দেশের ভবিষ্যৎ ভিত্তি স্থাপনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
Advertisement
ড. শাহ জে মিয়া
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় ল্যাবরেটরির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং এবং জটিল অ্যালগরিদম নিয়ে দিন কাটলেও আমার হৃৎস্পন্দন সব সময় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রামের উর্বর পলিমাটির বদ্বীপের উন্নয়নের চিন্তা নিয়ে। সদ্য গঠিত নতুন সরকার এবং সরকারের বিভিন্ন সেক্টরে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য পরামর্শ দেওয়ার জায়গা থেকে লেখা আজকের এ নিবন্ধকে একটি নতুন আইসিটি সিস্টেম উন্নয়নের রূপকল্প হিসাবে দেখা যেতে পারে। স্বচ্ছ রাষ্ট্র পরিচালনার লক্ষ্য সামনে রেখে যার নাম আমি ‘তথ্যচালিত অ্যাগ্রিগেটেড ইনোভেশন সিস্টেম’ হিসাবে অভিহিত করছি।
আমার প্রস্তাবিত এই ‘অ্যাগ্রিগেটেড ইনোভেশন সিস্টেম’ কোনো অলীক কল্পনা নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও বাস্তবায়নযোগ্য আইসিটি ব্যবস্থাপনার রোডম্যাপ। এ পরিকল্পনার মূলে রয়েছে প্রচলিত পদ্ধতিগত দুর্নীতি দূর করে একটি স্বচ্ছ, দক্ষ ও জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এ রোডম্যাপ বা রূপকল্পের মাধ্যমে আমরা দেশকে এমন একটি ‘এআই-পাওয়ার্ড স্টেট’ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তথ্যের সার্বভৌমত্ব সংরক্ষিত থাকবে। যার মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিক ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তাদের ব্যক্তিগত বা সামাজিক প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি সেবা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকনিক্যাল সাপোর্ট এবং ইন্টেলিজেন্ট লার্নিং নিশ্চিন্তে গ্রহণ করতে পারবে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের যে কোনো ছোট বা মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক তার ছোট্ট ব্যবসাকে আন্তর্জাতিক মানে করার জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইবিএম থেকে যে কোনো সময় প্রয়োজনীয় এআই প্রশিক্ষণ বা যন্ত্রপাতি নিতে পারবে।
আইসিটির এ রূপকল্পের মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে এমন এক পরিবর্তনের কথা বলছি যেখানে আমরা আমাদের নিজস্ব সিস্টেমস নিজেরাই তৈরি করব। আর এ রূপান্তরের মাধ্যমেই আমরা বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব তৈরি সিস্টেমস, যেমন এগ্রি-টেক এবং এআই সলিউশন রপ্তানিকারক দেশ হিসাবে পরিচিতি লাভ করতে পারব। এ রূপকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ কেবল আধুনিক হবে না, বরং এটি বিশ্বমঞ্চে উদ্ভাবনের দিকপাল হিসাবে নেতৃত্ব দেবে।
আমাদের রূপকল্পটি পাঁচটি কৌশলগত স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা একটি আধুনিক ও বুদ্ধিমান রাষ্ট্র হিসাবে আমাদের কাজ করতে সাহায্য করবে। স্তম্ভগুলো হলো-সার্বভৌম এআই, জাতীয় ক্লাউড অবকাঠামো, সাইবার কমান্ড, ব্লকচেইনভিত্তিক শাসন এবং মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব। আমাদের প্রস্তাবিত এ রূপকল্পটির পেছনে থাকবে একটি মেধাভিত্তিক নেতৃত্বের পুল। এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিশেষজ্ঞ গবেষক ও প্রযুক্তিবিদদের সরাসরি নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করে একটি শক্তিশালী ইন্টেলেকচুয়াল অ্যাডভাইজরি ক্যাপিটাল তৈরি করবে।
বর্তমান যুগে সাইবার যুদ্ধের ময়দান ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে ডিজিটাল পরিকাঠামোয় বিস্তৃত হয়েছে। তাই আমাদের তথ্যের প্রতিটি স্তরে জিরো-ট্রাস্ট নিরাপত্তা নীতি অনুসরণ করতে হবে। এ নিরাপত্তা ডকট্রিনের মূল কথা হলো, রাষ্ট্রের নেটওয়ার্কের অভ্যন্তরে বা বাইরে কোনো ট্রাফিক বা অনুরোধকেই যাচাই ছাড়া প্রশ্নহীনভাবে নিরাপদ ভাবা হবে না। আমাদের এ রূপকল্পের মাধ্যমে প্রতিটি ডিজিটাল লেনদেন এবং ডেটা ইন মোশন বা চলমান তথ্যকে একটি কেন্দ্রীয় সার্বভৌম মনিটরিং ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে যাতে অননুমোদিত ব্যবহারের কোনো সুযোগ না থাকে। আমাদের এ রূপকল্পটি একটি প্রকৃত স্বচ্ছ ও জনবান্ধব প্রশাসনের কথা বলছে, যা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্ল্যাক বক্স বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের অস্পষ্টতা কাটিয়ে গ্লাস বক্স গভর্ন্যান্স (সরকারের সর্বকাজের স্বচ্ছতা) মডেলে যাচ্ছে।
যাহোক, এ মডেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে, যেমন: কোনো টেন্ডার বাতিল, ঋণের আবেদন প্রত্যাখ্যান বা লাইসেন্স অনুমোদন; তখন কেন সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট যৌক্তিক ব্যাখ্যা ও একটি নিখুঁত ডিজিটাল অডিট ট্রেইল সংরক্ষিত থাকবে। সরকারি কর্মকর্তারা যে কোনো সময় যাচাই করে দেখতে পারবেন ঠিক কোন নিয়মের ভিত্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজ করেছে, যা প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। গ্লাস বক্স গভর্ন্যান্স পদ্ধতির মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে সরকারি তহবিলের অপব্যবহারের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো আগেভাগেই শনাক্ত করে দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রিডিক্টিভ অডিটিং-এর পথ প্রশস্ত করবে।
কৃষি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃৎস্পন্দন। আমাদের রূপকল্পটি বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান খাদ্য রপ্তানিকারক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করবে। এ রি-মডেলিংটি মাঠ পর্যায়ে ড্রোন এবং আইওটি সেন্সর ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের রোগবালাই শনাক্তকরণ ও মাটির আর্দ্রতা পরিমাপে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষকরা কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে দেবে। এ প্রযুক্তিটি কেবল তথ্য প্রদানকারী বা নির্দেশের অপেক্ষায় থাকা কোনো সাধারণ ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একজন সক্রিয় এবং স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল সহকর্মী হিসাবে কাজ করার সক্ষমতা রাখে।
সুশাসনের ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তির প্রয়োগ ম্যানুয়াল বা পুরোনো আইসিটির ব্যবস্থাপনার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে নাগরিক সেবাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ এস্তোনিয়ার ‘বুরোক্র্যাট’ সিস্টেমের কথা বলা যেতে পারে, যা নাগরিকদের পাসপোর্ট নবায়ন বা পারমিট-সংক্রান্ত জটিল ও মাল্টি-স্টেপ কাজগুলো পর্দার আড়ালে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে এক নিমিষেই সম্পন্ন করে দেয়। সিঙ্গাপুরের ‘লাইফএসজি’ বা ‘আস্ক জেমি’ এবং যুক্তরাজ্যের পুলিশবাহিনীতে ব্যবহৃত ‘ববি’ নামক স্বয়ংক্রিয় এজেন্টগুলো ২৪ ঘণ্টা নাগরিকসেবা প্রদান করছে, যা প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলোর কাজের চাপ প্রায় ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে। এজেন্টিক এআই-এর এই স্বায়ত্তশাসন মূলত জটিল নিয়মকানুন ও আইনি বাধ্যবাধকতা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম, যা সরকারি দপ্তরের ফাইলের স্তূপ কমাতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে সহায়ক।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জনমতকে সরাসরি নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে আমাদের রূপকল্পে ‘সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিক্স’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আমার তৈরি এই সিস্টেমে একটি ‘বাবল ম্যাপ’ বা বুদ্বুদ মানচিত্রের মাধ্যমে রিয়েল-টাইমে দেখানো সম্ভব হয় কোন অঞ্চল থেকে কোনো বিশেষ সরকারি নীতি নিয়ে ইতিবাচক বা নেতিবাচক সেন্টিমেন্ট আসছে। যেমন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা রাজনৈতিক আলোচনার প্রধান কেন্দ্র হলেও চট্টগ্রামে ব্যঙ্গাত্মক নেতিবাচক মন্তব্যের হার বেশি, যা নীতিনির্ধারকদের তাদের ভুলত্রুটি শুধরে জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে সহয়তা করে। এ প্রযুক্তি নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে যে আস্থার সংকট রয়েছে তা দূর করতে একটি স্বচ্ছ আয়না হিসাবে কাজ করবে।
এ রূপকল্পটি বর্তমান সরকারের সুনির্দিষ্ট জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে বলে আমার বিশ্বাস। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আমাদের কৃষকদের ও তরুণদের অদম্য পরিশ্রম মিলে আমরা গড়ে তুলব একটি স্বনির্ভর, টেকসই ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। এ রূপান্তরের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হবে আমাদের স্বপ্নের উন্নত ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের সেবা ও অধিকার প্রযুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত হবে। আমাদের তরুণ প্রজন্মই হবে এই পরিবর্তনের অগ্রনায়ক এবং তারাই নির্ধারণ করবে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের আগামী দিনের নেতৃত্ব।
ড. শাহ জে মিয়া : প্রফেসর অব বিজনেস এনালিটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড এআই, নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া; উপদেষ্টা, বিএনপি অস্ট্রেলিয়া
