Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

জাপানের দরজা খুলছে : দরকার দক্ষতা

Advertisement

Icon

ড. জাহাঙ্গীর আলম

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জাপানের দরজা খুলছে : দরকার দক্ষতা

Advertisement

জাপানের বর্তমান জনতাত্ত্বিক সংকট কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক শ্রমবাজারের সমীকরণে একটি অভাবনীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ‘জাপান টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৪০ সাল নাগাদ জাপানে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ কর্মক্ষম জনশক্তির ঘাটতি দেখা দেবে। এ বিশাল শূন্যস্থান পূরণে জাপান সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার থেকে ১২ লাখ বিদেশি কর্মী নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার এবং জাতীয় সমৃদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ হতে চলেছে।

জাপানের এ বিশাল চাহিদা মেটাতে সরকার একটি সুনির্দিষ্ট এবং পর্যায়ক্রমিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ২০২৬ সালে ২ হাজার, ২৭ সালে ৬ হাজার, ২৮ সালে ১২ হাজার, ২৯ সালে ৩০ হাজার এবং ২০৩০ সাল নাগাদ ৫০ হাজার কর্মী পাঠানোর একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ চূড়ান্ত করেছে। এরই মধ্যে নেপাল ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬০ হাজারেরও বেশি কর্মী পাঠিয়ে এই বাজারে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। নেপালের এই সাফল্যের মূলে রয়েছে তাদের নিবিড় জাপানিজ সংস্কৃতি শিক্ষা এবং নেটিভ প্রশিক্ষকদের ব্যবহার।

২০২৯ সালের মধ্যে জাপানের মোট চাহিদার অন্তত ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ৩ লাখের বেশি দক্ষ জনশক্তি সরবরাহ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ। বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, ভাষাগত দুর্বলতা এবং কারিগরি প্রস্তুতির অভাব আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। এ কারণে এটিকে কেবল প্রশাসনিক কাজ হিসাবে না দেখে ‘জাতীয় কর্মসূচি’ হিসাবে বিবেচনা করা জরুরি।

জাপানের সংশোধিত শ্রমনীতির অধীনে বর্তমানে ১৬টি খাতে ‘স্পেসিফাইড স্কিলড ওয়ার্কার’ (SSW) ভিসায় কর্মী নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। আগে বাংলাদেশের জন্য মাত্র ৬টি খাত উন্মুক্ত থাকলেও, এখন ১৬টি খাতের সবকটিতেই মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।

সেই লক্ষ্য পূরণে সরকার আগামী পাঁচ বছরের জন্য ১ লাখ কর্মীর যে কৌশলগত ব্রেকডাউন তৈরি করেছে, তাতে নির্মাণ খাতে ৪০ হাজার, শিল্প উৎপাদন বা কলকারখানা খাতে ২০ হাজার, কেয়ারগিভার (নার্সিং কেয়ার) খাতে ২০ হাজার এবং অটোমোবাইল ও কৃষি খাতে ২০ হাজার কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া নতুন যুক্ত হওয়া মোটরযান পরিবহণ (বাস/ট্যাক্সিচালক), রেলওয়ে, বনায়ন এবং কাঠ শিল্প বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

সব খাতের মধ্যে জাপানের বার্ধক্যজনিত সংকটের কারণে কেয়ারগিভার খাতের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এই খাতে একজন কর্মীর মাসিক বেতন ১ লাখ ৭৬ হাজার থেকে আড়াই লাখ ইয়েন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

এ পেশায় কেউ জাপানে যেতে চাইলে তাকে জেএলপিটি এন-ফোর (JLPT-N4) বা জেএফটি-বেসিক (JFT-Basic)-এর পাশাপাশি অবশ্যই ‘নার্সিং কেয়ার জাপানিজ ল্যাঙ্গুয়েজ ইভ্যালুয়েশন টেস্ট’ এবং ‘কেয়ার ওয়ার্কার স্কিলস ইভ্যালুয়েশন টেস্ট’-এ উত্তীর্ণ হতে হবে। ৫ বছর কাজের পর জাতীয় লাইসেন্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে এসএসডব্লিউ-২ (SSW-2) ভিসার মাধ্যমে পরিবারসহ স্থায়ীভাবে জাপানে বসবাসের সুযোগ পাওয়াও সম্ভব।

বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের অন্যতম অঙ্গীকার হিসাবে জাপানের শ্রমবাজার ধরাকে একটি শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে বিএমইটি (BMET)-এর অধীনে জাপানি ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা ৩৩টি থেকে বাড়িয়ে বর্তমানে ৫৩টিতে উন্নীত করা হয়েছে।

বেসরকারি অংশীদারত্বের মধ্যে সাভারের বিরুলিয়ায় ‘কাওয়াই গ্রুপ জাপান লিমিটেড’ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ২২ বিঘা জমির ওপর আবাসিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি একটি আদর্শ মডেল হিসাবে কাজ করছে, যেখানে সরাসরি জাপানিজ নেটিভ শিক্ষকদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

প্রার্থীদের জন্য আর্থিক ও আইনি সংস্কারের বন্দোবস্তের মধ্যে অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ৯৫টিতে উন্নীত করা হয়েছে। তাদের জন্য পূর্বের ১৫ লাখ টাকার জামানতের শর্তও শিথিল করা হয়েছে। অভিবাসন ব্যয় কমাতে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এছাড়া স্টুডেন্ট মাইগ্রেশন পাইপলাইন সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্যে ২০২৬ সালের মধ্যে ১০ হাজার শিক্ষার্থী পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টা কাজের আইনি সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এই শিক্ষার্থীদের এসএসডব্লিউ-১ বা ২ ক্যাটাগরিতে রূপান্তর করে একটি ‘সেলফ-ফান্ডেড ট্রেনিং মডেল’ তৈরি করা হচ্ছে।

তবে এত ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যেও বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তার মধ্যে ভাষা শিক্ষা ও দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাব অন্যতম। জাপানের বাজারে প্রবেশের প্রধান অন্তরায় প্রযুক্তিগত দক্ষতার চেয়েও বেশি ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক শিষ্টাচার (Etiquette)। নেপালের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো জাপানিজ শিক্ষকদের মাধ্যমে এই বাধা অতিক্রম করছে, যেখানে বাংলাদেশ এখনো প্রশিক্ষক সংকটে ভুগছে। দেশে ৫৩টি টিটিসিতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চললেও পর্যাপ্ত নেটিভ প্রশিক্ষক না থাকায় সঠিক উচ্চারণ ও জাপানি কর্মসংস্কৃতি (Workplace Culture) অর্জনে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

রয়েছে তথ্যের অভাব ও মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল শ্রেণির লোভনীয় হাতছানি। সঠিক তথ্যের অভাবে আগ্রহী কর্মীরা দালাল বা অসাধু এজেন্সির খপ্পরে পড়ে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। জাপানি নিয়োগকর্তারা মূলত বিশ্বাস ও মানের (Trust and Quality) ওপর ভিত্তি করে কর্মী নিয়োগ দেন। দক্ষ কর্মীর অভাবে এজেন্সিগুলো চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কর্মী পাঠাতে সময় নিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

জাপানের শ্রমবাজারে দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্য বজায় রাখতে হলে ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’ (Brand Bangladesh) গড়ে তোলা অপরিহার্য। হুটহাট কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে একটি সুসংগঠিত শ্রম কূটনীতি (Labor Diplomacy) প্রয়োজন। তাছাড়া কর্মীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ। এ বিষয়ে একটি সুপারিশমালা তুলে ধরা হলো-

শ্রম কূটনীতি : টোকিও দূতাবাসের শ্রম উইংকে শক্তিশালী করে সরাসরি জাপানি নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত মিটিং ও নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে হবে।

প্রশিক্ষণ আধুনিকায়ন : ১৬টি খাতের জন্য জাপানি প্রযুক্তিনির্ভর ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA)-এর সার্টিফিকেশনকে জাপানি কর্তৃপক্ষের কাছে সরাসরি গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে।

‘জাপানিজ স্ট্যান্ডার্ড’ ল্যাব ও ওয়ার্কশপ স্থাপন : কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে (TTC) যেসব পুরোনো বা সনাতন ধাঁচের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়, তা দিয়ে জাপানের ফ্যাক্টরিগুলোর সঙ্গে তাল মেলান অসম্ভব। এজন্য জাপানের শিল্প কারখানাগুলোতে বর্তমানে যেসব আধুনিক CNC (Computer Numerical Control) মেশিন, রোবোটিক আর্ম বা অটোমেটেড এসেম্বলি লাইনের ব্যবহার হচ্ছে, সেগুলো সরকারের উদ্যোগে অন্তত প্রধান প্রধান টিটিসিগুলোতে স্থাপন করতে হবে।

জাপানিজ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে ‘ট্রেন দ্য ট্রেইনার’ (ToT): আমাদের প্রশিক্ষকদের জাপানের আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং তাদের কাজের সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা দিতে জাপানি বিশেষজ্ঞদের সরাসরি বাংলাদেশে এনে টিটিসি শিক্ষকদের জন্য বিশেষ মাস্টার-ট্রেনিং সেশনের আয়োজন করতে হবে।

নেটিভ প্রশিক্ষক নিয়োগ : নেপালের মডেল অনুসরণ করে প্রতিটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে জাপানি নেটিভ শিক্ষক নিয়োগ বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং জাপানিজ কর্মসংস্কৃতির ওপর নিবিড় ওরিয়েন্টেশন প্রদান করতে হবে।

বাংলাদেশ যদি এ সমন্বিত এবং জরুরি কৌশলগত পদক্ষেপগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ কর্মীতে রূপান্তরের মাধ্যমে ২০৪০ সালের মধ্যে জাপানের বিশাল শ্রম চাহিদার ৩০-৪০ শতাংশ পূরণ করা এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করা নিশ্চিতভাবেই সম্ভব।

ড. জাহাঙ্গীর আলম : চেয়ারম্যান, জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

E-mail: [email protected]

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

খেলাপি ঋণের সংকট ও সমাধান

খেলাপি ঋণের সংকট ও সমাধান

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বার্তা : এখন কূটনৈতিক বাস্তবায়নের পালা

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বার্তা : এখন কূটনৈতিক বাস্তবায়নের পালা

চাকরির আবেদনের সময়সীমা বাড়ানো কতটা জরুরি

চাকরির আবেদনের সময়সীমা বাড়ানো কতটা জরুরি

সরকারের শক্তি বক্তব্যে নয়, সুশাসনে হতে হবে

সরকারের শক্তি বক্তব্যে নয়, সুশাসনে হতে হবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম