হালফিল বয়ান
দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং মানবাধিকার রক্ষার দ্বন্দ্ব
ড. মাহফুজ পারভেজ
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশে দুর্নীতি দমনের নৈতিক, রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার বিষয়েও কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু দুর্নীতি প্রতিরোধের নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা কিংবা মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত করার বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মূল কথা হলো, দুর্নীতি দমন করতে হবে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষা করে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়।
অতীতে দুর্নীতি দমন একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। আমার দলের হলে ছেড়ে দাও, প্রতিপক্ষের হলে শারীরিক-মানসিকভাবে নাজেহাল কর, এটাই ছিল মূলমন্ত্র। বিগত সরকারগুলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কতটা আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক নীতিমালার ভেতরে থেকে পরিচালনা করেছে, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। প্রশ্নটি জরুরি। কারণ, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের জন্য দুর্নীতি দমন যেমন জরুরি, তেমনই তা আইনের আওতায় মানবাধিকার রক্ষা করে করাও আবশ্যক। এক্ষেত্রে অনিয়ম হলে আইনের শাসনের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হবে।
আমাদের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির রাজনৈতিক পরিবর্তন, যা ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে পরিচিত, বাংলাদেশে এক বিশেষ অধ্যায় তৈরি করে। জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপটে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করে। ঘোষিত লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিন গড়ে ওঠা দুর্নীতির নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলা, যেখানে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিরা জড়িয়ে ছিলেন। এ লক্ষ্য নিঃসন্দেহে জনসমর্থন পেয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে তখন থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, যা আজও অনিরসিত। এমনকি পরবর্তীকালে এমন পন্থাই গ্রহণ করা হয়েছে। এতে দুর্নীতি দমন না হয়ে প্রতিহিংসা ও প্রতিপক্ষ দমনের কাজ হয়েছে। বহুমাত্রিক গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য যা মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
বাস্তবতা হলো, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনের কোথাও বলা নেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শারীরিক বা মানসিকভাবে নির্যাতন করা যাবে। বরং আইনের মৌলিক নীতিই হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। অথচ ওয়ান-ইলেভেন সময়ে গ্রেফতার হওয়া বহু ব্যক্তির বিরুদ্ধে রিমান্ড চলাকালে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ সামনে আসে। যদিও এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন তদন্ত আজও হয়নি, তবুও বিভিন্ন সাক্ষ্য, স্মৃতিচারণা ও মানবাধিকার সংগঠনের পর্যবেক্ষণে এ অভিযোগগুলোকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এখানেই একটি বড় আইনি ও নৈতিক জটিলতা এবং দুর্নীতি দমন ও মানবাধিকার সংরক্ষণের মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। দুদক আইনের একটি বিতর্কিত বিধান অনুযায়ী, কোনো অভিযোগের অনুসন্ধান বা তদন্তের কারণে ক্ষুব্ধ ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে না। এ বিধান কার্যত দায়মুক্তির একটি কাঠামো তৈরি করে, যা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়। এ বিধান না থাকলে ওয়ান-ইলেভেনের সময় সংঘটিত নির্যাতন ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতো এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি প্রতিরোধমূলক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যেত।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো প্রতিষ্ঠানই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। দুর্নীতি দমন কমিশনও নয়। বরং যেহেতু এটি একটি শক্তিশালী তদন্তকারী সংস্থা, তাই এর জবাবদিহি আরও বেশি হওয়া উচিত। কারণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে যদি মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়, তাহলে সেই লড়াই নৈতিক বৈধতা হারায়। বর্তমান সরকারের কর্তব্য হলো, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের মধ্যকার দূরত্ব যতটুকু সম্ভব কমিয়ে আনা এবং বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা ও কর্মপদ্ধতির প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করে এ মৌলিক নৈতিক সমস্যাটিকে সমাধানের পথে নিয়ে যাওয়া।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে প্রণীত নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন এই প্রেক্ষাপটে নতুন একটি সম্ভাবনা তৈরি করে। এ আইনের মাধ্যমে হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করার পথ উন্মুক্ত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, ওয়ান-ইলেভেন সময়কালে যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন, তারা কি এ আইনের আওতায় বিচার চাইতে পারেন? এটি একটি জটিল আইনি প্রশ্ন, যার উত্তর নির্ভর করবে আইনের ব্যাখ্যা, প্রযোজ্যতা ও সময়সীমার ওপর। তবে অন্তত নীতিগতভাবে এ প্রশ্নটি এখন উত্থাপন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা আগে ছিল না। তাই, বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিস্থিতিতে এ বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা এবং আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রাখা জরুরি। এতে অতীতে যারা দুর্নীতি দমনের নামে সরকারি দায়িত্বের বাইরে গিয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের পেটুয়া বাহিনীতে পরিণত হয়েছিলেন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তারা আইনের আওতায় এসে বিচারের সম্মুখীন হতে পারেন। তাছাড়া বর্তমান ও ভবিষ্যতেও কেউ এমন অপকর্ম তথা দুর্নীতি দমন বা সরকারি কাজের নামে নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকার ছিনিয়ে নিতে বা আইনের শাসনকে কলঙ্কিত করতে পারবেন না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের বিচারিক ফলাফল। বহু মামলায় প্রমাণের অভাবে অভিযোগ টেকেনি, আবার অনেক ক্ষেত্রে নিু আদালতের রায় উচ্চ আদালতে বাতিল হয়েছে। এতে সে সময়ের অভিযানের কার্যকারিতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যদি সত্যিই দুর্নীতির গভীর শিকড় উপড়ে ফেলা লক্ষ্য হয়ে থাকে, তাহলে কেন এত মামলা শেষ পর্যন্ত টেকেনি? আর যদি তদন্ত প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থেকে থাকে, তাহলে সেই দায় কে নেবে? এতে দুর্নীতি দমনের উদ্দেশ্যগত সততা নিয়ে বিরাট প্রশ্ন দেখা দেয়, যা নিরসন করা দরকার এবং ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে এমন উদ্দেশ্যমূলক ভুল করে মানুষকে হয়রানি বা প্রতিহিংসার শিকার করা থেকে মুক্ত রাখাও গণতান্ত্রিক আইনের শাসনের দায়িত্ব।
অতএব, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও মানবাধিকার রক্ষার দ্বন্দ্বসংক্রান্ত প্রশ্নগুলো শুধু অতীত নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটি রাষ্ট্র যদি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নেয়, তাহলে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি অনিবার্য হয়ে ওঠে। আবার ভুল সংশোধন করা না হলে অনেকেই সেই ভুলের সুযোগ নিজের সুবিধা অনুযায়ী নিতে পারে। এতে দুর্নীতি দমন বা আইনের শাসন কায়েম হয় না। বরং রাজনৈতিক স্বার্থে প্রতিহিংসার চর্চা অব্যাহত থাকে, যা গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।
দুর্নীতি দমন অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু তা হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত এবং মানবাধিকারের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল থেকে। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিজেই যদি আইনের সীমা অতিক্রম করে, তাহলে দুর্নীতি দমন নিজেই একটি অন্যায়ের রূপ নিতে পারে। তাই এর প্রথম শর্ত-আইনের কাঠামোর মধ্যে থাকা। দ্বিতীয়, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা। তৃতীয়, দুর্নীতি দমন প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগত পন্থা বজায় রাখা। চতুর্থ, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক আক্রোশ চরিতার্থ করার সব পথ ও পন্থা বন্ধ করা। সামগ্রিকভাবে, দুর্নীতি দমন তখনই কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হয়, যখন এটি আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং নিরপেক্ষতার ওপর দাঁড়িয়ে পরিচালিত হয়। অন্যথায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই নিজেই আরেক ধরনের অন্যায়ের জন্ম দেয়, যা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।
যদি সত্যিই গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের প্রতি আমাদের আস্থা থাকে, তাহলে এ কথা স্পষ্টভাবে স্বীকার করতে হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং মানবাধিকার রক্ষা একে অপরের বিপরীতমুখী নয়; বরং এরা পরস্পরের পরিপূরক। একটি সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থায় এ দুটি লক্ষ্য একই সূত্রে গাঁথা থাকে। কারণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন করে দুর্নীতি দমন করলে তা দীর্ঘস্থায়ী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না, আর দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে মানবাধিকারের কথা বলাও ভণ্ডামির শামিল। সুতরাং, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো, এ দুইয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা। যে রাষ্ট্র এ ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, সেখানেই প্রকৃত অর্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং গণতন্ত্র শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ায়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অতীতের অনেক সরকার এ ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার নামে কখনো কখনো আইনের সীমা লঙ্ঘন করা হয়েছে, আবার কখনো মানবাধিকারের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টা হয়েছে। এ বিচ্যুতিগুলোর কারণেই সেসব শাসনব্যবস্থা ‘ফ্যাসিবাদী’ বা ‘স্বৈরাচারী’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। কারণ, গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন নয়, এটি আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের সমন্বিত চর্চা।
বিপুল জনসমর্থনে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের সামনে ঐতিহাসিক দায়িত্ব হলো, অতীতের ভুল ও বিকৃতি থেকে সরে এসে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। অতীতের অন্যায় ও অপব্যবহারের সংস্কৃতি যদি থেকে যায়, তাহলে শাসকের পরিবর্তন হবে, শাসনব্যবস্থার চরিত্র বদলাবে না। তাই প্রয়োজন গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকারকে অবিচ্ছিন্নভাবে ধারণ করে দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধ করা।
প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)
mahfuzparvez.pol@cu.ac.bd
