ক্ষমতার রাজনীতি নয়, প্রয়োজন শিক্ষা-সংস্কৃতি ও মানবিকতার সমন্বয়
Advertisement
মো. মুখলেছুর রহমান
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একটি রাষ্ট্র ও সমাজের গতিপথ নির্ধারণের অন্যতম প্রধান শক্তি হলো রাজনীতি। তাই রাজনীতির মান যেমন হবে, রাষ্ট্র ও সমাজের চরিত্রও অনেকাংশে তেমনই হবে।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির ধরন, পদ্ধতি ও অগ্রাধিকারেও পরিবর্তন হতে হবে। বিশেষত নতুন প্রজন্মের রাজনীতিতে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যেহেতু রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের কল্যাণ এবং রাষ্ট্রের উন্নয়ন। তাই এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখল, ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ারে পরিণত করা, সংঘাত, বিদ্বেষ ও বিভাজন সৃষ্টি ইত্যাদি অপকর্মের দিন সম্ভবত শেষ হতে চলেছে।
এর বিপরীতে শিক্ষা, যোগ্যতা, মানবতা, সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতানির্ভর রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা সাধারণ জনগণের কাছে ভীষণভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
সময় বদলে গেছে, বদলে গেছে মানুষের রুচি ও মন-মানসিকতা। পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে আধুনিক রাজনীতিতেও। অতএব, রাজনীতিতে ভালো করতে হলে রাজনীতিতে পারদর্শী হওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতি, সমাজনীতি, ইতিহাস, আইন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, প্রযুক্তি, পরিবেশ, প্রশাসন ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কেও সম্যক জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে।
কারণ আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি সিদ্ধান্ত দেওয়ার দায়িত্ব মূলত রাজনৈতিক নেতৃত্বের। অজ্ঞতা, আবেগ কিংবা গুজবের ভিত্তিতে নেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কুফলের দায়ভার অন্ধভাবে মেনে নেওয়ার দিন শেষ হতে চলেছে।
প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে রাজনীতিবিদদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক ও মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। ন্যায়পরায়ণ, সহনশীল ও দায়িত্বশীল হিসেবে গড়ে উঠতে হবে।
সংস্কৃতি একটি সমাজের আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। যে রাজনীতি নিজের দেশের ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সম্মান করে, সে রাজনীতি সাধারণ মানুষের অনুভূতি ও আকাঙ্ক্ষাকে গভীরভাবে বুঝতে পারে। সংস্কৃতিবোধ মানুষকে পরিশীলিত করে, অন্যের মত ও জীবনধারার প্রতি সম্মান দেখাতে শেখায় এবং অসহিষ্ণুতার পরিবর্তে সহাবস্থানের মানসিকতা তৈরি করে।
এর সঙ্গে যুক্ত সভ্যতার বোধ। সভ্যতা শুধু উন্নত ভবন, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নাম নয়। একজন মানুষ তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে কীভাবে কথা বলে, দুর্বল মানুষের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করে, ক্ষমতা পাওয়ার পর কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং আইনের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল—এসব সভ্যতার পরিচয় বহন করে।
নতুন প্রজন্মের রাজনীতিতে তাই রাজনৈতিক বিতর্কের ভাষা পরিবর্তন করা জরুরি। মতের অমিল থাকবে, তীব্র সমালোচনাও থাকবে; কিন্তু ব্যক্তিগত অপমান, বিদ্বেষ, মিথ্যা তথ্য, চরিত্রহনন কিংবা সহিংসতার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার সংস্কৃতিকে বিদায় জানাতে হবে। মনে রাখতে হবে, কঠোর রাজনৈতিক বিতর্ক এবং মানবিক আচরণ পরস্পরবিরোধী নয়।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি বক্তব্য বা মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দায়িত্বও বেড়েছে। যাচাই না করে তথ্য প্রচার, গুজব ছড়ানো কিংবা উত্তেজনাপূর্ণ ভাষা ব্যবহার শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি করে না; সমাজে বিভাজনও বাড়াতে পারে। নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি প্রযুক্তির অপব্যবহার সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
মানবিকতা রাজনীতির প্রাণ। রাজনৈতিক মত, দল কিংবা আদর্শের পার্থক্য থাকলেও মানুষের মৌলিক মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে কোনো আপস থাকা উচিত নয়। একজন রাজনৈতিক কর্মীকে মনে রাখতে হবে—তার প্রতিপক্ষও একজন মানুষ, তার পরিবার আছে, তার অধিকার আছে এবং তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও আছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে যেন মানুষের প্রতি আচরণের পরিবর্তন না ঘটে—এটাই হওয়া উচিত একটি পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
নতুন প্রজন্মের রাজনীতিতে নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সুফল সমাজের দুর্বল অংশের কাছেও পৌঁছাবে। রাজনীতি যদি মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পরিবর্তে কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেই রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
একই সঙ্গে প্রয়োজন আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা। নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের বুঝতে হবে, রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি নয়। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, রাজনৈতিক দল পরিবর্তন হতে পারে, নেতৃত্ব পরিবর্তন হতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ রাখার দায়িত্ব সবার। রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার হতে হবে আইন ও সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে।
এ ক্ষেত্রে বিরোধী মতের প্রতি সম্মান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো—সবাই একই কথা বলবে না। বরং ভিন্নমত, বিতর্ক ও যুক্তির মধ্য দিয়েই ভালো সিদ্ধান্তের পথ তৈরি হয়। তাই নতুন প্রজন্মের রাজনীতিতে ‘আমি ঠিক, তুমি ভুল’ ধরনের মানসিকতার পরিবর্তে ‘আমরা কীভাবে দেশের জন্য ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারি’—এই দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
রাজনীতির ভবিষ্যৎ শুধু রাজনৈতিক দলের হাতে নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গণমাধ্যম, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজ—সবার ভূমিকা রয়েছে। নতুন প্রজন্মকে যদি আমরা দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তাহলে তাদের মধ্যে জ্ঞান, নৈতিকতা, সংস্কৃতিবোধ, যুক্তিবোধ, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটাতে হবে।
অতএব, নতুন প্রজন্মের রাজনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু নতুন মুখ তৈরি করা নয়; নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করা। এমন রাজনীতি, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্ব বড়, প্রতিপক্ষের চেয়ে রাষ্ট্র বড়, দলীয় স্বার্থের চেয়ে জনস্বার্থ বড় এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের মর্যাদা স্থান পায়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেমন রাষ্ট্র ও সমাজ পাবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে আজকের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কীভাবে পরিবর্তিত হয় তার ওপর। তাই সময়ের দাবি হলো—রাজনীতিতে জ্ঞান ও দক্ষতার পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা, নৈতিকতা ও মানবিকতার সমন্বয় ঘটানো। কারণ মানবিকতা ছাড়া রাজনীতি ক্ষমতার চর্চা হতে পারে, কিন্তু জনকল্যাণের রাজনীতি হয়ে উঠতে পারে না।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী
