খাল খনন কর্মসূচি : দূর হবে বেকারত্বও
নির্মল চক্রবর্তী
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নদ-নদী খাল বিল ঝিলের দেশ বলে চির খ্যাত আমাদের বাংলাদেশ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ এখন আর সেদিন নেই, নেই নদ-নদীর সেই অস্তিত্ব। খাল শুকিয়ে গেছে। শুকনো মৌসুমে সেখান দিয়ে মানুষ এখন হেঁটে চলাচল করে, যা সত্যিই এখন ভাবনার বিষয়।
মানুষের দখল দূষণ এবং প্রাকৃতিক নানাবিধ কারণেই যে আমাদের নদী-নালা খাল বিল ঝিল শুকিয়ে যাচ্ছে, নাব্য হারাচ্ছে, মরে যাচ্ছে বিলীন হচ্ছে তথা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ছে। এ নিয়ে সর্বপ্রথম ভেবেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৪৭ বছর আগে ১৯৭৯ সালের ১ ডিসেম্বর তার মরহুম বাবার সূচিত কর্মসূচি অনুসরণ করে আবার শুরু করেছেন খাল খননের কর্মসূচি। মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীঘেঁষা খশাদহ খাল খননের উদ্বোধন করেছিলেন। বিগত দিনের সরকার এ কাজ এগিয়ে নিয়ে যায়নি। নতুন করে এ খাল খনন কর্মসূচি সারা দেশে প্রাণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। জিয়াউর রহমান তার বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে খাল খননকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। চালু করেছিলেন ইরিগেশন পদ্ধতি। এতে করে পানির অভাব দূর হয়েছিল এবং বছরে ৩ ফসলি ইরি ধান উৎপাদন করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছিলেন তিনি।
রাজনৈতিক পালা বদলের পরিক্রমায় গণতান্ত্রিক ধারায় এবার দেশ পরিচালনায় এসেছেন তারই সুযোগ্য উত্তরাধিকারী তারেক রহমান। এবার তিনিও তার বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সেই খাল খনন কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। যাতে করে খেত খামারে পানি সেচের জন্য আর হাপিত্যেশ করতে না হয়, নির্ভরশীল হতে না হয় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের গঙ্গার পানির ওপর।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতায় এসেই এর মধ্যে যশোর সিলেটসহ দেশের প্রায় ৬০টি জেলার নদ-নদী, খাল, বিল খননের কাজ শুরু করেছেন। শুধু তাই নয়, ১৮০ দিনের মধ্যে তার শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। জেলা প্রশাসক ও মন্ত্রণালয়ের ইঞ্জিনিয়ারদের মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। তার কারণ হচ্ছে আবার কেউ যেন আর দখল করতে না পারে দূষণ করতে না পারে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ২০ হাজার কিলোমিটার নদ-নদী ও খাল খনন ও পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য রয়েছে যা কিনা পাঁচ বছরের মধ্যেই সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হবে।
এ ছাড়া খাল খননের সময় নদীর প্রবাহ ঠিক রাখতে ভাটি এলাকা থেকে খনন শুরু করা হয়েছে, শুধু তাই নয় খননকৃত মাটি যেন বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে আবার খাল ভরাট না করতে পারে এজন্য খননকৃত মাটি দূরে ফেলতে হবে। যেমন স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, মাদ্রাসা, সরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাজে লাগাতে হবে। এসব কাজে সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত করা হবে, যাতে তাদেরও কর্মসংস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
খনন কাজে আধুনিক ড্রেজারের পাশাপাশি ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ শ্রমিক ব্যবহারের নির্দেশ রয়েছে। এতে স্থানীয় বেকারত্ব দূর হবে এবং অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ গ্রামের দিকে আকৃষ্ট হবে। কারণ এখানে আয়ের পথ প্রশস্ত হবে।
সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার দপ্তরে একটি মনিটরিং সেল খুলেছেন, যেখান থেকে তিনি সব খোঁজখবর রাখছেন। যাতে করে বর্ষা মৌসুমে কোনো ঘরবাড়ি, কোনো মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ, মন্দির-গির্জা নদীগর্ভে বিলীন না হয়ে যায়।
একসময় মনে করা হতো পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পানিতে বা নদীতে বা জলাশয়ে বোল্ডার ফেলা প্রটেকশন। যা ছিল এক মহাচুরির আখড়া। এক্ষেত্রে কিছু কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন কোনো ঠিকাদার ইচ্ছামতো আর বোল্ডার ফেলতে পারবেন না। কারণ সেই বোল্ডারের একটা মান থাকতে হবে। সিমেন্ট পাথর ও বালুর একটা পরিমাণ থাকবে। সরকারের একটা টাস্কফোর্স রয়েছে বুয়েটের প্রকৌশলীদের নেতৃত্বে। সেখানে ইঞ্জিনিয়ার আছেন, যারা সেখানে যাবেন। ঘটনাস্থল থেকে তারা বোল্ডার নিয়ে এসে পরীক্ষা করে দেখবেন মান ঠিক আছে কিনা। যদি ঠিক থাকে তবেই তারা ফেলতে দেবেন। তা না হলে প্রকল্পের বাজেট বন্ধ করে দেওয়া হবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আগের সেই চুরি-ডাকাতির দিন আর থাকছে না। আগে যেখানে ৮০টি বোল্ডার ফেলে একশটির কথা বলে চালানো যেত, এখন আর তা করা যাবে না। অথবা ৫০টি ফেলে ১০০টি বলে চালানো হতো, সেদিনের কথা ভুলে যেতে হবে। এখন সে দুরবস্থা নিরসনের জন্য সংশ্লিষ্ট এমপি-মন্ত্রীদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সংশ্লিষ্ট এলাকায় বড় করে সাইনবোর্ড টানিয়ে বোল্ডারের সংখ্যা উল্লেখ করে দেওয়া হচ্ছে। এতে করে এলাকার সবার চোখে প্রকৃত তথ্য পড়বে এবং চুরির মহোৎসব আর হবে না।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শুরু করা এ মহৎ কর্মসূচিকে যদি তার সুযোগ্য ছেলে বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এভাবে জনপ্রতিনিধি ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর হাতে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারেন, তবে অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন। নদী-নালা খাল বিল আর শুকিয়ে যাবে না, জনগণের বেকার সমস্যা দূর হবে। সর্বোপরি ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার কিংবা হঠাৎ করে বন্যার পানি ছেড়ে দেওয়ার ফলে যে মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হয়, তা থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাওয়া যাবে।
নির্মল চক্রবর্তী : কবি ও সাংবাদিক
