Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

‘টাকা দিয়ে ভোট কেনা’ : কতটা রটনা, কতটা ঘটনা

Advertisement

Icon

মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

‘টাকা দিয়ে ভোট কেনা’ : কতটা রটনা, কতটা ঘটনা

ফাইল ছবি

Advertisement

এ দেশের জনগণ নির্বাচনকে উৎসব মনে করে। তারা মনের আনন্দে নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে এবং ভয়ের পরিবেশ না থাকলে সাধারণ ভোটাররা মনের আনন্দে ভোট দেয়। অতি সাধারণ নারী-পুরুষ, দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষও উপার্জনের কথা না ভেবে নিজের পয়সায় পরিবহণ ভাড়া করে ভোটকেন্দ্রে যায়। তারপরও যদি সাধারণ ভোটারদের ত্যাগের কথা চিন্তা না করে তাদের ওপর ভোট বিক্রির অপবাদ দেওয়া হয়, তাহলে এ অপবাদ তাদের আহত করে, তাদের মর্যাদা ও সম্মানহানি ঘটায়।

যারা ভোট বিক্রির কথা বলেন, তারা কি কখনো নিজেরা ভোট বিক্রি করেছেন অথবা টাকা দিয়ে ভোট কিনেছেন অথবা ভোট বেচাকেনা প্রত্যক্ষ করেছেন! যদি তা না করে থাকেন, তাহলে কোন তথ্যের ভিত্তিতে এরূপ অভিযোগ এনে সাধারণ ভোটারদের সম্মানহানি করছেন? অভিযোগকারীদের এরূপ অভিযোগ আমার মতো অসংখ্য সাধারণ ভোটারকে আহত করে।

নির্বাচনের সঙ্গে যারা কখনো প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন না, নির্বাচন ও নির্বাচনি ব্যবস্থাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেননি, কেবল বাইরে থেকে নির্বাচন দেখেছেন বা নির্বাচনের গল্প শুনেছেন, তাদের কাছে সাধারণ ভোটারের ভোট বেচাকেনার রটনা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে। সুদীর্ঘ চাকরিজীবনে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন ছাড়াও প্রিসাইডিং অফিসার ও রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সাধারণ ভোটারের ভোট বেচাকেনা আদৌ কোনো ঘটনা নয়, এটা কেবলই রটনা।

তবে এদেশে শ্যাম নির্বাচন কিংবা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনেও প্রার্থীকে প্রচুর টাকা ব্যয় করতে হয়। প্রার্থীর ব্যয়িত টাকার একটা বড় অংশ ব্যয় হয় মনোনয়ন কেনার জন্য, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দলের সমর্থন লাভের জন্য। অন্য একটি অংশ ব্যয় হয় নির্বাচনি টাউট, ধান্ধাবাজ ও গুন্ডাপান্ডাদের পেছনে। একটা অংশ ব্যয় হয় পুলিশসহ স্থানীয় প্রশাসন এবং ভোটকেন্দ্র ম্যানেজের পেছনে।

ভোট বেচাকেনা যে কেবলই রটনা, তা এ দেশের নির্বাচনব্যবস্থাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে সহজেই বোঝা যাবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচনে যেখানে প্রায় প্রত্যেক ভোটারকে প্রার্থীরা চেনে এবং ভোটাররাও প্রার্থীদের চেনে, সেক্ষেত্রে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মধ্যে সর্বোচ্চ পঞ্চাশ থেকে একশ ভোটের ব্যবধানের সম্ভাবনা থাকার ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নিশ্চিত কিছু ভোটারের মধ্য থেকে ব্যক্তিগত পরিচিত কিছু ভোটারের ভোট কেনার সুযোগ কোনো প্রার্থী নিতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রেও অতি গোপনে এবং অতিসাবধানে ভোটের বেচাকেনা করতে হয়। কারণ উভয়ে জানে ভোট বেচাকেনা ফৌজদারি অপরাধ। এছাড়া ভোট বিক্রির বিষয় প্রকাশ পেলে সমাজ তাকে কী চোখে দেখবে এবং তাকে এবং তার পরিবারকে সমাজে কতটা হেয় হতে হবে, সেটা সে ভালো করেই জানে। অপরদিকে প্রার্থীও জানে টাকা দিয়ে ভোট কেনার বিষয় প্রকাশ পেলে তার পক্ষের যারা সাধারণ ভোটার আছে, তারা তার বিপক্ষে চলে যাবে এবং এক্ষেত্রে পরাজয় নিশ্চিত। যে জন্য ভোট কেনার ঝুঁকি কোনো প্রার্থী নেয় না। তবে অনেক সময় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ভোটারদের বিভ্রান্ত করে তাদের ভোট পাওয়ার আশায় এক প্রার্থী অন্য প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট কেনার রটনা রটায়। এছাড়া পরাজিত প্রার্থীও সমাজে তার অবস্থান ধরে রাখার জন্য বিজয়ী প্রার্থীর বিরুদ্ধে টাকা দিয়ে ভোট কেনার অপবাদ রটায়।

স্থানীয় নির্বাচনের এ অবস্থা কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে নেই। জাতীয় নির্বাচনের সাধারণ ভোটারের সর্বোচ্চ পাঁচ ভাগ ভোটারেরও কমসংখ্যক ভোটারের সঙ্গে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচয় থাকতে পারে। ব্যক্তিগত পরিচয় নেই এমন সাধারণ ভোটারকে ভোট কেনার অফার দিলে অবস্থা কী হতে পারে সেটা সহজেই অনুমেয়। এছাড়া লাখ লাখ ভোটারের মধ্য থেকে টাকা দিয়ে ভোট কিনে নির্বাচনে জয়লাভ করার অসম্ভব চিন্তা করা কোনো সুস্থ ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়।

এ দেশে সাধারণ ভোটাররা ভোট বিক্রি করে না। তবে ভোট বিক্রি করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। বেসিক ডেমোক্রেসির সময় ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হতেন নির্বাচিত মেম্বারদের ভোটে। ওই সময়ের একটা ঘটনা স্পষ্ট মনে আছে। আমাদের এলাকারই এক ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলেন দুজন। নির্বাচনের সাত দিন আগে এক চেয়ারম্যান প্রার্থী অর্ধেকের বেশি মেম্বার নিয়ে হঠাৎ করে এলাকা থেকে উধাও হয়ে যান এবং ভোটের দিন উধাও হওয়া প্রার্থী ও মেম্বাররা সরাসরি হাজির হয়ে ভোট দেন এবং উধাও হওয়া প্রার্থী বিজয়ী হন। অপর প্রার্থী উধাও হওয়া মেম্বারদের কাছে ভোট চাওয়ার সুযোগই পেলেন না। স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নির্বাচিত সদস্য/কাউন্সিলরদের ভোটে চেয়ারম্যান/মেয়র নির্বাচনের বিধান করা হলে অথবা অন্য যে কোনো নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ভোটে নির্বাচিত হওয়ার বিধান করা হলে বেসিক ডেমোক্রেসির আমলের মতো জনপ্রতিনিধির ভোট বেচাকেনার সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা প্রতিরোধ করার কোনো মেকানিজম সরকারের হাতে থাকবে না। জনপ্রতিধিরা তাদের ভোট বিক্রি করতে পারেন, এ ভয়েই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার সাহস কোনো সরকারই দেখাতে পারেনি, ঐকমত্য কমিশনও দেখাতে পারেনি। জনপ্রতিনিধিদের ভোট বেচাকেনার এ দায় সাধারণ ভোটারদের ওপর চাপিয়ে ভালো নির্বাচনের স্বপ্ন দেখা যায় না।

এ দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থা হলো জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীরা টাকা দিয়ে ভোট কেনেন না, তারা টাকা দিয়ে মনোনয়ন কেনেন। টাকা দিয়ে মনোনয়ন কেনা তাদের জন্য একটি বিনিয়োগ। এ বিনিয়োগের মুনাফার হার শতগুণ থেকে হাজারগুণও হতে পারে। এছাড়া দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রার্থীরা টাকা দিয়ে মনোনয়ন কেনেন। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ার ক্ষেত্রেও দলের সমর্থন লাভের জন্য প্রার্থীকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। তবে ডামি দল বা ডামি প্রার্থীদের কোনো বিনিয়োগ করতে হয় না। তারা বিনা বিনিয়োগে প্রচুর লাভ পায়। শ্যাম নির্বাচনে ডামি প্রার্থী ও ডামি দলকে অর্থায়ন করে ক্ষমতাসীন দলীয় সরকার। অনেক সময় জয় নিশ্চিত করার জন্য কোনো প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ভোট কমাতে পারে, টাকা দিয়ে এমন ডামি প্রার্থীকে নির্বাচনে নিয়ে আসে। ডামি প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেয় জয়লাভের জন্য নয়, নির্বাচনে হারার জন্যই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, যে প্রার্থী টাকা দিয়েছে সে প্রার্থীকে নির্বাচনে জয়ী হতে সহায়তা করার জন্য।

ভোট বেচাকেনার এই রটনা সাধারণ ভোটারদের আহত করে এবং একটা ভালো নির্বাচনকেও বিতর্কিত করে। এ ধরনের রটনা দ্বারা ভোটারদের পবিত্র ত্যাগকেও অস্বীকার করা হয়। তাছাড়া ভোট বেচাকেনার রটনাকে যদি আমরা বিশ্বাস করি, আমরা যদি বিশ্বাস করি ভোটাররা দুইশ টাকায় ভোট বিক্রি করে, তাহলে ভোট বেচাকেনার অবস্থার পরিবর্তন না করে আদৌ কি ইতিহাসের সেরা নির্বাচনের কথা ভাবতে পারি?

মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ

Advertisement

নির্বাচন

Advertisement

আরও পড়ুন

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

নিউইয়র্কের চিঠি প্রবাসী বাঙালির অর্থহীন কর্মকাণ্ডে অর্থের অপচয়

প্রবাসী বাঙালির অর্থহীন কর্মকাণ্ডে অর্থের অপচয়

সৎ করদাতার ওপর বাড়তি বোঝা কেন

সৎ করদাতার ওপর বাড়তি বোঝা কেন

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বার্তা

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বার্তা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম