ক্রীড়া গবেষণা ও অর্থনীতিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা
Advertisement
ড. মোহাম্মদ শাহেদুর রহমান
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রতিবছর বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উদ্ভাবন শুধু গবেষণাগার, পেটেন্ট বা আইনি সুরক্ষার বিষয় নয়; এটি মূলত একটি প্রযুক্তিগত ধারণাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া। ২০২৬ সালের বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবসের প্রতিপাদ্য ‘Ready, Set, Innovate’. বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য এটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে প্রতিভা আছে, সম্ভাবনা আছে; কিন্তু উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিক সফলতায় রূপ দেওয়ার কাঠামো এখনো দুর্বল।
এ প্রতিপাদ্যকে তিনটি ধাপে ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, আমাদের হতে হবে Read-অর্থাৎ জ্ঞান, গবেষণা, দক্ষতা, অবকাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতিতে সমৃদ্ধ। দ্বিতীয়ত, হতে হবে Set-অর্থাৎ মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, শিল্প-একাডেমিক অংশীদারত্ব এবং বাণিজ্যিকীকরণের উপযুক্ত কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, আমাদের Innovate করতে হবে-গবেষণাকে বাস্তব পণ্য, প্রযুক্তি, সেবা এবং অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। এ যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো ক্রীড়াজগৎ।
আজকের খেলাধুলা আর শুধু মাঠের লড়াই নয়। আধুনিক ক্রীড়া এখন গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ দ্বারা পরিচালিত হয়, পুষ্টিবিজ্ঞানের সমর্থন পায়, পেটেন্ট দ্বারা সুরক্ষিত হয় এবং শিল্পের মাধ্যমে বাজারে পৌঁছায়। একজন খেলোয়াড় ট্রফি হাতে তুললেও তার পেছনে থাকেন বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, পুষ্টিবিদ, ডেটা বিশ্লেষক এবং উদ্ভাবকরা। ক্রীড়া এখন একটি বিশাল বৈশ্বিক শিল্প, যেখানে পারফরম্যান্স অ্যানালিটিক্স, ওয়্যারেবল প্রযুক্তি, ইনজুরি প্রতিরোধ ব্যবস্থা, স্পোর্টস নিউট্রিশন, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জুতা, স্মার্ট সরঞ্জাম, পুনর্বাসন প্রযুক্তি, সম্প্রচার প্রযুক্তি এবং স্টেডিয়াম ব্যবস্থাপনা-সবকিছুই মেধাস্বত্বনির্ভর।
বিশ্বে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা পেটেন্টে রূপ নিয়েছে, পরে তা বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়ে খেলাধুলার ধারা বদলে দিয়েছে। যেমন Gatorade sports drink, যা University of Florida-এর গবেষণাগারে জন্ম নিয়েছিল। গবেষকরা দেখেছিলেন, দীর্ঘ সময় খেলাধুলায় শরীর থেকে পানি ও ইলেকট্রোলাইট বেরিয়ে যাওয়ায় খেলোয়াড়দের কর্মক্ষমতা কমে যায়। সেই সমস্যা সমাধানে তৈরি হয় কার্বোহাইড্রেট-ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ পানীয়। গবেষণাটি পেটেন্ট হয়, পরে লাইসেন্সের মাধ্যমে শিল্পে যায়, আর আজ তা বিশ্বব্যাপী ক্রীড়াবিদদের অপরিহার্য পণ্য।
একইভাবে ফুটবলে Catapult Sports-এর জিপিএসভিত্তিক ওয়্যারেবল প্রযুক্তি খেলোয়াড়দের দৌড়, গতি, ক্লান্তি ও ইনজুরির ঝুঁকি পরিমাপ করে। কোচরা মাঠে সিদ্ধান্ত নেন এ ডেটার ভিত্তিতে। ক্রিকেটে Hawk-Eye প্রযুক্তি আম্পায়ারের সিদ্ধান্তকে আরও নির্ভুল করেছে। অ্যাথলেটিক্সে কার্বন-প্লেটযুক্ত রানিং-শু বিশ্ব রেকর্ড ভাঙার আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এসব উদাহরণ আমাদের শেখায়-গবেষণা প্রতিযোগিতামূলক অ্যাডভান্টেজ বা সুবিধা তৈরি করে, পেটেন্ট সেই সুবিধাকে সুরক্ষিত করে, আর শিল্প তাকে বাজারে পৌঁছে দেয়।
বাংলাদেশে খেলাধুলার প্রতি মানুষের আবেগ অসীম। ক্রিকেট জাতীয় আবেগের কেন্দ্র, ফুটবল আমাদের ঐতিহাসিক অনুভূতির অংশ। অ্যাথলেটিক্স, ব্যাডমিন্টন, শুটিংসহ বিভিন্ন খাতেও সম্ভাবনা বাড়ছে। কিন্তু যখন আমরা দেখি খেলোয়াড়দের ব্যবহৃত জুতা, সাপোর্ট সিস্টেম, নিউট্রিশন সাপ্লিমেন্ট, রিকভারি ডিভাইস, ওয়্যারেবল প্রযুক্তি-এসব কোথা থেকে আসে, তখন উত্তরটি সহজ: অধিকাংশই আমদানি করা।
জয়ী হলে আমরা বিজয় উদযাপন করি। বিজয়ের আনন্দ এদেশের প্রতিটি নাগরিক ভাগ করে নিই। মাঠ বা ট্র্যাকের খেলোয়াড়দের সঙ্গে আমাদের আবেগ ভাগ করে নিই। এর পেছনে থাকা কোচসহ সিলেকশন কমিটি, এমনকি রাষ্ট্রযন্ত্রকেও উদ্বেলিত হতে দেখি। আর পরাজিত হলে সব দোষ হয় শুধু খেলোয়াড়ের, ক্ষেত্রবিশেষে কোচের। আর কারও দায় নেই যেন; কিন্তু জয় বা পরাজয় না, সমগ্র ক্রীড়াঙ্গনের পেছনের উদ্ভাবন কাঠামো নিজেরা তৈরি করি না। পুরো কাঠামোটিকে নিয়ে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টতা এবং গবেষণা প্রয়োজন। কেননা যে দেশে শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয় আছে, দক্ষ গবেষক আছে, ক্রমবর্ধমান শিল্প খাত আছে, সেই দেশ কেন ক্রীড়া প্রযুক্তির শুধু ভোক্তা হবে, উদ্ভাবক হবে না?
বাংলাদেশে অন্তত তিনটি সরকারি এবং দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্পোর্টস সায়েন্স, ফিজিক্যাল এডুকেশন বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম চালু আছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক; কিন্তু এসব কারিকুলাম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষা সীমাবদ্ধ রয়েছে শারীরিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, ফিটনেস ব্যবস্থাপনা এবং খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স সহায়তায়। এগুলো অবশ্যই জরুরি। কিন্তু আধুনিক ক্রীড়া অর্থনীতির যে চাহিদা সেখানেও আলোকপাত করা উচিত। দেশে ব্যাট-বলের কিছু ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও বেশির ভাগ সময় এদের বিদেশি সিল লাগিয়ে বিক্রি করতে হয়। কারণ, এ শিল্পে Made in Bangladesh-এর জায়গা নেই। এর পেছনের দায় কিন্তু আমাদেরই। কারণ, কোথায় স্পোর্টস টেকনোলজি? কোথায় স্পোর্টস বায়োমেকানিক্সভিত্তিক পণ্য উন্নয়ন? কোথায় ওয়্যারেবল সেন্সর প্রযুক্তি? কোথায় স্পোর্টস নিউট্রিশন পণ্যের ফর্মুলেশন? কোথায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ফুটওয়্যার ডিজাইন? কোথায় ডেটা অ্যানালিটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং পেটেন্ট? কোথায় স্টার্টআপ ইনকিউবেশন? আমরা খেলোয়াড়দের সহায়তা করার জন্য জনবল তৈরি করছি; কিন্তু এমন উদ্ভাবক তৈরি করছি না, যারা নতুন প্রযুক্তি ও পণ্য তৈরি করবে। এখন সময় এসেছে ‘শারীরিক শিক্ষা’ থেকে ‘ক্রীড়া উদ্ভাবন ইকোসিস্টেমে’ যাওয়ার। এর অর্থ শারীরিক শিক্ষা বাদ দেওয়া নয়; বরং তার সঙ্গে প্রকৌশল, পুষ্টিবিজ্ঞান, বায়োটেকনোলজি, উপাদান বিজ্ঞান, তথ্য বিশ্লেষণ, মেধাস্বত্ব ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নকে যুক্ত করা।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, উদ্ভাবনের ইঞ্জিন হতে হবে। এজন্য জাতীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী অংশীদারত্ব অপরিহার্য। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক হওয়া উচিত। যৌথ গবেষণা, ইনজুরি বিশ্লেষণ, পুষ্টি গবেষণা, প্রযুক্তি পরীক্ষণ এবং ডেটাভিত্তিক প্রশিক্ষণব্যবস্থার উন্নয়নে এ সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।
একইভাবে শিল্প খাতকেও এ খেলায় নামতে হবে। এপেক্স ফুটওয়্যার, বাটার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু পণ্য বিক্রি করবে না, তাদের গবেষণায় বিনিয়োগ করতে হবে। কেন বাংলাদেশ শুধু বিদেশি স্পোর্টস শু আমদানি করবে? কেন আমরা নিজস্ব খেলোয়াড়দের উপযোগী পারফরম্যান্স ফুটওয়্যার তৈরি করব না? কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে স্মার্ট ওয়্যারেবল, ক্রিকেট সুরক্ষা সরঞ্জাম, রিকভারি পণ্য, স্পোর্টস নিউট্রিশন এবং জলবায়ু উপযোগী পারফরম্যান্স পোশাক তৈরি হবে না? উদ্দেশ্য হওয়া উচিত খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বাড়ানোর জন্য নিজস্ব উদ্ভাবিত পণ্য। এমন পণ্য দরকার, যা হবে নিবিড়ভাবে মানসম্মত, যা আমাদের খেলোয়াড়কে স্মার্টভাবে অনুশীলন করতে এবং নিজ দল বা দেশের জন্য প্রতিযোগিতা করতে সাহায্য করবে। মেধাস্বত্ব এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনো আইপিকে আনুষ্ঠানিকতা হিসাবে দেখে। এ মানসিকতা বদলাতে হবে। পেটেন্ট ছাড়া শিল্পসংশ্লিষ্টরা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না। প্রযুক্তি হস্তান্তর ছাড়া গবেষণা জার্নালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে। প্রতিটি গবেষণামুখী বিশ্ববিদ্যালয়ে শক্তিশালী আইপি নীতি, পেটেন্ট সহায়তা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ব্যবস্থা এবং স্টার্টআপ সহায়তা কাঠামো থাকা জরুরি। প্রকাশনা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু প্রকাশনা যথেষ্ট নয়। একটি গবেষণাপত্র স্বীকৃতি দিতে পারে, কিন্তু একটি পেটেন্ট জাতীয় সম্পদ তৈরি করতে পারে। আর একটি পণ্য পুরো অর্থনীতিকে পরিবর্তন করতে পারে।
বাংলাদেশ এখন এমন একসময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে জ্ঞানভিত্তিক শিল্পই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। ক্রীড়া উদ্ভাবন কোনো ছোট বিষয় নয়-এটি স্বাস্থ্য, উৎপাদন, ব্র্যান্ডিং, যুব উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অংশ। এখানেই তৈরি হতে পারে নতুন শিল্প, দক্ষ কর্মসংস্থান, রপ্তানিযোগ্য পণ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক স্টার্টআপ এবং জাতীয় গর্ব।
আমরা কি শুধু বৈশ্বিক ক্রীড়া উদ্ভাবনের দর্শক হয়ে থাকব, নাকি নিজেরাই উদ্ভাবনের স্রষ্টা হব? যদি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিতে চাই, তাহলে কাজ শুরু করতে হবে এখনই। আমাদের গবেষণায় প্রস্তুত হতে হবে-Ready. আমাদের কৌশলে সুরক্ষিত হতে হবে-Set. এবং আমাদের উদ্ভাবনে এগিয়ে যেতে হবে-Innovate। বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবসে এটাই হোক বাংলাদেশের অঙ্গীকার।
ড. মোহাম্মদ শাহেদুর রহমান : আইপি এবং টেকনোলজি ট্রান্সফার স্পেশালিস্ট; অধ্যাপক, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
