জুলাই সনদ, বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট ও বিএনপি সরকার
Advertisement
মোবায়েদুর রহমান
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে আজ থেকে ঠিক ২ মাস আগে, ১৭ ফেব্রুয়ারি। এটি অবশ্যই একটি নির্বাচিত সরকার এবং এককভাবে ২১১টি আসন নিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ-সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকার। বিরোধী দলও অনুল্লেখযোগ্য নয়। তাদের সংখ্যা ৭৭। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর ৬৮, এনসিপির ৬। স্বয়ং স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ বলেছেন, এ সংসদে বিরোধী দল খুব শক্তিশালী। কারণ ৭৭ জন সদস্যের বিরোধী দল বাংলাদেশের পার্লামেন্টে খুব কমই এসেছে। বিরোধী দলের সবচেয়ে বড় চমক হলো, জামায়াতে ইসলামীর ৬৮ আসন লাভ, যদিও তারা দাবি করে, আরও কয়েকটি আসন তারা পেতেন। তবে ব্যালট পেপার টেম্পারিং করে তাদের আসন ছিনিয়ে নিয়েছে বিএনপি। তাদের দাবি হলো, ব্যালট টেম্পারিং না হলে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেত না।
জামায়াতের দাবি যাই হোক না কেন, বিএনপি যে কমফোর্টেবল মেজরিটি পেয়ে সরকার গঠন করবে, সেটি নির্বাচনের আগেই বোঝা গিয়েছিল। যতদূর জানি, তারেক রহমানও এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন এবং নিশ্চিত হয়েই কাদের নিয়ে তিনি কেবিনেট গঠন করবেন, তারও একটা ধারণা তার ব্রেনে ছিল। যে কারণে সরকার গঠনের পর ২৪ ঘণ্টাও সময় লাগেনি, তিনি ২৫ জন মন্ত্রী এবং ২৩ জন প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর বণ্টন করেছিলেন। অবশ্য পরে আহমেদ আযম খান পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী হওয়ার পর কেবিনেট মন্ত্রীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬। এ ছাড়া পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীর পদমর্যাদা ও বেতনসহ পাঁচ উপদেষ্টা এবং প্রতিমন্ত্রীর বেতন ও পদমর্যাদাসহ আরও পাঁচ উপদেষ্টা নিয়োগ করেছেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, তার কেবিনেটে প্রধানমন্ত্রীসহ রয়েছেন ৬০ জন মন্ত্রী ও উপদেষ্টা। বলা বাহুল্য, অনেকের কাছে এটি একটি মাথাভারী মন্ত্রিসভা মনে হয়েছে।
যাই হোক, প্রথমেই বলেছি, আজ বর্তমান সরকারের আয়ু হলো ২ মাস। একটি সরকারের হানিমুন পিরিয়ডই হয় সাধারণত ৩ মাস। কিন্তু এ সরকার ১ মাসের মাথাতেই কিছুটা ঝামেলায় পড়েছে বলে অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে। যুগান্তরও এ সম্পর্কে একাধিক দিন প্রথম পৃষ্ঠায় সংবাদ ছেপেছে।
একথা ঠিক, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা ব্রুট মেজরিটির জোরে সরকার অতি সহজেই এ ঝামেলা হয়তো কাটিয়ে উঠবে। কিন্তু ঝামেলার রেশ সংসদের বাইরে রয়েই যাবে। বলা বাহুল্য, এ ঝামেলাটি হলো, জুলাই সনদ ও গণভোট বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে। আমার দুঃখ হয়, পাকিস্তান সর্বজনগ্রাহ্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে যে ঝামেলায় পড়েছিল, সেই ঝামেলা তার ভেঙে যাওয়ার দিন পর্যন্তও মেটেনি। তারা ৯ বছর পর ১৯৫৬ সালে একটি শাসনতন্ত্র প্রবর্তন করে। কিন্তু দু’বছরের মাথাতেই সেই দেশে সামরিক আইন জারি হয় এবং সেই শাসনতন্ত্র বাতিল হয়। আইয়ুব খান সেই শাসনতন্ত্র বাতিল করেন এবং নিজে একটি শাসনতন্ত্র জারি করেন, যেটি ছিল প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির। ১৯৬৯ সালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান উভয় অঞ্চলে গণ-অভ্যুত্থানের পর জেনারেল ইয়াহিয়া ক্ষমতায় আসেন এবং আইয়ুব খানের শাসনতন্ত্র বাতিল করেন। অতঃপর ১৯৭০ সালে সারা পাকিস্তানে জীবনের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনটি হয় আইনগত কাঠামো বা লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কের (এলএফও) অধীনে। এ ইলেকশনের মাধ্যমে যে পার্লামেন্ট গঠিত হবে, তার কাজ হবে দুটি। প্রথমটি হলো, তারা পাকিস্তানের জন্য একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করবে। আবার একইসঙ্গে তারা সরকারও গঠন করবে।
নির্বাচন ঠিকই হয়। কিন্তু জাতীয় পরিষদের (আমরা বলি জাতীয় সংসদ) বা পার্লামেন্ট অধিবেশনে বসার কোনো সুযোগই পায়নি। দেশে ঘটে যায় ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউন এবং ৯ মাস পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বাংলাদেশেও সংবিধান রচনার জন্য কোনো গণপরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনটি হয়েছিল পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য। ওই নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান থেকে আওয়ামী লীগের যেসব সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগের যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাদের নিয়ে নির্বাহী আদেশ বলে গণপরিষদ গঠিত হয়। ১৯৭২ সালের নভেম্বরে তারা সংবিধান প্রণয়ন করে এবং ডিসেম্বরে সেই সংবিধান চালু হয়।
২.
কিন্তু ’৭২-এর সংবিধান সাড়ে ৩ বছরও টেকেনি। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে শেখ মুজিবুর রহমান এ সংবিধানের খোলনলচে পালটে শুধু প্রেসিডেন্ট পদ্ধতিই করেননি, বরং একদলীয় প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি করেন, যার নাম দেওয়া হয় বাকশাল। মুজিব সরকারের অপসারণের পর প্রথমে খন্দকার মোশতাকের সাড়ে ৩ মাসের সরকার থাকলেও মোশতাক সংবিধানকে অক্ষত রাখেন এবং নিজে প্রেসিডেন্ট হন। তার পর খালেদ মোশাররফের ৪ দিনের শাসন এবং অতঃপর জেনারেল জিয়ার প্রেসিডেনশিয়াল শাসন। জেনারেল জিয়া প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি বহাল রাখলেও একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা বাতিল করে বহুদলীয় গণতন্ত্র কায়েম করেন।
তারপর জেনারেল এরশাদ। ৯ বছর তিনি দেশ শাসন করেন এবং প্রেসিডেনশিয়াল সিস্টেম অব্যাহত রেখে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু রাখেন। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও জামায়াতের ১৮ জন সদস্যের সমর্থনে সরকার গঠন করেন। তবে জামায়াত তখন মন্ত্রিসভায় যোগদান করেনি। বেগম জিয়ার সরকার সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি থেকে বহুদলীয় পার্লামেন্টারি বা সংসদীয় পদ্ধতির সরকার চালু করেন। তার আমলেই মেয়াদ শেষের দিকে ১৯৯৬ সালে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থা চালু করেন।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালে কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি বাতিল করেন। এরপর থেকেই দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম দল জামায়াতে ইসলামী বহুবার বলে, এ সংবিধান তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বেগম জিয়া ওই সংবিধান ছুড়ে ফেলে দেবেন, এমন অনেক ভিডিও বক্তৃতা এখনো ইউটিউবে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
৩.
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের নাৎসিবাদী সরকার ছাল-বাকলসহ বিতাড়িত হলে এক নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। জুলাইয়ের গণজাগরণকে বিপ্লব বলুন বা অভ্যুত্থান, যাই বলুন না কেন, সেটি বর্তমান সংবিধান মেনে হয়নি। আর সে কারণেই বিপ্লবের অব্যবহিত পর সরকার গঠন নিয়ে জটিল সংকটের সৃষ্টি হয়। এ বিষয়টি আজ আমি বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ৮ আগস্ট রাত ৮টা পর্যন্ত দেশে কোনো সরকার ছিল না। তবে ৬ আগস্ট শেখ হাসিনার ‘আমি এবং ডামির’ মাধ্যমে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়; কিন্তু শেখ হাসিনার মনোনীত ও নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রয়ে যান। জাতীয় সংসদ ভেঙে দিলেও শেখ হাসিনার সংবিধান বাতিলও করা হয়নি বা স্থগিতও করা হয়নি।
৮ আগস্ট রাত ৮টায় ড. ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী বা ইন্টারিম সরকার গঠিত হয়, সংবিধানে তারও কোনো প্রভিশন নেই। ৬ আগস্ট নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেওয়া হয়। কে তাকে নিয়োগ দিলেন? সংবিধান মোতাবেক তো প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে তার নিয়োগ পাওয়ার কথা। সংবিধান এবং ইন্টারিম সরকার ও পরবর্তী ১৮ মাস এবং নির্বাচন নিয়েও অনেক প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে।
৪.
এ ধরনের অনেক প্রশ্ন আছে। সংবিধানের ১০৬ ধারার অধীনে সুপ্রিমকোর্টের যে পরামর্শ (Doctrine of Necessity) আনা হয়েছিল বলে বলা হচ্ছে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রেকর্ড থেকে বলা হচ্ছে যে, তখন নাকি স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, বিচারপতি ইনায়েতুর রহমানসহ কয়েকশ ভিআইপি নিরাপত্তার জন্য অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছিলেন।
যাই হোক, ইন্টারিম সরকার নিয়োজিত ঐকমত্য কমিশনও সংবিধানে নেই। ওই কমিশন ৯ মাস ধরে ম্যারাথন সেশনের পর যে জুলাই সনদ প্রণয়ন করে, সেই সনদের বাস্তবায়নের জন্য প্রেসিডেন্ট একটি বিশেষ অর্ডারের অধীনে নির্বাচন এবং সংস্কার পরিষদ অধ্যাদেশ জারি করেন। প্রেসিডেন্টের এ অধ্যাদেশটিকে বাস্তবায়ন আদেশ বলা হচ্ছে। আদেশে বলা হয়েছে, যারা নির্বাচিত হবেন, তারা দুটি শপথ গ্রহণ করবেন। একটি হলো, জাতীয় সংসদ-সদস্য হিসাবে। অন্যটি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে। এ অধ্যাদেশে জুলাই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোট ও এমপি নির্বাচন একই দিন অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটের পক্ষে ৬৯ শতাংশ ভোট পড়েছে; কিন্তু গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সদস্যরা এমপি হিসাবে শপথ নিয়েছেন, কিন্তু সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেননি। পক্ষান্তরে, বিরোধী দলের ৭৭ জন সদস্য দুটি শপথই নিয়েছেন। আর এখান থেকেই শুরু হয়েছে নতুন জটিলতা, নতুন সংকট। বিএনপি বলছে, ওই ধরনের আদেশ দেওয়ার কোনো ক্ষমতা সংবিধান প্রেসিডেন্টকে দেয়নি। আর বিরোধী দল বলছে, ওই আদেশ ছিল বিপ্লব থেকে উৎসারিত জনগণের ইচ্ছা ও সার্বভৌমত্বের প্রকাশ। গণভোটে ৬৯ শতাংশ ভোট দিয়ে জনগণ পুনর্বার তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সার্বভৌম ক্ষমতা আবারও প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার ওপর সংবিধান নয়; বরং সংবিধান জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার অধীন।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, সংকটটি হলো সংবিধান বনাম জনগণের ইচ্ছা বা সার্বভৌমত্ব। বিএনপি বলছে, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। অতএব এ পার্লামেন্ট যেখানে রয়েছে, সেখানে সংস্কার পরিষদের কোনো অস্তিত্ব নেই। এ মুহূর্তে আজ আমরা কোনো সুনির্দিষ্ট মতামত প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকলাম। তবে এটুকু বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি আর পার্লামেন্টে থাকছে না। আশা করা হয়েছিল, আগামীতে হয়তো সংসদেই রাজনৈতিক বিরোধের ফয়সালা হবে। কিন্তু তার সম্ভাবনা দিনের পর দিন ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সরকার কতগুলো আইন পাশ করেছে। আর ইন্টারিম সরকারের ২০ অর্ডিন্যান্স হয় বাতিল করেছে, না হয় সেগুলো অকার্যকর হয়ে গেছে। গণভোট, সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি নিয়োগ, সুপ্রিমকোর্টের স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, গুম অধ্যাদেশ, মানবাধিকার ও দুদক অধ্যাদেশ ইত্যাদি হয় বাতিল, না হয় অকার্যকর হয়েছে। আবার ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন পাশ করা হয়েছে। এগুলো নিয়ে শুধু যে বিরোধী দলগুলোই সমালোচনা করছে, তাই নয়, বরং সুধীসমাজের অনেকে এবং মূলধারার সংবাদপত্রের সিংহভাগ সমালোচনায় মুখর হয়েছে।
দেখা যাচ্ছে, আবার মূল ইস্যু অর্থাৎ সংবিধান নিয়েই বিতর্ক শুরু হয়েছে। এ বিতর্ক আর বাড়তে দেওয়া উচিত নয়। বাড়তে দিলে অনেক দূর যাবে। তারেক রহমানের সরকার নির্বাচিত সরকার। মানুষের আশা, তারা জনগণের নাড়ির স্পন্দন শুনতে পারবেন। জনপ্রত্যাশা পূরণে তারা প্রচেষ্টার কোনো কার্পণ্য করবেন না-সেটিই সবাই আশা করে।
মোবায়েদুর রহমান : সিনিয়র সাংবাদিক
