Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

চতুর্থ কিস্তি

জুলাই জাদুঘর তৈরির পেছনের গল্প

Advertisement

Icon

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই জাদুঘর তৈরির পেছনের গল্প

Advertisement

বর্ডার কিলিং : বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর যে প্যাসেজে করার কথা ছিল, সেখান থেকে বের হয়ে ডানদিকে গেলে এখন একটা ছোট রুম আছে, যেটা এখন ‘ক্যাম্পাস ভায়োলেন্স’ নামে আছে। এ রুমটাই ছিল আমাদের ‘বর্ডার কিলিং’ রুম। রুমটার মধ্যে কাঁটাতারের সঙ্গে বর্ডারে খুন হওয়া মানুষদের নাম ঝুলানো ছিল। নামগুলো স্টিলের নেমপ্লেটে ছিল। বর্ডার কিলিং রুমের ফটোগ্রাফিগুলো এসেছিল পারভেজ আহমেদ রনির কাছ থেকে।

এখন কেউ ভাবতে পারেন আচ্ছা আওয়ামী দুঃশাসনের প্রসঙ্গে বর্ডার কিলিং কীভাবে প্রাসঙ্গিক? সাদা চোখে তাই মনে হওয়ার কথা। কিন্তু এর উত্তর ছিল ওই রুমের ঠিক দরজার কাছে থাকা একটা টিভি স্ক্রিনে। যেখানে ফেলানীর বাবার একটা ডকুমেন্টারি চলত একটানা। সেখানে ফেলানীর বাবা বলছেন-আমার মেয়েকে বিএসএফ খুন করল, অথচ আমার সরকার আমার মেয়ের পক্ষে কথা না বলে ভারত সরকারের পক্ষে কথা বলছে। এ কেমন সরকার? আমরা এরকম সরকার চাই না। একজন বাবার এ ক্ষোভটাই আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

এই যে একটা তাঁবেদারি সরকার যখন নিজ নাগরিকের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে অন্য দেশের পক্ষে অবস্থান নেয়, তখন এটা আর জাস্ট অন্য দেশ কর্তৃক কিলিং হিসাবে থাকে না। এটাকে আরও নানাভাবে পাঠ করতে হয়। এ কারণেই ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের যে ক্ষোভ ছিল সেখানে একটা বড় আইকন হয়ে ওঠে ফেলানী। দেখেন, আমি কোনো দেশের সঙ্গেই চিরস্থায়ী প্রেম কিংবা ঘৃণায় বিশ্বাস করি না। যে কারণে ভারতের হাসিনা নীতির সমালোচনা করেও গত বছর পূজায় ইলিশ পাঠানোর কথা বলেছি। বলে গালও খেয়েছি অবশ্য।

তো অবশ্যই আমরা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাই, ভালো সম্পর্ক রাখতে চাই। এ কারণে আগস্ট চব্বিশে আমি লিখেছিলাম, সময় এসেছে বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ভারতের তরফ থেকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সবকিছু নতুন করে শুরু করার এবং আওয়ামী লীগের পরিবর্তে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার। তা কতটা হয়েছে, সেটা আরেক বিতর্ক। কিন্তু সম্পর্ক রিসেট করা মানে ইতিহাস বলা যাবে না তা তো নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্য কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলা বন্ধ করতে হবে? ভারতও কি আজ ব্রিটেনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার জন্য নিজের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস বলা বন্ধ করে দিয়েছে? তা তো নয়। ব্রিটেনের সঙ্গে তাদের দারুণ সম্পর্ক আছে, আবার ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসও তারা বলে।

আমরাও ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক চাইব, কিন্তু ইতিহাসের কথাও বলব। ইতিহাসটা বলা দরকার, যাতে বাংলাদেশ এবং ভারত-দুই রাষ্ট্রই মনে রাখতে পারে, এ কাজগুলো আর রিপিট করা ঠিক হবে না। এগুলো রিপিট হলে দুই দেশের সম্পর্ক আবার তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।

বিডিআর : বর্ডার কিলিংয়ের পর ছিল বিডিআর রুম। আমরা জানি, হাসিনার ফ্যাসিবাদের শুরু আসলে বিডিআর কিলিংয়ের মধ্যদিয়ে। পিলখানা ট্র্যাজেডির মধ্যদিয়ে আমাদের সেনাবাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়। এবং হাসিনা ও তার আধিপত্যবাদী প্রভুরা বুঝে যায়, এবার বাংলাদেশকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে কন্ট্রোল করা যাবে। কোনো ইলেকশন দেওয়া লাগবে না, যা ইচ্ছা তা করা যাবে। গুম করা যাবে, যা ইচ্ছা করা যাবে। ফলে বিডিআর রুমটা আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ রুমের জন্য কাজ করেছে ফাবলিহা বুশরা এবং জুবায়ের ইবনে কামাল।

বিডিআর রুমটা একটা হৃদয়বিদারক রুম। এ রুমে সারাক্ষণ একটা ডকুমেন্টারি চলতে থাকে-‘পিলখানা : থার্টি সিক্স আওয়ার্স অব ট্র্যাজেডি’। এ ছাড়া সেখানে বিডিআরের বিভিন্ন ফোনকল শোনা যায়। আরও অনেক স্মৃতিচিহ্ন এ রুমে নিয়ে আসা হয়েছে। এ রুমে যে কেউ গেলে তার কান্না পায়।

এখানকার ফটোগ্রাফি জোগাড় করার ক্ষেত্রেও তানজিম একদম রাইট মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, যাতে আমরা ছবিগুলো পেতে পারি। পিলখানা, তারপর শাপলা চত্বর-এগুলো আমাদের কিউরেটোরিয়াল ফিলোসফির অংশ ছিল। আপনারা আমাদের জুলাই পুনর্জাগরণ অনুষ্ঠানের তালিকা দেখলেই বুঝবেন এগুলোকে আমরা কোর এরিয়া হিসাবে চিহ্নিত করেই এগিয়েছি। কারণ এগুলোর মধ্যদিয়েই ফ্যাসিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

শাপলা চত্বর : এরপর ছিল শাপলা চত্বরের রুম। এ রুমটার রিসার্চের ক্রেডিট মহিম মাহফুজ এবং হাসান ইনামের। তারা দুজন যাবতীয় ম্যাটেরিয়াল কালেকশন থেকে শুরু করে শহীদদের অবজেক্ট, নানা গল্প-সব সংগ্রহ করেছে। শাপলা শহীদদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে। এ রুমের রিলেভেন্ট ফটোগ্রাফিগুলোও কালেক্ট করেছেন তানজিম ওয়াহাব। কারণ তিনি জানতেন, এ ফটোগ্রাফগুলো কার কাছে আছে। এ রুমটা আমাদের স্তব্ধ করে দেয়।

রুমের মাঝখানে যে স্কাল্পচারটা আছে, তারও একটা গল্প আছে। স্কাল্পচারটা আসলে প্রথমে একটা মিনিয়েচার হিসাবে আমাকে বানিয়ে দেখানো হয়েছিল-বাইরে এটাকে বড় করে করা হবে কি না, তা দেখার জন্য। আমি তা দেখে বললাম, এটা তো শাপলা চত্বরের রুমে থাকাই আইডিয়াল। এ স্কাল্পচারটার দিকে তাকালে প্রচণ্ড বেদনাহত হয়ে যেতে হয়। পরে আমরা এটাকে এ রুমেই রাখলাম।

শাপলা চত্বরের ঘটনা যখন ঘটে, মিডিয়া আমাদের মিথ্যা তথ্য দিয়েছিল। এটা হিস্টরিক ফ্যাক্ট। এটাকে আমাদের উল্লেখ করতে হবে। এটা ভুলে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। মিডিয়া আমাদের বলেছিল, সেদিন তেমন কিছু হয়নি। বরং সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছিল অল্প শক্তি ক্ষয় করে তাদের শাপলা চত্বর থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য। ফলে আমরা রুমের একপাশে রেখেছিলাম সেই সময়কার মিডিয়ার এডিটোরিয়ালগুলো। আরেক পাশে ছিল অধিকারের রিপোর্ট, যেখানে বলা হয়েছিল এক রাতে ৬১ জন মানুষ মারা গেছে। এ কনট্রাস্টটা আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল-কীভাবে জার্নালিজম ফ্যাসিজমকে গ্রো করতে সাহায্য করে এটা বোঝার জন্য।

পরে আমি জানি না কার পরামর্শে মিডিয়ার সেই এডিটোরিয়াল এবং শহীদদের তালিকা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি মনে করি, এ দুটি পাওয়ারফুল এলিমেন্ট সরিয়ে দেওয়া রুমটাকে ফ্যাকচুয়ালি দুর্বল করেছে। তারপরও রুমটা এখনো পাওয়ারফুল।

ক্যাম্পাস ভায়োলেন্স থেকে গুম : পিলখানা এবং শাপলা চত্বরের পর আমরা রেখেছিলাম ক্যাম্পাস ভায়োলেন্স, বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন, মানবাধিকার হরণ। তারপর বাঁ দিকে গেলে আসে টর্চার রুম এবং গুম। আমরা প্রথম থেকেই জানতাম-গুম আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা সেকশন হবে।

টর্চার রুম এবং গুম : মিউজিয়ামের কাজ শুরুর একদম প্রথম থেকেই আমরা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে খুব নিবিড়ভাবে কাজ করছিলাম। একদিন আমি তাজুল ভাইকে (সাবেক চিফ প্রসিকিউটর, আইসিটি) ফোন দিলাম। বললাম, উনি এবং উনার টিমের মেম্বাররা যদি আমাদের সঙ্গে একটু বসেন। এরপর উনি আমাদের এখানে আসেন।

জুলাই জাদুঘরের জন্য গণভবনে আমরা যেসব কাগজপত্র পেয়েছিলাম, যেগুলো আইসিটির কাজে আসতে পারে, সেগুলো আমরা তাদের হাতে তুলে দিই। একইসঙ্গে আমি প্রস্তাব দিই-আপনাদের কাছে এমন যেসব ডকুমেন্ট বা জিনিসপত্র আছে, যেগুলো হিস্টরিক্যাল ফ্যাক্ট হিসাবে আমরা মিউজিয়ামে এক্সিবিট করতে পারি, সেগুলো আমাদের দেন। শুরু থেকেই আমরা এ ধরনের কোলাবোরেশন করছিলাম। আমরা তাদের জিনিস প্রোভাইড করেছি, আবার তারাও আমাদের জিনিস প্রোভাইড করেছে। প্রায় কাছাকাছি সময়ে আমি গুম কমিশনের সঙ্গেও বসি। নাবিলাকে (নাবিলা ইদ্রিস, সদস্য, গুম কমিশন) একদিন ফোন দিয়ে মিউজিয়ামে ইনভাইট করি। তানজিমসহ আমাদের রিসার্চাররা ছিল-খোন্দকার রাকিব, রোবায়েত, সাগর, জোহানসহ আরও অনেকে।

টর্চার রুম এবং গুমের রুম-এ দুটি রুমের বেশির ভাগ ম্যাটেরিয়াল এভাবেই এসেছে। টর্চার রুমের বেশির ভাগ ম্যাটেরিয়াল আমরা পেয়েছি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালের কাছ থেকে। আর গুমের রুমের বেশির ভাগ ম্যাটেরিয়াল এসেছে মশফিকুর রহমান জোহানের কাছ থেকে। কারণ বাংলাদেশের গুমের ওপর এত এক্সটেনসিভ কাজ আর কেউ করেছে বলে আমার জানা নেই। আপনারা জানেন, মায়ের ডাকের সঙ্গে মশফিকুর রহমান জোহান যুক্ত ছিল। ওর ফটোগ্রাফিক সেন্স এবং ‘অ্যাবসেন্স’ আর ‘প্রেজেন্স’ নিয়ে ওর আর্টিস্টিক ভাবনা অসাধারণ। তাও তার ফটোগ্রাফির মধ্যেও ধরে রেখেছে। এ রুম সাজাতে জোহানের সঙ্গে গবেষণা করেছে রুম্মানা জান্নাত।

গুম হওয়া মানুষদের পরিবারগুলোর সঙ্গে জোহান দীর্ঘদিন কাজ করেছে, ফটোস্টোরি করেছে, সিরিজ করেছে। ফলে ওর কাছ থেকে এ ম্যাটেরিয়ালগুলো নিয়ে আমরা গুমের রুমটা সাজাই। পাশাপাশি আপনারা জানেন, গুম নিয়ে আমরা অনেক ডকুমেন্টারি করেছি। সেগুলো একটু পরে, যখন আমরা মুনসুন থিয়েটার নিয়ে কথা বলব, তখন আসবে। তখন বাংলাদেশের অসাধারণ সব তরুণ ফিল্মমেকার এ জুলাই জাদুঘরের পেছনে কী ভূমিকা রেখেছে তা আসবে।

তো যে কথা বলছিলাম-গুম কমিশন এবং আইসিটির কাছে গুমের ভুক্তভোগী, গুমের ঘটনা প্রত্যক্ষ করা মানুষ এবং হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করা মানুষদের বিভিন্ন সাক্ষ্য ছিল। সে সাক্ষ্যগুলোর ভিত্তিতে টর্চার এবং গুমের বিভিন্ন ঘটনার কিছু ইলাস্ট্রেশন তৈরি হয়েছিল-এর মধ্যে লাশ কেটে পানিতে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনার ইলাস্ট্রেশনও ছিল। সেই ইলাস্ট্রেশনগুলো আমরা তাদের কাছ থেকে নিই। সেগুলো দিয়ে একটা অ্যানিমেশন তৈরি করা হয়, যেটা গুমের রুমে রাখা হয়েছে। এটা দেখলে গা শিউরে ওঠে। এইভাবে টর্চার এবং গুমের রুম তৈরি করতে আমরা এ কমিশন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সাহায্য নিয়েছি।

(চলবে)

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী : বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, চলচ্চিত্র নির্মাতা

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

তারা নিশ্চিত দোজখে যাবে: ফারুকী

তারা নিশ্চিত দোজখে যাবে: ফারুকী

জুলাই জাদুঘরের মহাপরিচালক হলেন এহসান মাহমুদ

জুলাই জাদুঘরের মহাপরিচালক হলেন এহসান মাহমুদ

জুলাই জাদুঘর তৈরির পেছনের গল্প

শেষ পর্ব জুলাই জাদুঘর তৈরির পেছনের গল্প

জুলাই জাদুঘর তৈরির পেছনের গল্প

তৃতীয় কিস্তি জুলাই জাদুঘর তৈরির পেছনের গল্প

জুলাই জাদুঘর তৈরির পেছনের গল্প

দ্বিতীয় কিস্তি জুলাই জাদুঘর তৈরির পেছনের গল্প

জুলাই জাদুঘর তৈরির পেছনের গল্প

জুলাই জাদুঘর তৈরির পেছনের গল্প

আরও পড়ুন

শতফুল ফুটতে দাও বিশ্ব শিক্ষক দিবস ও আমার গুণী শিক্ষকরা

বিশ্ব শিক্ষক দিবস ও আমার গুণী শিক্ষকরা

বিমানবন্দরে যাত্রী দুর্ভোগ : কার্যকর সমাধান চাই

বিমানবন্দরে যাত্রী দুর্ভোগ : কার্যকর সমাধান চাই

শিক্ষিত কর্মজীবী নারীর লুকানো সংগ্রামের অদৃশ্য শ্রম

শিক্ষিত কর্মজীবী নারীর লুকানো সংগ্রামের অদৃশ্য শ্রম

অন্যমত দেশের জ্বালানি খাত শক্তিশালী করতে হবে

দেশের জ্বালানি খাত শক্তিশালী করতে হবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম