Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

দুই নৌকায় পা রাখা বিপজ্জনক

Advertisement

Icon

মেজর (অব.) মনজুর কাদের

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দুই নৌকায় পা রাখা বিপজ্জনক

ফাইল ছবি

Advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশস্থ দূতাবাসের ফেসবুকে ১ আগস্ট, ২০২৬-এ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর পোস্ট আপলোড করে জানিয়েছেন, ‘আজ আমি বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আমাদের অংশীদারত্ব আরও দৃঢ় করার জন্য বিদ্যমান চমৎকার সুযোগগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি অগ্রাধিকার, এবং একসঙ্গে কাজ করলে আমরা বাস্তব সাফল্য অর্জন করতে পারব।’ বিশেষ দূত গোর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের আগে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, যা স্বাভাবিক রীতিনীতির বাইরে বলে মন্তব্য করেছেন অনেক কূটনীতিক বিশেষজ্ঞ। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কেমন হবে সেদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এ সফরটি।

বাণিজ্য : বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদারের লক্ষ্যে আগামী সপ্তাহের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির প্রায় ৪৫ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফরে আসবেন। অন্যদিকে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা : ১. সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ; ২. দিল্লিতে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারবেন না শেখ হাসিনা; এবং ৩. দেশের অর্থনীতি নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার নানা অশনিসংকেতের পর এবার সরকারি নথিতেও বড় ধরনের ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। বর্তমান স্নায়ুযুদ্ধের সময় সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়া নিয়ে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। চীন ও রাশিয়া এ জোট কোন দৃষ্টিতে দেখে তা নিয়ে চিন্তা করার বিষয় রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা।

রাশিয়া ইরানকে সামরিক প্রযুক্তি দিচ্ছে : এনবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়া ইরানকে মূল্যবান স্যাটেলাইট ও সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স সরবরাহ করছে, যা তেহরানকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর গতিবিধি ট্র্যাক করতে এবং আমেরিকান বিমান ও নির্ভুল লক্ষ্যভেদী অস্ত্রের কাজে হস্তক্ষেপ করতে সাহায্য করতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গোয়েন্দা সহায়তা চলমান সংঘাতের সময় মার্কিন গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে পারে। রাশিয়া বা ইরান কেউই এ অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি এবং যুক্তরাষ্ট্রও এ দাবির সমর্থনে কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেনি। স্নায়ুযুদ্ধের সময় ‘মনের কথা গোবিন্দ জানে’ প্রবাদ কার্যকর থাকে।

ইমরান খানের রাশিয়া সফর : ক্ষমতাচ্যুতি : পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ক্ষমতাচ্যুতির নেপথ্যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে নিযুক্ত মার্কিন কর্মকর্তা ডোনাল্ড লুর সম্পৃক্ততার অভিযোগটি একটি বহুল আলোচিত, সমালোচিত ও বিতর্কিত কূটনৈতিক নথি বা সাইফারকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত হয়েছে। ২০২২ সালের মার্চ মাসে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর এক বৈঠক হয়। ফাঁস হওয়া নথিপত্র অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর দিনে ইমরান খানের মস্কো সফর নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন লু। পরবর্তীকালে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খানের পতন ঘটলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র সরকার এবং ডোনাল্ড লু নিজে এ অভিযোগে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের বিষয়টি বারবার অস্বীকার করেছেন। তবে এসব বিষয় যে যুক্তরাষ্ট্র সবসময় অস্বীকার করে তার বহু নজির আছে।

দুই নৌকায় পা রেখে চলার অভিজ্ঞতা : স্নায়ুযুদ্ধের সময় দুই নৌকায় পা রেখে চলার অভিজ্ঞতা ভালো না, পরিণতি হয় ভয়াবহ। পৃথিবীর বহু দেশে এর নজির আছে। বাংলাদেশের উদাহরণ হলো, ১৯৭২-৭৫ শাসনামলে শেখ মুজিবুর রহমান যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সমানতালে সম্পর্ক রেখে চলছিলেন। ১৯৭৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বলয়ে থাকা সমাজতান্ত্রিক কিউবায় পাটের ব্যাগ রপ্তানি করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার, যার ফলে মার্কিন খাদ্য সহায়তাবাহী জাহাজ আটকে দেওয়া হয় এবং দেশে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এর পরিণতিতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।

এখানেই শেষ নয়। পুঁজিবাদের নেতা যুক্তরাষ্ট্রকে ছেড়ে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় সংসদীয় পদ্ধতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় এবং দেশের সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) নামক সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর একক জাতীয় দল গঠন করা হয়। এর পরিণতিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব পরিবারসহ নিহত হন।

বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সমর্থিত সরকার : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত সমর্থিত ২০০৭ সালে গঠিত ১/১১-এর সরকারের প্রত্যক্ষ সমর্থনে শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হলে আজীবন ক্ষমতায় থাকার চিন্তা-ভাবনা করেন। তিনি মনে করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত যদি তাকে সমর্থন করতে থাকে তাহলে পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে। কিন্তু বাদ সাধল ২০১৭ সালে শুরু হওয়া নতুন স্নায়ুযুদ্ধ। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ইতোমধ্যে চীন রাশিয়ার সঙ্গে গভীর বন্ধুত্বের চুক্তি করে। স্নায়ুযুদ্ধ আরও তীব্র হয়ে যায়।

স্নায়ুযুদ্ধের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না হাসিনার : শেখ হাসিনার স্নায়ুযুদ্ধের কোনো অভিজ্ঞতা নেই, কারণ ১৯৭২-৭৫-এ তার পিতার শাসনামলে তিনি দেশের বাইরে বেশি সময় থেকেছেন, এমনকি সামরিক অভ্যুত্থানে তার পরিবার নিহত হওয়ার সময় তিনি ভারতে ছিলেন এবং তার বোন শেখ রেহানা ছিলেন জার্মানিতে। তাই তিনি দুনৌকায় অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়ার সঙ্গে সমানতালে বন্ধুত্ব রেখে চলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরিণতি যা হওয়ার তাই হয়েছে। তার পিতা ১৯৭৫-এ নিহত হয়েছিলেন সামরিক অভ্যুত্থানে আর তিনি ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মুখে জীবন বাঁচাতে গিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে তার আদিম ঠিকানায় পাড়ি দিলেন।

অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই : বর্তমান সরকারে যারা রয়েছেন, তাদের কার কতটুকু অভিজ্ঞতা রয়েছে স্নায়ুযুদ্ধ সম্পর্কে এবং তার প্রয়োগ কিভাবে তারা করেন তা দেখার জন্য অপেক্ষা করবে বাংলাদেশের জনগণ। তবে দুনৌকায় পা রেখে চললে বিপদ যে ঘনিয়ে আসতে পারে তা নিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এজন্য রাজনৈতিক অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

রাজনৈতিক লড়াই : জাতি পুনরায় বিভক্ত হচ্ছে : দেশে ক্ষমতা ও রাজনৈতিক লড়াই, আধিপত্য বিস্তার এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা প্রতিদিন বাড়ছে, যা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক কোন্দল, হামলা ও হতাহতের নানা তথ্য গণমাধ্যমে উঠে আসছে যা সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করেননি। এদিকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে পুলিশের ব্যবহৃত যানবাহনকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য বা দুষ্কৃতকারীরা পুলিশের জিপ, পিকআপ, বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনের ওপর হামলা চালাতে পারে, গোয়েন্দা সংস্থার এমন তথ্যের ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ের সব ইউনিটকে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব হচ্ছে পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক খেলার অংশ যা অতীতে বাংলাদেশের মানুষ দেখেছেন।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় রাজনীতিতে দুই নৌকায় পা রেখে চলা অথবা নিরপেক্ষ থাকা সম্ভব, যদি উন্নয়ন ও স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার স্বার্থে নিবিড় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা যায়। বিভক্ত জাতি স্নায়ুযুদ্ধের সময় বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়-যেমন ১৯৭১ সালে পাকিস্তান গভীর সংকটে নিমজ্জিত হয়েছিল এবং তার পরিণতিতে দেশটি বিভক্ত হয়ে যায়।

মেজর (অব.) মনজুর কাদের : সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম