তিনি কোথায় মানাবেন
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন। জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে তিনি নিজেই জানিয়েছেন, তিনি অসুস্থ, তাই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
দেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় রাষ্ট্রপতির একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা আছে, তা আমরা সবাই জানি। তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমান সংসদীয় ব্যবস্থায় পদটি মূলত আলংকারিক। তাকে বঙ্গভবনের আনুষ্ঠানিকতাতেই বেশি দেখা যায়। রাষ্ট্রের প্রকৃত নির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে; রাষ্ট্রপতিকে সেই কাঠামোর ভেতরে থেকেই কাজ করতে হয়। সাংবিধানিক সংকটে রাষ্ট্রপতি এগিয়ে আসতে পারেন-এটা সত্য; তবে এ সংকট তৈরি হোক, তা কেউ কাম্য করে না।
রাষ্ট্রপতি পদটি আসলে কোনো ক্ষমতার আসন, নাকি এক ধরনের সম্মানজনক নিঃসঙ্গতা-এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে দেখা যায়, পদটি বরং দ্বিতীয়টিরই কাছাকাছি। রাষ্ট্রপতিকে নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরে থাকতে হয়; রুটিন প্রশাসনিক কাজের বাইরে তার হাতে তেমন কিছু থাকে না। যিনি এ আসনে বসেন, তিনি রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের মধ্যে বন্দি হয়ে পড়েন এবং দলীয় রাজনীতিতে সরাসরি অংশ নিতে পারেন না। সংবিধান তাকে দলনিরপেক্ষ থাকার বাধ্যবাধকতা দেয়; ফলে যিনি সারাজীবন দলীয় রাজনীতির মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন, তার জন্য এ নিরপেক্ষতা আসলে এক ধরনের রাজনৈতিক অবসরই বটে।
বর্তমানে সরকারপ্রধান ও বিএনপি চেয়ারম্যান দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সার্বক্ষণিক সক্রিয় রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর বিকল্প কোনো নেতা যেহেতু নেই, সেহেতু আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক-উভয় ক্ষেত্রেই যিনি তাৎক্ষণিক সঠিক পরামর্শটা দিতে পারবেন, সেই ব্যক্তিটি হলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি সমাজের সব ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল ও নেতার কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক এক ব্যক্তিত্ব।
এ পরিস্থিতিতে এখন প্রশ্ন উঠেছে, পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন? গণমাধ্যমের খবরে বিএনপির অভ্যন্তরে তিন থেকে চারজনের নাম ঘুরপাক খাচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। এ তালিকায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নাম দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এটি স্বাভাবিক, কারণ প্রায় দেড় দশক ধরে দলকে এক সুতোয় গেঁথে রাখার কৃতিত্ব তার। কঠিন সময়ে দলীয় কর্মীদের পাশে থাকা, রাজনৈতিক জুলুম-নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যাওয়া এবং বারবার আত্মগোপনে থেকেও দলকে সংগঠিত রাখার চেষ্টা-এসবই তার রাজনৈতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দলের প্রয়াত চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসাবে তার অবস্থান নিয়ে বিতর্ক নেই বললেই চলে।
উপরন্তু একটি রাজনৈতিক পরিভাষা সৃষ্টি করেছেন মির্জা ফখরুল, যার চূড়ান্ত প্রকাশ এসেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন ফেরেন লন্ডন থেকে, তারপর। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো দলীয় ও সরকারপ্রধান প্রতিপক্ষকে টার্গেট করে রাজনৈতিক অভিসন্ধিমূলক বক্তব্য দেননি, যার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ রাজনীতির একটি যথোচিত চিত্রপট আমাদের মনোপটে ইতোমধ্যে স্থান পেয়েছে।
সাংবাদিকতার ইতিহাসে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, এবিএম মূসা, নির্মল সেন, এনায়েত উল্লাহ খান যেমন কিংবদন্তিতুল্য হয়ে আছেন, তেমনি বর্তমানে জীবিত ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় রাজনীতিবিদদের মধ্যে অন্যতম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার ব্যাপারে প্রতিপক্ষের প্রতি কখনো কোনো অশ্লীল বা কটু মন্তব্য করার নজির নেই। এ সর্বজনশ্রদ্ধেয় মানুষের কাছে জাতীয় সংকটে বাংলাদেশ নির্দ্বিধায় যেতে পারে; আবার দলীয় সব নেতাকর্মীর জন্যও তার দরজা সবসময় খোলা থাকে-এ কথা সবাই জানেন।
বিএনপির মহাসচিবের নেতৃত্বগুণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি সংঘাতের রাজনীতিতেও সংযমী থেকেছেন, প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংলাপের পথ বন্ধ করেননি এবং দলের ভেতরের বিভিন্ন মতের মধ্যে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছেন। এ গুণগুলো একজন রাজনীতিকের জন্য অত্যন্ত জরুরি-তা ঠিক; কিন্তু এগুলো ব্যবহার করার সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা কি বঙ্গভবন, নাকি সক্রিয় নীতিনির্ধারণী কোনো আসন? এ প্রশ্নটাই এখানে মূল।
ইতিহাস এখানে কিছু শিক্ষা দেয়। দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর-উত্তম) ও পরবর্তী সময়ে দলীয়প্রধান বেগম খালেদা জিয়া দলের প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে তার জ্ঞান ও সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতি বানিয়েছিলেন; কিন্তু রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর সেই সম্পর্কে যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত দলের জন্য এবং বিস্তৃত অর্থে রাজনীতির জন্যও সুখকর হয়নি।
ক্ষমতার আসনে বসার পর দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া নতুন কিছু নয়, বরং এটাই বঙ্গভবনের স্বাভাবিক চরিত্র! যিনি একদিন দলের প্রাণকেন্দ্রে ছিলেন, তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ধীরে ধীরে দলের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার বাইরে চলে যান; কারণ সাংবিধানিক অবস্থান তাকে সেই দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য করে। এ প্যাটার্ন শুধু বাংলাদেশে নয়, সংসদীয় গণতন্ত্রের অনেক দেশেই দেখা যায়-যেখানে সক্রিয় রাজনীতিবিদকে আলংকারিক রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে বসালে তার রাজনৈতিক প্রভাব বরং কমে যায়, বাড়ে না।
যিনি রাষ্ট্রপতি হন, তার কাছে সাধারণ মানুষ বা নির্যাতিত দলীয় কর্মীরা সহজে পৌঁছাতে পারেন না। যে মানুষটি এতদিন রাজপথে কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, কারাগারে যাওয়া নেতার পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন-তাকে যদি নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরে বন্দি করে দেওয়া হয়, তবে তা আসলে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান দিকটাকেই অকার্যকর করে দেওয়ার শামিল।
তাহলে কীভাবে তাকে প্রকৃত অর্থে সম্মানিত করা যায়? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বেশ কয়েকটি বাস্তবসম্মত পথ সামনে আসে। ১৯৮০ সালে টানা ১০ মাস বৃষ্টি না হওয়ায় সৃষ্টি হওয়া সংকটে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর-উত্তম দলের তৎকালীন দুই সিনিয়র নেতা-মহাসচিব অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছিলেন, যাতে তারা বিশ্বব্যাংক ও ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা করে খাদ্য গুদাম নির্মাণের জন্য অর্থের সংস্থান করতে পারেন। আবার দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে শীর্ষ সংগঠন ‘সার্ক’ গঠন প্রক্রিয়ার সময় দলের সিনিয়র নেতা ও মন্ত্রিসভার সাতজন জ্যেষ্ঠ সদস্যকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে সাতটি দেশের সরকারপ্রধানের কাছে রাষ্ট্রপতির চিঠি সহকারে পাঠানো হয়েছিল।
বর্তমানে ইরান-আমেরিকা উত্তেজনার ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক সংকটময় সময়ে সবচেয়ে সময়োপযোগী পথটি হতে পারে অর্থনৈতিক কূটনীতি। দেশের সামনে এ মুহূর্তে বড় সংকটগুলোর অন্যতম হলো অর্থনীতি। বড় ধরনের বৈদেশিক বিনিয়োগ আনা, গ্যাসের তীব্র সংকট মোকাবিলা করা এবং আইএমএফের সঙ্গে চুক্তিকৃত মোট ৫.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ কর্মসূচির মধ্যে আটকে থাকা প্রায় ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার ছাড় করানো-এ জায়গাগুলোতে সরকারের পক্ষে সরকারপ্রধানের বিশেষ বার্তা নিয়ে বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আইএমএফ, ইইউ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের একটি শক্তিশালী লিয়াজোঁ বডির গুরুত্বপূর্ণ নেগোশিয়েটর বা মধ্যস্থতাকারী হিসাবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিতি এবং সংযমী সংলাপের সক্ষমতা তাকে এ ভূমিকায় স্বাভাবিকভাবেই মানানসই করে তোলে। এ ধরনের দায়িত্ব শুধু প্রতীকী নয়, বরং সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত, যা তার সারাজীবনের রাজনৈতিক অর্জনের সঙ্গে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একজন অভিজ্ঞ, বিশ্বস্ত ও কর্মীবান্ধব নেতা প্রয়োজনের সময় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন, নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারেন এবং দলের ভেতরের সংকট মোকাবিলায় সরাসরি হাত লাগাতে পারেন। এ ভূমিকা যে কোনো প্রতীকী পদের চেয়ে ঢের বেশি অর্থবহ।
অতএব, বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অর্থনৈতিক কূটনীতি, সক্রিয় নেতৃত্ব ও জাতীয় সমঝোতার ভূমিকায় রাখাই হয়তো তার প্রতি প্রকৃত মূল্যায়ন হবে।
শায়রুল কবির খান : সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী

