কোন দিকে যাচ্ছে সৌদি-হুতি সংঘাত
Advertisement
মে. জে. (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি আন্দোলনের-যার আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ-মধ্যে সংঘাত এখন আর শুধু ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে সম্পৃক্ত করে একটি বহুমাত্রিক আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত হয়েছে। কয়েক বছরের আপেক্ষিক শান্তির পর ২০২৬ সালে নতুন করে হামলা ও পালটা আক্রমণ বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। তবে সৌদি আরব কিংবা হুতি-কোনো পক্ষেরই চূড়ান্ত সামরিক বিজয় অর্জনের সম্ভাবনা নেই। তাই সংঘাতটির সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হলো সংঘর্ষ, প্রতিরোধ এবং বিরতিহীন আলোচনার একটি অস্থিতিশীল সংমিশ্রণ। হুতি আন্দোলনের উৎপত্তি উত্তর ইয়েমেনের সাদা প্রদেশের জায়েদি শিয়া জনগোষ্ঠী থেকে। কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে দীর্ঘদিন সংঘাতের পর তারা ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখল করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। প্রতিবেশী দেশে ইরানঘনিষ্ঠ একটি সশস্ত্র সংগঠনের আধিপত্য ঠেকানো এবং স্বীকৃত সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সৌদি আরব ২০১৫ সালের মার্চে একটি সামরিক জোটের নেতৃত্বে ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে।
সৌদি নেতৃত্ব প্রাথমিকভাবে এটিকে একটি স্বল্পমেয়াদি সামরিক অভিযান হিসাবে বিবেচনা করেছিল। কিন্তু অভিযানটি দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে পরিণত হয়। ব্যাপক বিমান হামলার মধ্যেও হুতিরা টিকে যায়, সানা এবং উত্তর ও পশ্চিম ইয়েমেনের বিরাট অংশে নিজেদের কর্তৃত্ব সুসংহত করে এবং ক্রমে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়ায়। ইরান তাদের রাজনৈতিক সমর্থন, সামরিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ দিয়েছে। তবে হুতিদের নিজস্ব ইয়েমেনি রাজনৈতিক লক্ষ্যও রয়েছে। তাই তাদের সম্পূর্ণভাবে ইরানের নির্দেশ পালনকারী একটি সাধারণ প্রক্সি হিসাবে দেখলে বাস্তবতা পুরোপুরি বোঝা যাবে না। যুদ্ধের মানবিক পরিণতি ভয়াবহ। ইয়েমেনের অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাদ্যসংকট, বাস্তুচ্যুতি ও রোগব্যাধির শিকার হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। ২০২৬ সালে দেশটির ২ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষের মানবিক সহায়তার প্রয়োজন হওয়ার আশঙ্কা করা হয় এবং ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র, তেল স্থাপনা ও নৌনিরাপত্তার আলোচনার আড়ালে এ মানবিক বিপর্যয়ই সংঘাতটির সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক।
২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ছয় মাস পর শেষ হলেও এর প্রধান সামরিক সুবিধাগুলো অনেকাংশে অব্যাহত ছিল। সৌদি আরবে হুতিদের আন্তঃসীমান্ত হামলা কমে আসে, সৌদি বিমান অভিযান উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় এবং ওমানের মধ্যস্থতায় সৌদি-হুতি সরাসরি আলোচনা এগিয়ে যায়। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠাও এ আশা তৈরি করেছিল যে একটি সমঝোতার মাধ্যমে ইয়েমেনে রিয়াদের সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততার অবসান ঘটতে পারে। সৌদি আরবের যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যুদ্ধটি ব্যয়বহুল, সামরিকভাবে নিষ্পত্তিহীন এবং দেশটির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে। হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রমাণ করেছে যে বিপুল প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরব তার বিমানবন্দর, শহর, তেল স্থাপনা ও লবণমুক্তকরণ কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারছে না। পাশাপাশি রিয়াদ ভিশন-২০৩০, বিদেশি বিনিয়োগ, পর্যটন এবং অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণে মনোযোগ দিতে চায়। অব্যাহত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এসব লক্ষ্য অর্জনের অনুকূল নয়।
অন্যদিকে হুতিরা তাদের কর্তৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, সানা বিমানবন্দর ও হোদেইদা বন্দরের ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, ইয়েমেনের তেল রাজস্ব থেকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন প্রদান, বন্দিমুক্তি এবং বিদেশি সেনা প্রত্যাহার চায়। তাদের দৃষ্টিতে সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা প্রমাণ করে যে তারা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের একটি সাধারণ পক্ষ নয়; বরং জাতীয় ও আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তবে আপেক্ষিক শান্তি কোনো পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সমাধান দিতে পারেনি। হুতিরা সামরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার বিভক্তই রয়ে গেছে। দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি, বিভিন্ন উপজাতীয় বাহিনী, রাজনৈতিক দল ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী। সৌদি-হুতি সমঝোতা আন্তঃসীমান্ত হামলা বন্ধ করতে পারে, কিন্তু ইয়েমেনের রাজনৈতিক ক্ষমতা, সম্পদ, ভূখণ্ড এবং দক্ষিণাঞ্চলের ভবিষ্যৎ মর্যাদা নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধের সমাধান করতে পারবে না।
গাজা যুদ্ধ সংঘাতটিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। ২০২৩ সালের শেষভাগ থেকে হুতিরা ফিলিস্তিনিদের সমর্থনের কথা বলে লোহিত সাগর ও আশপাশের এলাকায় বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজে হামলা শুরু করে। এসব অভিযানে তাদের আঞ্চলিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পেলেও ইয়েমেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরাইলের হামলার মুখে পড়ে। সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে মাত্র প্রায় ২৯ কিলোমিটার প্রশস্ত বাব আল-মান্দেব প্রণালি কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রধান ক্ষেত্রে পরিণত হয়। নিরাপত্তার অভাবে অনেক জাহাজকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চলাচল করতে হয়, ফলে পরিবহণ ব্যয় বাড়ে এবং সুয়েজ খালকেন্দ্রিক বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়ে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সংঘাত আবার তীব্র হয়ে ওঠে। হুতিরা সৌদি জাহাজের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করে এবং সৌদি তেলবাহী জাহাজ, জ্বালানি স্থাপনা ও অন্য কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করে। জবাবে সৌদি আরব ইয়েমেনে বিমান হামলা চালায়। সেপ্টেম্বরের মধ্যে হামলা ও সতর্কতা রিয়াদ, জেদ্দা ও ইয়ানবুসহ বিভিন্ন সৌদি শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
পূর্ণাঙ্গ সৌদি-হুতি যুদ্ধের আশঙ্কা থাকলেও এটি কোনো পক্ষের জন্যই যুক্তিসংগত ফল নয়। সৌদি আরবের বিপুল বিমানশক্তি, আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা ও আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে। কিন্তু প্রায় এক দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে হুতি আন্দোলনকে নির্মূল কিংবা সানায় কার্যকর সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। নতুন স্থল অভিযান অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
অন্যদিকে হুতিরা তুলনামূলক কম ব্যয়ের ড্রোন, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং সামুদ্রিক হামলার মাধ্যমে সৌদি অর্থনৈতিক অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু প্রচলিত যুদ্ধে সৌদি আরবকে পরাজিত করার সক্ষমতা তাদের নেই। একইভাবে সমগ্র ইয়েমেন শাসন করাও তাদের পক্ষে সহজ হবে না। মধ্য, পূর্ব ও দক্ষিণ ইয়েমেনের অনেক অঞ্চলে তাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয় এবং সেখানকার স্থানীয় শক্তিগুলো হুতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
ভবিষ্যতে তিনটি পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে। প্রথম ও সবচেয়ে কাক্সিক্ষত পরিস্থিতি হলো নতুন যুদ্ধবিরতি এবং এরপর আন্তঃসীমান্ত হামলা, নৌনিরাপত্তা, বন্দর, বিমানবন্দর, সরকারি বেতন, বন্দিবিনিময় ও পুনর্গঠন নিয়ে পর্যায়ক্রমিক সমঝোতা। দ্বিতীয়টি হলো দীর্ঘস্থায়ী ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ পরিস্থিতি-যেখানে বড় ধরনের লড়াই সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সামুদ্রিক সংঘর্ষ ও ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ চলতে থাকবে। তৃতীয় এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি হলো অনিয়ন্ত্রিত আঞ্চলিক বিস্তার, যেখানে জ্বালানি স্থাপনায় বড় ধরনের হুতি হামলার জবাবে সৌদি, মার্কিন বা মিত্রবাহিনীর ব্যাপক আক্রমণ শুরু হবে এবং ইরান ও তার আঞ্চলিক সহযোগীরা আরও সরাসরি জড়িয়ে পড়বে। বর্তমানে দ্বিতীয় পরিস্থিতিই সবচেয়ে সম্ভাব্য বলে মনে হয়, যদিও নতুন উত্তেজনা তৃতীয়টির ঝুঁকি বাড়িয়েছে। উভয়পক্ষের আলোচনায় ফিরে যাওয়ার কারণ রয়েছে, কিন্তু প্রত্যেকেই মনে করে সামরিক চাপ তাদের দর-কষাকষির অবস্থান শক্তিশালী করবে।
টেকসই সমাধানের জন্য শুধু সৌদি-হুতি চুক্তি যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষ, দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকারী শক্তি, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, নারী, নাগরিক সমাজ এবং অন্য রাজনৈতিক পক্ষকে প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দেশব্যাপী যুদ্ধবিরতি, সড়ক ও পরিবহণপথ আবার চালু, সরকারি বেতন ও তেল রাজস্ব বণ্টনের স্বচ্ছ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় পুনর্গঠন কর্মসূচি প্রয়োজন। যাচাইযোগ্যভাবে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সামুদ্রিক হামলা হ্রাসের বিনিময়ে বন্দর ও অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ পর্যায়ক্রমে শিথিল করা যেতে পারে। ইরানকেও উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখতে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে এমন সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। সৌদি আরব শুধু বিমানশক্তি দিয়ে হুতিদের স্থায়ীভাবে নির্মূল করতে পারবে না; আবার হুতিরাও ক্ষেপণাস্ত্র ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন করতে পারবে না। ফলে সংঘাতটি কোনো সুস্পষ্ট সামরিক বিজয়ের দিকে নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত সহাবস্থান অথবা বিধ্বংসী আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে। রিয়াদ, সানা, তেহরান, ওয়াশিংটন ও মাস্কাটে নেওয়া সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে কোন পথটি শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পাবে। শান্তি এখনো সম্ভব, তবে তাৎক্ষণিক উত্তেজনা প্রশমনের পর একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ইয়েমেনি রাজনৈতিক সমাধান প্রতিষ্ঠা করতে হবে; অন্যথায় আরেকটি সাময়িক চুক্তি শুধু পরবর্তী যুদ্ধটিকে কিছুদিনের জন্য পিছিয়ে দেবে।
মেজর জেনারেল (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
