দৃষ্টিপাত
দেশপ্রেম, দেশাত্মবোধ জাতিকে মহান করে
Advertisement
ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুগে যুগে কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিকরা স্বদেশপ্রেমের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সুনাগরিক তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। একটি দেশের নাগরিকরা যদি উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত এবং প্রকৃত দেশপ্রেমিক হয়, তাহলে অনেক সমস্যার এমনিতেই সমাধান হয়ে যায়। একটি দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হচ্ছে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সুনাগরিক। দক্ষ মাঝি ছাড়া খরস্রোতা নদী পাড়ি দিয়ে নৌযান যেমন তার উদ্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে পারে না, তেমনি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সৎ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক সৃষ্টি ছাড়া কোনো দেশ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে উপনীত হতে পারে না। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ, সৎ ও যোগ্য নাগরিক সৃষ্টি করা অপরিহার্য।
দেশাত্মবোধ হচ্ছে নিজ সমাজ এবং সমাজের মানুষ তথা দেশের প্রতি, জাতির প্রতি, ভাষার প্রতি, সাহিত্যের প্রতি, সংস্কৃতির প্রতি সুতীব্র আকর্ষণ বোধ করা। দেশ তথা সমাজের প্রতি গভীর অনুরাগ, নিবিড় ভালোবাসা ও যথার্থ আনুগত্যকেই দেশাত্মবোধ বলা হয়। মাতৃভূমির উন্নতিকল্পে সর্বস্ব ত্যাগের সাধনাই দেশপ্রেম বা দেশাত্মবোধ। দেশপ্রেম শব্দটি মানুষের আত্মার সঙ্গে, অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশাত্মবোধ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। পৃথিবীর উন্নত ও সভ্য জাতিগুলো তাদের দেশকে সবার উপরে স্থান দিয়েছে। দেশের জন্য তারা সর্বস্ব ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তারা সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে সম্মিলিতভাবে দেশের সেবা করে থাকে। আমাদেরও এভাবে বড় হতে হবে। আর বড় হতে হলে চাই স্বদেশপ্রেম। কারণ উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশপ্রেমের সঙ্গে জাতির উন্নতি এক তারে বাঁধা। তাই দেশ বা জাতির উন্নতিকল্পে দেশাত্মবোধ অপরিহার্য।
স্বদেশের প্রতি মানুষের আকর্ষণ অত্যন্ত প্রবল। কথায় বলে, জননী ও জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও উৎকৃষ্ট। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘দেশপ্রেম ইমানের অঙ্গ’। স্বদেশের জন্য মানুষ হাসিমুখে জীবন উৎসর্গ করতে পারে। ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি / সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।’ জন্মভূমি তথা নিজ দেশের প্রতি কবির যে ভালোবাসা ও আকর্ষণ, তা উল্লেখিত পঙ্তিমালায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। স্বদেশপ্রেমের অনুভূতি যার হৃদয়ে আলোড়ন তোলে না, সে জীব হয়েও জড়। মানুষ তার নিজের জীবনকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। সে জীবন দেশ-দেশাত্মবোধের কাছে নিতান্তই তুচ্ছ। স্বদেশের কল্যাণের জন্য, দেশ স্বাধীন করার জন্য ৩০ লাখ বাঙালি আত্মদান করেছিল। তাদের মধ্যে ছিল গভীর দেশপ্রেম, দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ। আর এ স্বদেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের প্রকাশ তখনই ঘটে, যখন মানুষ সামাজিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠে। বাঙালি যখন নিজ দেশ, নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছিল, যখন তাদের মধ্যে সামাজিক সচেতনতার বিকাশ ঘটেছিল, তখনই তারা মায়ের ভাষা ও সংস্কৃতির সম্মান রক্ষার জন্য বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করেছিল। তারা মরেও অমর।
স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ যেমন দেশাত্মবোধের পরিচায়ক, তেমনি সাহিত্যে, শিল্পকলায়, কৃষি ও সংস্কৃতিতে, ব্যবসায়-বাণিজ্যে, জনস্বার্থে বা অন্যান্য জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে কাজ করাও দেশপ্রেমের লক্ষণ। আর যখনই মানুষ সামাজিক সচেতন থাকে, তখনই তাদের মাঝে এসব গুণের বিকাশ দেখতে পাওয়া যায়। আজ বর্তমান প্রজন্মের মাঝে আমাদের সমাজ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমরা যেন আমাদের ভাষা-সংস্কৃতির সঠিক মূল্যায়ন করছি না। বিদেশি সংস্কৃতির কু-প্রভাবে আমাদের বর্তমান প্রজন্মের একটি বিরাট অংশ প্রভাবিত হচ্ছে। আমাদের প্রবীণ-সমাজের দায়িত্ব হলো নবীনদের মধ্যে সমাজ সচেতনতা সৃষ্টি করে তাদের মধ্যে গভীর দেশাত্মবোধের প্রকাশ ঘটাতে সাহায্য করা। তাছাড়া আমাদের দেশের মানুষের একটি বিরাট অংশ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। তাদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়ে সামাজিকভাবে সচেতন করার মাধ্যমে দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত করতে হবে। আর এতেই দেশ থেকে অজ্ঞতার অন্ধকার দূর হবে। আমরা ধীরে ধীরে উন্নতির শিখা দেখতে পাব।
তাই প্রত্যেকেরই কাজ হবে, যার যার ক্ষেত্রে দেশের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে স্বীয় দায়িত্ব সুষ্ঠু ও সুনিপুণভাবে পালন করে দেশের সর্বাঙ্গীণ উন্নতি সাধনে সচেষ্ট থাকা। দেশাত্মবোধ নিজের দেশকে জানতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায়। দেশপ্রেমের মাধ্যমেই বিশ্বপ্রেমে পৌঁছানো যায়। ফলে বিশ্বমানবতার মহান আদর্শের সম্প্রসারণ ঘটে। হৃদয়ে দেশাত্মবোধের অনির্বাণ শিখা জ্বালাতে হবে, এই বোধকে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিয়োজিত করে বলতে হবে : ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা।’
আমাদের দেশের এক বিরাট অংশের মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে খাঁটি দেশপ্রেম ও নৈতিকতার অভাব। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা আদর্শ ও নীতিবান প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারছে না। জাতীয় জীবনের সর্বত্রই আমরা দুর্নীতি, অসততার চর্চা প্রত্যক্ষ করছি। এর কারণ, আমরা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত আদর্শবান প্রজন্ম গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছি। বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞানার্জনের চেয়ে যেনতেনভাবে সার্টিফিকেট বাগিয়ে নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে বিশ্বের জ্ঞানভান্ডারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হয়। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম তা না করে নিজেদের ‘বদ্ধ জলাশয়ে’ আবদ্ধ করে রাখছে। জ্ঞানার্জন নয়, তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেট গ্রহণ করে একটি চাকরিতে নিযুক্ত হওয়া।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সুনাগরিক গড়ে তোলার জন্য প্রথাগত মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে যুগোপযোগী ও নীতিভিত্তিক আধুনিক শিক্ষা প্রসারের উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষা কারিকুলামে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি সমস্যা সমাধানে সক্ষম এমন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। শুধু জিপিএ বা ভালো ফলের পেছনে না ছুটে প্রাথমিক স্তর থেকেই সততা, সহনশীলতা ও মূল্যবোধের বিষয়গুলোকে শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মহান ব্যক্তিদের জীবনী ও নীতিগল্পগুলো শিক্ষার্থীদের পড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবার হচ্ছে একটি শিশুর শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। একটি শিশু তার পরিবার থেকেই নৈতিকতা, সততা ও আদর্শবাদিতার শিক্ষা লাভ করে থাকে। কাজেই পরিবারের মধ্যে নীতি ও আদর্শের চর্চা থাকতে হবে। শিক্ষক হচ্ছেন শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় আদর্শ। তারা শিক্ষকদের অনুসরণ করতে চায়। কাজেই শিক্ষককে সর্ব অবস্থায় নীতি-নৈতিকতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। কারও প্রতি অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হয়ে পক্ষপাতমূলক আচরণ করা যাবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে শুধু একাডেমিক ফলাফল নয়, আচরণ ও নৈতিক গুণাবলিকেও মূল্যায়নের ভিত্তি হিসাবে বিবেচনা করতে হবে।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ডহীন প্রাণী যেমন শিরদাঁড়া উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না, তেমনি অশিক্ষিত ও বর্বর জাতি কখনোই বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে পারে না। শিক্ষা মানুষের সুপ্ত সৃজনশীল প্রতিভাকে বিকশিত করে, যা তাকে প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে গড়ে তোলে। অনেকেই বলেন, বর্তমান যুগ হচ্ছে অস্ত্র প্রতিযোগিতার যুগ। মনে রাখতে হবে, অস্ত্র তৈরি এবং এর সঠিক ব্যবহারের জন্যও আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞানের প্রয়োজন হয়। শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া কোনো জাতি অস্ত্র প্রতিযোগিতাই হোক, আর জ্ঞানের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের ক্ষেত্রেই হোক, সফল হতে পারে না। পৃথিবীতে এমন একটি জাতিও দেখানো যাবে না, যারা জ্ঞানার্জনকে অবহেলা করে বিশ্বদরবারের মর্যাদার আসনে আসীন হতে পেরেছে। বাংলাদেশের বিদ্যমান শিক্ষা কার্যক্রম মোটেও যুগের চাহিদা পূরণের উপযোগী নয়। আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করার জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। উচ্চপর্যায়ের একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষা খাতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
সমাজ সচেতনতা ও দেশাত্মবোধের অভাব আজ আমাদের সমাজজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে আমরা প্রাণের চেয়েও ভালোবাসি। তাই ঝড়-ঝঞ্ঝা, বিপদ-আপদ যতই আসুক না কেন, দেশাত্মবোধের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে আমরা আমাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করব। এতেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে আমাদের দেশপ্রেম। ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে জাতীয় স্বার্থকে। তাহলেই বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে। আর এজন্য আমাদের এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা কর্মদক্ষ আদর্শ নাগরিক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক। আদর্শ শিক্ষায় শিক্ষিত দেশপ্রেমিক একজন নাগরিক কখনোই নিজেকে কোনো অন্যায় বা অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে না। আদর্শ জাতি গঠনে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সুনাগরিক সৃষ্টির জন্য শিক্ষা সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। একমাত্র শিক্ষাই পারে নীতিনিষ্ঠ আদর্শবান জাতি গঠন করতে।
ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী : প্রফেসর ইমেরিটাস; সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক রাষ্ট্রদূত
