Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

ভারতে যেভাবে গণতন্ত্র থেকে স্বৈরতন্ত্রের উত্থান ঘটল

Icon

এলাহী নেওয়াজ খান

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ভারতে যেভাবে গণতন্ত্র থেকে স্বৈরতন্ত্রের উত্থান ঘটল

Advertisement

কীভাবে একটি দেশ দীর্ঘ গণতান্ত্রিক পথপরিক্রমার পর স্বৈরতন্ত্রে উপনীত হতে পারে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে বর্তমান ভারত। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দেশটি যখন স্বাধীন হয়, তখন পশ্চিমা বিশ্বের অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ধারণা ছিল, বহু জাত-পাত, ধর্মে, বর্ণে ও ভাষায় বিভক্ত ভারত কখনোই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে উঠতে পারবে না; কিন্তু তাদের এ চিন্তাকে মিথ্যা প্রমাণ করে দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ভারতকে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন।

ভারতের গণতন্ত্রের ওপর প্রথম আঘাত আসে ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেশব্যাপী জরুরি আইন জারি করেন। এটি ছিল ভারতের গণতন্ত্রের জন্য প্রথম বড় ধাক্কা। জরুরি আইন জারির পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কনিষ্ঠপুত্র সঞ্জয় গান্ধীর চরম পর্যায়ের বাড়াবাড়ি ভারতের গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলেছিল।

এ পটভূমিতে ১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবি ঘটে। মোরারজী দেশাই, জয়প্রকাশ নারায়ণ ও চরণ সিংহের মতো শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সম্মিলিত নেতৃত্বে গঠিত জনতা মঞ্চ বা জনতা পার্টি ওই নির্বাচনে ৫৪২টি আসনের মধ্যে ৩৪৫টি আসনে জয়লাভ করেছিল; আর কংগ্রেস পেয়েছিল ১৫৪টি। নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী তার রায়বেরেলি আসনে এবং সঞ্জয় গান্ধী আমেথি আসনে বিপুল ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন।

জনতা পার্টির প্রবীণ নেতা মোরারজী দেশাই প্রধানমন্ত্রী হন এবং তার নেতৃত্বে ভারতের প্রথম অকংগ্রেসীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়; কিন্তু বিপুলভাবে বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলে জনতার পার্টি সরকার বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। জনতা পার্টি ব্যর্থতার ফলে ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস আবারও বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। স্বাভাবিকভাবেই ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু ১৯৮৪ সালের জুনে স্বর্ণমন্দিরে ব্লু স্টার অপারেশনের পর শিখদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ক্ষোভের মাত্রাটা এ পর্যায়ে পৌঁছে ছিল সেনাবাহিনীর কয়েক হাজার শিখ সৈনিক বিদ্রোহ করে তাদের ব্যারাক ও রেজিমেন্ট ত্যাগ করেছিল এবং বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল।

চরম এ ক্ষোভের জের ধরে ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার নিজ সরকারি বাসভবনে শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন। ভারতের এ ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়, কংগ্রেসের দ্বৈত নীতি ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী আরএসএস, বিজেপি তথা সংঘ পরিবারের উত্থানে সহায়ক হয়েছে। আর সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯৯০ সালে মণ্ডল কমিশনের বিরুদ্ধে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের ব্যাপক আন্দোলন এবং ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙার মধ্য দিয়ে। কারণ এ দুটি ঘটনার মধ্য দিয়ে উলকার গতিতে বিজেপির উত্থান শুরু হয়। আর এ পটভূমিতেই বিজেপি তার রাম জন্মভূমি আন্দোলন জোরদার করতে সক্ষম হয়। মণ্ডল কমিশনের সুপারিশে ভারতের অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির মানুষের জন্য সরকারি চাকরিতে ২৭ শতাংশ সংরক্ষণ রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। ১৯৭৯ সালে মোরারজী দেশাই নেতৃত্বাধীন জনতা পার্টি সরকারের আমলে এ কমিশনে গঠিত হয়েছিল। এ কমিশনের রিপোর্ট দীর্ঘদিন ফাইলবন্দি ছিল। ১৯৯০ সালে প্রধানমন্ত্রী ভিপি সিংয়ের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট সরকারের আমলে এ কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলে সারা দেশে উচ্চবর্ণের শিক্ষার্থী ও হিন্দুরা প্রচণ্ড আন্দোলন শুরু করে। ওই ঘটনা ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি একটি টার্নিং পয়েন্ট ছিল, যা ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রূপ নেয়। এ ঘটনার পর বিজেপির রাম জন্মভূমি আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। বিগত নির্বাচনগুলোর ফলাফল পর্যালোচনা করলে বিজেপির উত্থানপর্বটা ভালোভাবে বোঝা যায়।

একবার ভেবে দেখুন, যে দলটি ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মাত্র দুটি আসন লাভ করেছিল, এ দলটি ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে একলাফে ৮৫ আসন পেয়ে যায়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজেপির আসন সংখ্যা বেড়ে ১২০-এ পৌঁছায়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ১৬১টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে আবির্ভূত হয়। প্রধানমন্ত্রী হন বিজেপির শীর্ষ নেতা অটল বিহারি বাজপায়ি। কিন্তু পার্লামেন্টে সরকার গঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখাতে ব্যর্থ হয়; মাত্র ১৩ দিনে মাথায় তিনি পদত্যাগ করেন। ১৯৯৮ সালের নির্বাচনে বিজেপির আসন সংখ্যা আরও বেড়ে ১৮১ তে পৌঁছায়। এবার বিজেপি অন্যান্য দলকে সঙ্গে নিয়ে ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স অর্থাৎ এনডিএ নামক জোট করে সরকার গঠন করে। অটল বিহারি বাজপায়ি প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু এ জোটের অন্যতম শরিক এআইএডিএমকে সমর্থন প্রত্যাহার করলে ১৩ মাসের মাথায় এ সরকারের পতন ঘটে।

এরপর ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে বিজেপি তার ৯৮ সালের ১৮১ আসন ধরে রাখতে সক্ষম হয় এবং এনডিএ জোটকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠন করে। এবারও অটল বিহারি বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর আসে ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচন। নির্বাচনে বিজেপি বড় ধরনের ধাক্কা খায়। এ নির্বাচনে বিজেপি এককভাবে ১৩৮টি আসন লাভ করলেও গত নির্বাচনের চেয়ে ৪৪টি আসন কম পেয়েছিল। পক্ষান্তরে কংগ্রেস এককভাবে ১৪৫টি আসনে বিজয়ী হয়েছিল এবং আঞ্চলিক ও বামপন্থি দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স অর্থাৎ ইউপিএ জোট করে সরকার গঠন করেছিল। আবার ২০০৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির আসন আরও কমে যায়। ওই নির্বাচনে বিজেপি ১১৬টি আসন লাভ করেছিল। আর কংগ্রেস এককভাবে ১৪৬টি আসনে বিজয় হয়েছিল এবং ইউপিএ জোট নিয়ে সরকার গঠন করে।

অতঃপর ২০১৪ ও ২০১৯ নির্বাচনে বিজেপির উত্থান তুঙ্গে পৌঁছে গিয়েছিল। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ২০১৪-এর নির্বাচনে বিজেপি ২৮২ আসন এবং ২০১৯ সালের নির্বাচনে ৩০৩ আসনে বিজয়ী হয়। আর মোদি বিজেপির নেতাকর্মীদের কাছে অবতার হিসাবে আবির্ভূত হন। কিন্তু তার নেতৃত্ব বিজেপি সরকার অর্থনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়; ফলে ২০২৪-এর নির্বাচনে দলটির আসন সংখ্যা ২৪০-এ নেমে আসে। এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও জোটসঙ্গীদের নিয়ে বিজেপি সরকার গঠন করে। বিজেপি তার বিগত ১২ বছরের শাসনামলে মুসলিমবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো ছাড়া অর্থনীতিসহ কোনো ক্ষেত্রেই সামান্য অগ্রগতি ঘটাতে পারেনি। বরং ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের ওপর চরম স্বৈরতান্ত্রিক শাসন চাপিয়ে দিয়েছে। বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনসহ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে গেছে। এছাড়া প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং নিয়োগে দুর্নীতির মতো বিষয়গুলো যুবসমাজকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতি, ঘন ঘন রুপির অবমূল্যায়ন, লাগামহীন দ্রব্যমূল্য বিজেপির বিরুদ্ধে মানুষের মনকে বিষিয়ে তুলেছিল। মোদ্দা কথা, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাগুলো না মেটানোর ফলে হিন্দুত্ববাদের স্লোগান আর মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারছিল না।

যার ফলে একটা ব্যঙ্গার্থ বিষয় কেন্দ্র করে গঠিত ককরোচ জনতা পার্টি সিজেপি অতি দ্রুত সারা ভারতের তরুণ সমাজের মধ্যে অভূতপূর্ব সারা ফেলে দিয়েছে। আর তাদের আন্দোলনের মুখে অনমনীয় ও অতি আত্মবিশ্বাসী নরেন্দ্র মোদি মাথানত করতে বাধ্য হয়েছেন। হয়তো এটাই বিজেপির শেষের শুরু।

এলাহী নেওয়াজ খান : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

সরকারের শক্তি বক্তব্যে নয়, সুশাসনে হতে হবে

সরকারের শক্তি বক্তব্যে নয়, সুশাসনে হতে হবে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : সম্ভাবনা, সংকট ও মানবজাতির ভবিষ্যৎ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : সম্ভাবনা, সংকট ও মানবজাতির ভবিষ্যৎ

মাদক আর সন্ত্রাস রাজনৈতিক সহোদর

মাদক আর সন্ত্রাস রাজনৈতিক সহোদর

অন্যমত জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে

জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম