সুরক্ষায় আনা সম্ভব হবে। ঘ. অন্তর্ভুক্তিমূলক বয়ান তৈরি করা, যা দলীয় স্বার্থ ও উদ্দেশ্যে সৃষ্ট বয়ানকে নাকচ করবে। কেননা, মুক্তিযুদ্ধকে কেবল দল বা নেতৃত্বকেন্দ্রিক নয়, জনগণের অংশগ্রহণমূলক ইতিহাস হিসাবে উপস্থাপন করা জাতীয় ইতিহাসের জন্যই জরুরি কর্তব্য।
বর্তমান শাসনব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণের যে নীতিগত উচ্চারণ করা হচ্ছে, তা কেবল একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয়, এটি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে ইতিহাসচর্চার চরিত্রই পালটে দেওয়ার মতো একটি কাঠামোগত সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। কারণ অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন মানে শুধু বিভিন্ন মতের সহাবস্থান নয়, বরং নীতিনির্ধারণ, জ্ঞান-উৎপাদন এবং স্মৃতিচর্চার ক্ষেত্রেও বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
এ নীতি বাস্তবায়নের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো, ইতিহাসচর্চাকে দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে আনা। দলীয় ও আমলাতান্ত্রিক প্রাধান্য থেকে বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে জন-অংশগ্রহণমূলক ইতিহাসচর্চা নীতি গ্রহণ করা। এতে করে দল বা ক্ষমতার বয়ানভিত্তিক বিতর্কের পরিবর্তে তথ্যনির্ভর ইতিহাসের প্রতিষ্ঠা হবে। ইতিহাসচর্চার নামে দলীয় বা সরকারি লোকজনের লেজুড়বৃত্তির পথ রুদ্ধ হবে। উল্লেখ্য, ইতিহাসের নাম করে তৈলমর্দন ও দুর্নীতি অতীতে একটি আস্ত সরকারকে কলঙ্কিত ও কলুষিত করেছিল। এমনকি ‘বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকী’ নামক আয়োজন থেকেও শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছিল। তাছাড়া দুর্নীতি ও দলীয় ক্ষমতার মাধ্যমে বহু অযোগ্য কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট বানিয়ে আমলাতন্ত্রে প্রমোশনসহ নানাবিধ অযাচিত সুবিধা নিয়েছে ও দুর্নীতি করেছে। একটি ব্যাপক জনসমর্থনের ভিত্তিতে গঠিত গণতান্ত্রিক সরকারকে গোড়াতেই ইতিহাসের নামে ধান্ধাবাজদের দ্বারা তেল দেওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া দরকার।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়। এটি সমগ্র জাতির অভিন্ন উত্তরাধিকার। সংজ্ঞার পুনঃপুন পরিবর্তন দেখিয়েছে যে, আমরা এখনো ইতিহাসকে দলীয় ক্ষমতার প্রভাব থেকে মুক্ত করতে পারিনি। অতএব, চ্যালেঞ্জটি রাজনৈতিক। রাজনৈতিকভাবেই এর সুরাহা হওয়া আবশ্যক। তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে, একে জাতীয় সংহতির ভিত্তি হিসাবে দেখার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের মালিকানা ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা সবার; একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের নয়। আর ইতিহাস চারিত্র্যই এমন যে, তা কোনো গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পদ হয়ে থাকতে চায় না। অতীতে যারা ইতিহাসকে কুক্ষিগত করতে চেয়েছে, তারাই ব্যর্থ হয়েছে। ইতিহাস ফিরে এসেছে জনমানুষের দরবারে। যেহেতু মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ, যেখানে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র এবং সাধারণ মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে, সেহেতু একে কোনো একক রাজনৈতিক দল বা বিশেষ গোষ্ঠীর ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’ মনে করা ইতিহাসের প্রতি অবিচার। এটি একটি অভিন্ন জাতীয় উত্তরাধিকার, যা পুরো জাতির আত্মপরিচয় নির্ধারণ করে।
তাছাড়া, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জটি প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিক। সরকারি কর্মকর্তা, দলীয় চাটুকার ও তেলবাজ গোষ্ঠী ইতিহাসের বিকৃতি বা সংকীর্ণ ব্যাখ্যার মাধ্যমে হয়তো সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে। কিন্তু তা জাতীয় সমস্যার সমাধান নয়। এ সমস্যার মূলে রয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। তাই এর সমাধানও হতে হবে রাজনৈতিকভাবে-যেখানে সব পক্ষ একমত হবে যে, জাতীয় ইতিহাস ক্ষমতার ঊর্ধ্বে। এ কারণেই ক্ষমতাসীন দল ও সরকারকে এটি বুঝতে হবে যে, মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে তৈরি বয়ান দিয়ে দুর্নীতি বা অপশাসন ঢাকা যায় না। বরং ইতিহাসের সত্যকে যখন সর্বজনীন রূপ দেওয়া হয়, তখন তা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে। কর্মকর্তাদের কাজ হওয়া উচিত নিরপেক্ষভাবে সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা, কোনো দলের রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হিসাবে কাজ করা নয়।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয় বৃত্ত থেকে বের করে জাতীয় মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করাই বর্তমানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর প্রসঙ্গটি অস্বস্তিকর হলেও অপরিহার্য। কারণ, ইতিহাসকে দল বা গোষ্ঠীর জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করা মানে অতীতের পুনর্লিখন নয়, বরং একটি জাতির নৈতিক ভিত্তি, ন্যায়বোধ এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা পুনর্গঠন করা। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে রাজনৈতিক সততা, স্বচ্ছতা ও জাতীয় ঐক্যবোধের প্রসঙ্গও। ফলে এ দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই-কারণ, এটি বিভাজিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি পেরিয়ে জাতীয় ঐক্য পরিগঠনের পূর্বশর্ত।
প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)
