শতফুল ফুটতে দাও
আত্মঘাতী সাম্প্রদায়িকতা ভারতের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতে এখন মুসলমান ও বাংলাদেশকে ঘিরে যা কিছু ঘটছে এবং যেসব উসকানিমূলক বক্তব্য হাজির করা হচ্ছে, তাতে মনে হয় না অদূরভবিষ্যতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নতুন করে সুসম্পর্কের সূচনা হবে। ভারত তার ক্ষুদ্র প্রতিবেশী বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বিবেচনা করে না। ভারতের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। ভারত যতদিন সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের প্রতি তার নীতিনির্ধারণ না করবে, ততদিন এ দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে উঠবে না।
ইদানীংকালে ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রদর্শন চরম রূপ পরিগ্রহ করেছে। ভারতের একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান সেনাপতি অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার হুমকি দিয়েছেন। এ অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। অবশ্য ভারতের এ ধরনের আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী নীতি নতুন কিছু নয়। ১৯৪৭-এর আগস্টে ভারতে যখন দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্রের উত্থান হয়, তখন জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, ঘটনাটি একটি সাময়িক ঘটনামাত্র। সময়ের প্রবাহে ভারত বিভাগ মুছে যাবে। এছাড়া ওই সময় কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকেও অখণ্ড ভারতের পক্ষে প্রস্তাব পাশ করা হয়েছিল। এককথায় বলা যায়, ভারত কখনোই দক্ষিণ এশিয়ার ভূখণ্ডে ভারতের পাশে কোনো পৃথক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মেনে নেয়নি। ভারতীয় নেতৃত্বের লালিত অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার অর্থ হলো, পাকিস্তান অর্জনের জন্য যারা রক্ত দিয়েছে এবং তারপর ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যে লাখ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছে, তাদের আত্মত্যাগ ব্যর্থ হয়ে যাবে। বাংলাদেশের কোনো দেশপ্রেমিক মানুষ এই ব্যর্থতা মেনে নিতে পারে না এবং হতে দিতে পারে না।
ভারতকে আধিপত্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্র হিসাবে গণ্য করা হয়। এর পেছনে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য আছে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তার ‘Discovery of India’ গ্রন্থে ভারতকে সংজ্ঞায়িত করেছেন সাংস্কৃতিক ভারত (Cultural India) হিসাবে। এ সাংস্কৃতিক ভারতের বিস্তার মধ্য এশিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোচীন পর্যন্ত। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়াও অন্তর্ভুক্ত। যেসব দেশে ভারতীয় ডায়াস্পোরা আছে, সেসব দেশও সাংস্কৃতিক ভারতের অন্তর্ভুক্ত। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে ফিজি ও দক্ষিণ আমেরিকার গায়ানা। ফিজিকে ভারত তার স্যাটেলাইট স্টেট হিসাবে গণ্য করে। ফিজির জনগোষ্ঠী দুভাগে বিভক্ত। এর একটি হলো ফিজির আদিবাসীরা এবং অন্যটি হলো সেখানে বসতি স্থাপনকারী ভারতীয়রা। ফিজির সিভিল সোসাইটিতে শিক্ষাদীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্প-সংস্কৃতিতে ভারতীয়রা প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। অন্যদিকে ফিজির ক্ষুদ্র সামরিক বাহিনীতে সেখানকার আদিবাসীদের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়। ১৯৮৮ সালের দিকে ফিজির সামরিক নেতা রাম্বুকা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। ফিজির আদিবাসী জনগণ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর, সে কারণে তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করতে পারে না। ফিজিতে এ দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত আছে। ভারত সরকার ও ফিজির ভারতীয় ডায়াস্পোরা স্থানীয় আদিবাসীদের অধিকারের স্বীকৃতি দিতে চায় না। ভারত ফিজিকে ভারত মহাসাগরের একটি আউট পোস্ট হিসাবে গণ্য করে।
ভারতের রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামে রাজা অশোকের প্রতিচ্ছবি রয়েছে। হিন্দু ভারতের রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামে বৌদ্ধ অশোকের প্রতিচ্ছবির তাৎপর্য কী? ভারত দেখাতে চায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীপ্রধান দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের একটি নাড়ির যোগ আছে। এ নাড়ির যোগকে পুঁজি করে ভারত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোকে নিজ প্রভাবের চৌহদ্দিতে (Sphere of influence) পরিণত করতে চায়। এভাবেই ভারত তার সুপ্ত কিংবা ব্যাপ্ত আধিপত্যবাদী অভিলাষকে কার্যকর করতে চায়। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে পেরেছেন একদিকে তার চণ্ড দমননীতি দ্বারা, অন্যদিকে নির্লজ্জ ভারত তোষণের মাধ্যমে। তিনি নিজেই বলেছেন, ভারতকে যা দিয়েছি, ভারত তা চিরদিন মনে রাখবে। তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন বলেছিলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর মতো। এর চেয়ে নির্লজ্জ ভারততোষণ আর কী হতে পারে? ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতারা ভারতের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বহাল তবিয়তেই আছেন। তারা সেখান থেকে বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা চালাচ্ছেন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা ধরনের মিথ্যা প্রচারণা ও বাগাড়ম্বর চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশে সহস্রাধিক মানুষ হত্যা এবং কয়েক হাজার মানুষকে পঙ্গু করার জন্য এদের কোনো অনুশোচনা নেই। এদেরই উসকানিতে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা দিবস ২৩ জুন দেশে থাকা আওয়ামী লীগের কর্মীরা কিছু নাশকতা ঘটিয়ে তাদের অস্তিত্ব ঘোষণার পাঁয়তারা করছিল। কিন্তু একটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল হিসাবে তাদের এ পাঁয়তারা ছিল সম্পূর্ণ বে-আইনি। সরকার এরকম তৎপরতা যাতে না ঘটতে পারে, এর জন্য যথেষ্ট নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। ভুলে গেলে চলবে না, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন অব্যাহত থাকতে পেরেছে ভারতের প্রত্যক্ষ সমর্থনের ফলে। ভারত মনে করেছে, শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে পারলে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ভারতের স্বার্থে যাচ্ছেতাইভাবে ব্যবহার করা যাবে। সে আয়োজনও সম্পন্ন করা হয়েছিল। ভারত শেখ হাসিনার বদান্যতায় বাংলাদেশে যেসব ফায়দা হাসিল করেছিল, তা সবারই প্রায় জানা। সুতরাং, সে বিষয়ে আলোকপাত করে এ লেখাটির কলেবর বৃদ্ধি করতে চাইছি না।
অতিসম্প্রতি ভারত বাংলাদেশি নাগরিক অজুহাত দেখিয়ে অনেক বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখায় জড়ো করে বাংলাদেশে একের পর এক পুশইনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয় বিএসএফ পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ সীমান্তজুড়ে এ অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। অথচ আইনের দৃষ্টিতে এরকম পুশইন অচল। ভারতে যদি সত্যি সত্যি বাংলাদেশি নাগরিকদের অনুপ্রবেশ ঘটে থাকে, তাহলে সঠিক পদক্ষেপ হলো এদের আইনে সোপর্দ করা এবং দুই রাষ্ট্রের কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নাগরিকত্ব চিহ্নিত করা। কিন্তু অমানবিকভাবে খোলা আকাশের নিচে শিশু, নারীসহ এই মানুষগুলোকে সীমান্তের শূন্যরেখায় জড়ো করা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক! ইসরাইলের পর ভারতই একমাত্র দেশ, যে দেশ আদম সন্তানদের নিয়ে এমন বর্বরতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। শুধু তাই নয়, সীমান্ত হত্যাও অব্যাহত রেখেছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গঠনের পর সেখানকার মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর ভয়াবহ অত্যাচার ও উৎপীড়ন শুরু হয়েছে। কুরবানির ঈদের সময় মুসলমানরা গরু কুরবানি করতে পারেনি। মুসলমানদের মসজিদ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিজেপির লেলিয়ে দেওয়া সমাজবিরোধীরা অগ্নিসংযোগ করেছে। বিশেষ করে পুশইনের মহড়া শুরু হয়েছে বাংলাদেশের প্রাধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের প্রাক্কালে। ভারত জানান দিতে চায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর তাদের কাছে পছন্দনীয় নয়। তারা চেষ্টা করছে বাংলাদেশের ওপর সর্বোতভাবে চাপ প্রয়োগের। ভারতের কোনো কোনো নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বিজেপি নেতা বাংলাদেশের রংপুর জেলা দখল করে তাদের উত্তর-পূর্ব ভারতে যাওয়ার পথ সংকীর্ণ চিকেন নেককে প্রশস্ত করার, এমনকি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের জড়ো করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি হিন্দু প্রদেশ স্থাপনেরও উসকানি দিচ্ছেন। এমন কোনো সাম্প্রদায়িক উসকানি নেই, যা ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপির তরফে উচ্চারিত হয়নি। এসব উসকানির মূল লক্ষ্য বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সংঘর্ষ উসকে দেওয়া। যদি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ উসকানিতে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নিধন চলছে বলে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার-প্রচারণা চালানো হবে। এমনকি এ ইস্যু জাতিসংঘে উত্থাপন করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের তরফে পুলিশি অ্যাকশন গ্রহণের মওকা খোঁজা হবে। এমন ক্রিটিক্যাল মুহূর্তে বিশ্বসভায় বাংলাদেশের সৎ উদ্দেশ্য ও সদাচারের পক্ষে বয়ান তুলে ধরতে হবে। বিশ্বজনমতকে ভারত যদি প্রভাবিত করতে সক্ষম না হয়, তাহলেই শুধু বাংলাদেশ বিরাট দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পাবে।
কথায় বলে, দুর্জনের ছলের শেষ নেই। অতিসম্প্রতি মানবতাবাদী বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একসময়ের উপাচার্য স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে ঐতিহাসিক ‘সোহরাওয়ার্দী’ অ্যাভিনিউয়ের নাম বদলে রাখা হয়েছে ‘গোপাল মুখার্জি’ রোড। এই গোপাল মুখার্জি ওরফে গোপাল পাঁঠা হচ্ছে একজন পাঁঠার মাংসের কসাইয়ের নাম। এ কষাই ১৯৪৬-এর দাঙ্গায় শত-সহ্রস কলকাতাবাসী মুসলিমকে হত্যা করেছিল। বিজেপি তার পরিচয়বাদী রাজনীতি চর্চার নামে একজন দাঙ্গাবাজ কসাইয়ের নামে কলকাতার রাজপথের নামকরণ করছে। চরম সাম্প্রদায়িক অধঃপতনের দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে! ভারতের এই জাত-পাতের রাজনীতি এবং জঘন্য সাম্প্রদায়িকতা আত্মঘাতী বিপর্যয়ে পর্যবসিত হতে পারে।
ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

