Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

হালফিল বয়ান

বঙ্গোপসাগরে ক্ষমতার শক্তিমঞ্চ

Icon

ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গোপসাগরে ক্ষমতার শক্তিমঞ্চ

Advertisement

বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সমুদ্র কেবল বাণিজ্য কার্যক্রম বা নৌযাত্রার ক্ষেত্র নয়, ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা, জ্বালানি, প্রযুক্তি, ক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর এখন ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংযোগ রাজনীতির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র বা ক্ষমতার রঙ্গমঞ্চ হয়ে উঠেছে। এ বাস্তবতায় ভারতের সাম্প্রতিক নৌ-কূটনৈতিক তৎপরতা-বিশেষত ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল দীনেশ ত্রিপাঠীর মিয়ানমার সফর শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় ঘটনা নয়; বরং এটি বঙ্গোপসারকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর সামুদ্রিক কৌশল পুনর্বিন্যাসের অংশ।

ভারতের উদ্যোগ ও আয়োজন দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না, ভারত ভবিষ্যতের আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য বাড়াতে আগ্রহী। কারণ, আগামী দিনে শক্তির মানদণ্ড অনেকাংশে নির্ধারিত হবে সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ, বন্দর অবকাঠামো, সামুদ্রিক নজরদারি ও উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা সম্পর্কের মাধ্যমে। এজন্য ভারত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে তাদের একমাত্র ত্রিবাহিনী কমান্ডকে শক্তিশালী করছে, যা পূর্ব ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে ভারতের ‘ফরোয়ার্ড অপারেশনাল প্ল্যাটফর্ম’ হিসাবে কাজ করছে।

বাংলাদেশের জন্য এ পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এখন আর শুধু দক্ষিণ এশিয়ার প্রান্তিক অবস্থান নয়; বরং এটি ভারত মহাসাগরীয় ভূরাজনীতির কেন্দ্রীয় সংযোগস্থলে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রশ্ন হচ্ছে-ভারতের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের করণীয় কী হওয়া উচিত? এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনা করা দরকার। যেমন-প্রথমত, বাংলাদেশকে ‘সামুদ্রিক রাষ্ট্র’ হিসাবে তার জাতীয় কৌশল পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের নিরাপত্তা চিন্তা ছিল স্থলকেন্দ্রিক; কিন্তু এখন দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, নীল অর্থনীতি, সমুদ্রবন্দর, সাবমেরিন ক্যাবল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ সমুদ্রনির্ভর। ফলে বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা প্রশ্ন এখন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।

দ্বিতীয়ত, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে ‘ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল’ গ্রহণ করতে হবে। ভারত বাংলাদেশের নিকটতম বৃহৎ প্রতিবেশী এবং নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও সংযোগে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আবার চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় অংশীদার। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসাবে বঙ্গোপসাগরে সক্রিয়। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর নীতি হবে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি নির্ভরশীলতা নয়’-অর্থাৎ বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলা। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে আধুনিকীকরণ এখন বিলাসিতা নয়, অপরিহার্যতা। বঙ্গোপসাগরে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা বাড়ার অর্থ হলো ভবিষ্যতে সামুদ্রিক নজরদারি, সাবমেরিন কার্যক্রম, সাইবার-মেরিটাইম নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক গোয়েন্দা সক্ষমতার গুরুত্ব বাড়বে। তাই শুধু যুদ্ধজাহাজ ক্রয় নয়, উপগ্রহভিত্তিক নজরদারি, ড্রোন প্রযুক্তি, উপকূলীয় রাডার নেটওয়ার্ক এবং তথ্যসমন্বিত নৌ-কমান্ড গড়ে তোলা জরুরি।

চতুর্থত, বাংলাদেশের উচিত আঞ্চলিক সামুদ্রিক কূটনীতিতে সক্রিয় হওয়া। BIMSTEC, IORA এবং জাতিসংঘের সামুদ্রিক কাঠামোগুলোকে ব্যবহার করে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরকে ‘সহযোগিতার অঞ্চল’ হিসাবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে পারে। কারণ যদি বঙ্গোপসাগর কেবল শক্তির প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়, তাহলে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলো সবচেয়ে বেশি কৌশলগত চাপের মুখে পড়বে। এজন্য বাংলাদেশকে আগাম সতর্ক ও প্রস্তুত থাকতে হবে।

পঞ্চমত, বাংলাদেশের নীল অর্থনীতি কৌশলকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনতে হবে। সমুদ্রসম্পদ, গভীর সমুদ্রবন্দর, মৎস্যসম্পদ, অফশোর গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সামুদ্রিক পর্যটন-এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়লেও এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সুবিধা পুরোপুরি নিতে সক্ষম হবে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-বাংলাদেশকে কোনো শক্তি-প্রতিযোগিতার ‘ফ্রন্টলাইন রাষ্ট্র’ হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। ইতিহাস দেখায়, ছোট রাষ্ট্র যখন বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অতিরিক্তভাবে একপক্ষীয় অবস্থান নেয়, তখন তাদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের শক্তিমত্তা হওয়া উচিত তার ভৌগোলিক অবস্থানকে ‘সংঘাতের সেতু’ নয়, ‘সংযোগের সেতু’ হিসাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে লাভজনক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে অনাগত ভবিষ্যতের আলোকে দূরদৃষ্টিতে সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি। কারণ, বঙ্গোপসাগর কেবল সমুদ্র নয়; এটি ভবিষ্যৎ এশীয় ভূরাজনীতির পরীক্ষাগার। এখানে ভারতের উপস্থিতি বাড়বে, চীনের আগ্রহও অব্যাহত থাকবে এবং পরাশক্তির অংশগ্রহণে ইন্দো-প্যাসিফিক রাজনীতি আরও জটিল হবে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রয়োজন দূরদর্শী কৌশল, সামুদ্রিক সক্ষমতা এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি। কেননা, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি অনেকাংশেই নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে তার সামুদ্রিক ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে কাজে লাগাতে পারে তার ওপর। পাশাপাশি, বঙ্গোপসাগরের নতুন ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ প্রস্তুত কিনা, এমন প্রশ্নেরও ইতিবাচক উত্তর দিতে হবে।

দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় বঙ্গোপসাগর কেবল আঞ্চলিক জলসীমা পেরিয়ে বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র রূপে আবির্ভূত হচ্ছে। এখানে সামুদ্রিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহণ, সাবমেরিন কৌশল, নৌ-অবকাঠামো, ডিজিটাল কেবল নেটওয়ার্ক এবং সামরিক উপস্থিতির প্রশ্ন একে নতুন কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এ বাস্তবতায় ভারতের ক্রমবর্ধমান নৌ-উপস্থিতি, চীনের বন্দরকেন্দ্রিক কৌশল, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা কাঠামো এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান-সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এ অবস্থায়, প্রশ্ন হচ্ছে-বাংলাদেশ কি এ নতুন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত?

সত্য কথা হলো, বাংলাদেশ আংশিকভাবে প্রস্তুত হলেও পূর্ণাঙ্গভাবে নয়। গত এক দশকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাবমেরিন সংযোজন, সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি এবং গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়নের মাধ্যমে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে; কিন্তু ভূরাজনীতি এখন শুধু সামরিক শক্তির প্রশ্ন নয়। এটি প্রযুক্তি, তথ্য, সামুদ্রিক গোয়েন্দা, অর্থনৈতিক সংযোগ ও কৌশলগত জোটের প্রশ্নও। সেই জায়গায় বাংলাদেশকে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।

ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূলে একটি ‘কৌশলগত বাফার’ এবং একইসঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশপথ। অন্যদিকে চীনের কাছে বাংলাদেশ হলো ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক অংশীদার। ফলে ঢাকা এখন এমন এক অবস্থানে, যেখানে প্রতিটি সামুদ্রিক সিদ্ধান্ত বৃহৎ শক্তিগুলোর নজরে পড়বে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে-বাংলাদেশ কি ভারতের সমান্তরালে চীন, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার সঙ্গে নৌ-সম্পর্ক বাড়াবে? উত্তরটি হওয়া উচিত : ‘হ্যাঁ, তবে ভারসাম্যপূর্ণ ও কৌশলগতভাবে।’ কারণ-প্রথমত, চীনের সঙ্গে নৌ-সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য বাস্তবিক প্রয়োজনের অংশ। কেননা, বাংলাদেশের নৌবাহিনীর আধুনিকায়নে চীনের ভূমিকা ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ। সাবমেরিন, ফ্রিগেট, নৌপ্রযুক্তি ও সামরিক প্রশিক্ষণে বেইজিং বড় অংশীদার; কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। যদি বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা অবকাঠামো এককভাবে চীনা প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তা ভবিষ্যতে কৌশলগত চাপ তৈরি করতে পারে। তাই চীনের সঙ্গে সহযোগিতা প্রয়োজন, কিন্তু সেটি হতে হবে বহুমাত্রিক অংশীদারত্বের অংশ হিসাবে-একচেটিয়া নয়। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের সঙ্গে সীমিত নৌ-কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানো অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জলদস্যুতা প্রতিরোধ ও মানবিক সহায়তায় দক্ষিণ এশিয়ায় বহুপাক্ষিক সহযোগিতা দরকার; কিন্তু বাংলাদেশকে অবশ্যই বুঝতে হবে, ঢাকা-ইসলামাবাদ ঘনিষ্ঠতা ভারত অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। ফলে এ সম্পর্ককে পেশাদার সামুদ্রিক সহযোগিতা ও বহুপাক্ষিক অনুশীলনের মধ্য দিয়ে পরিচালিত করাই বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে। তৃতীয়ত, শ্রীলংকা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। কারণ শ্রীলংকা ইতোমধ্যে ভারত-চীন প্রতিযোগিতার বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। হাম্বানটোটা বন্দর ইস্যু দেখিয়েছে কীভাবে ঋণ, বন্দর ও ভূরাজনীতি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। বাংলাদেশের উচিত শ্রীলংকার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া-বিশেষত বন্দর ব্যবস্থাপনা, ঋণ-কূটনীতি এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ক্ষেত্রে নিজস্ব নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে যাবতীয় কার্যক্রম গ্রহণ ও পরিচালনা করা।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হবে ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা বহুস্তরীয় সম্পর্কনীতি। অর্থাৎ, বাংলাদেশ ভারত, চীন, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, জাপান, তুরস্ক, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এবং মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমান্তরাল সামুদ্রিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে, কিন্তু কোনো একক নিরাপত্তা বলয়ে প্রবেশ করবে না। এটি অনেকটা ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ার কৌশলের মতো-যেখানে তারা প্রতিযোগী শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করেই সব ধরনের ভারসাম্য তৈরি করে। অতএব, সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কী করা উচিত, তা চিহ্নিত করা দরকার। এক্ষেত্রে-

প্রথমত, একটি পূর্ণাঙ্গ ‘জাতীয় সামুদ্রিক কৌশল’ প্রণয়ন জরুরি। বর্তমানে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প থাকলেও একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি সামুদ্রিক নিরাপত্তা নীতি দৃশ্যমান নয়, যা থাকা অত্যাবশ্যক। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে শুধু প্রতিরক্ষামূলক বাহিনী নয়, ‘মেরিটাইম স্ট্র্যাটেজিক ফোর্স’ হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সাবমেরিন প্রতিরোধ সক্ষমতা, সামুদ্রিক ড্রোন, স্যাটেলাইট নজরদারি, উপকূলীয় রাডার নেটওয়ার্ক, সাইবার-মেরিটাইম নিরাপত্তা এবং গভীর সমুদ্র অপারেশন সক্ষমতা। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের কূটনীতিকে স্থলভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে ‘সামুদ্রিক কূটনীতি’তে রূপান্তর করতে হবে। বঙ্গোপসাগরভিত্তিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংলাপ, যৌথ নৌ-মহড়া, দুর্যোগব্যবস্থাপনা ও ব্লু-ইকোনমি সহযোগিতায় বাংলাদেশ নেতৃত্বমূলক ভূমিকা নিতে পারে। চতুর্থত, বাংলাদেশকে বন্দর উন্নয়ন ও বিদেশি বিনিয়োগে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। বন্দর শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি কৌশলগত সম্পদও। ফলে কোনো বিদেশি শক্তির দীর্ঘমেয়াদি একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বা সামরিক ব্যবহারযোগ্যতা তৈরি হয়-এমন চুক্তি থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।

সবশেষে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ‘ভারসাম্য রক্ষা’। কারণ ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে নিকটবর্তী শক্তি; চীন সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদারদের একটি; যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বাজার, পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার নিরিখে আরেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। তদুপরি, বঙ্গোপসাগর হয়ে উঠছে বৈশ্বিক শক্তি-রাজনীতির নতুন কেন্দ্র। এ জটিল বাস্তবতায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কৌশলগত ধৈর্য, বহুমুখী কূটনীতি এবং সামুদ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকেই বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করতে হবে। ফলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে ‘সামুদ্রিক রাষ্ট্র’ হিসাবে সক্ষমভাবে নিজেকে পুনর্নির্মাণ করতে হবে; তা করতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশকে বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার প্রান্তিক দর্শক হয়ে থাকতে হবে।

প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

সরকারের শক্তি বক্তব্যে নয়, সুশাসনে হতে হবে

সরকারের শক্তি বক্তব্যে নয়, সুশাসনে হতে হবে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : সম্ভাবনা, সংকট ও মানবজাতির ভবিষ্যৎ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : সম্ভাবনা, সংকট ও মানবজাতির ভবিষ্যৎ

মাদক আর সন্ত্রাস রাজনৈতিক সহোদর

মাদক আর সন্ত্রাস রাজনৈতিক সহোদর

অন্যমত জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে

জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম