Logo
Logo
×

Advertisement

ডাক্তার আছেন

ক্যানসার চিকিৎসায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ: বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত পথ

Advertisement

ডা. আরমান রেজা চৌধুরি

ডা. আরমান রেজা চৌধুরি

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৮ এএম

ক্যানসার চিকিৎসায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ: বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত পথ

সংগৃহীত

Advertisement

বাংলাদেশের মতো বিপুল জনগোষ্ঠীর একটি দেশে শুধু সরকারের একার পক্ষে সবার জন্য মানসম্মত, সময়োপযোগী ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন। জনসংখ্যার চাপ, বিশেষায়িত জনবলের ঘাটতি, সীমিত অবকাঠামো এবং চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান ব্যয় আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এই বাস্তবতায় সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে ভাবার সময় এসেছে।

এখানেই পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা PPP একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিকল্প হতে পারে। আমাদের দেশে PPP নিয়ে আলোচনা হলে অনেক সময় ধারণা করা হয়, সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলে একটি নতুন হাসপাতাল তৈরি করবে। বাস্তবে এর পরিধি অনেক বিস্তৃত। সরকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা কিনতে পারে, সরকারি রোগীকে নির্ধারিত মূল্যে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে পারে, ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি যৌথভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিংবা সরকারি জমিতে বেসরকারি বিনিয়োগে বিশেষায়িত সেবা কেন্দ্র তৈরি হতে পারে।

একজন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ হিসেবে ক্যানসার কেয়ারের কথা বললে PPP-এর প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। ক্যানসার চিকিৎসা অত্যন্ত প্রযুক্তিনির্ভর, ব্যয়বহুল এবং বহুমাত্রিক। একজন রোগীর জন্য সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, প্যাথলজি, ইমেজিং, মলিকিউলার টেস্টিং, নিউক্লিয়ার মেডিসিন এবং প্যালিয়েটিভ কেয়ারসহ একাধিক সেবার প্রয়োজন হতে পারে।

বিশেষ করে রেডিওথেরাপি সেবা চালু করতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। শুধু একটি মেশিন কিনলেই হয় না। প্রয়োজন উপযুক্ত বাঙ্কার, ট্রিটমেন্ট প্ল্যানিং সিস্টেম, কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স, প্রশিক্ষিত রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, মেডিকেল ফিজিসিস্ট, রেডিয়েশন থেরাপি টেকনোলজিস্ট এবং দক্ষ প্রকৌশল সহায়তা। একই কথা PET-CT, ব্র্যাকিথেরাপি কিংবা আধুনিক মলিকিউলার ডায়াগনস্টিকসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: দেশে যদি বেসরকারি খাতে ইতোমধ্যে কার্যকর রেডিওথেরাপি মেশিন, PET-CT, ব্র্যাকিথেরাপি বা উন্নত প্যাথলজি সেবা থাকে, তাহলে সেই সক্ষমতাকে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না কেন?

নতুন সরকারি ক্যানসার সেন্টার অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু নতুন অবকাঠামো তৈরি, যন্ত্রপাতি স্থাপন, জনবল নিয়োগ এবং পূর্ণ সক্ষমতায় সেবা চালু করতে সময় লাগে। আর ক্যানসারের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসায় দীর্ঘ বিলম্ব রোগের অগ্রগতি এবং চিকিৎসার ফলাফলকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে সরকার চাইলে নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসার সেবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কিনতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, সরকারি হাসপাতালে রেডিওথেরাপির অপেক্ষার সময় বেশি হলে নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণকারী বেসরকারি কেন্দ্রে রোগী পাঠানো যেতে পারে। এর জন্য একটি জাতীয়ভাবে নির্ধারিত প্যাকেজ মূল্য থাকতে পারে। দরিদ্র রোগীর ক্ষেত্রে সরকার পুরো ব্যয় বহন করতে পারে, আর অন্য রোগীদের ক্ষেত্রে co-payment বা health insurance যুক্ত করা যেতে পারে।

এ ধরনের মডেলের কয়েকটি সম্ভাব্য রূপ হতে পারে। প্রথমত, Service Purchase Model, যেখানে সরকার বেসরকারি হাসপাতাল থেকে নির্দিষ্ট সেবা কিনবে। দ্বিতীয়ত, Patient Voucher Model, যেখানে রোগী একটি সরকারি ভাউচার নিয়ে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে পারবেন। তৃতীয়ত, Co-payment Model, যেখানে সরকার ও রোগী মিলিতভাবে ব্যয় বহন করবেন। চতুর্থত, Equipment Partnership Model, যেখানে ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি বেসরকারি বিনিয়োগে স্থাপিত হলেও নির্দিষ্ট সংখ্যক সরকারি রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে। পঞ্চমত, Build-Operate-Transfer Model, যেখানে বেসরকারি খাত একটি বিশেষায়িত কেন্দ্র তৈরি ও পরিচালনা করবে এবং নির্দিষ্ট সময় পর তা সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে।

তবে PPP কার্যকর করতে হলে শক্তিশালী নজরদারি অপরিহার্য। এটি যেন শুধু বেসরকারি ব্যবসার সুযোগে পরিণত না হয়। চিকিৎসার মূল্য, রোগী নির্বাচনের নীতি, সেবার মান, অপেক্ষার সময়, নিরাপত্তা এবং চিকিৎসার ফলাফল নিয়মিত অডিট করতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠান কতজন রোগী চিকিৎসা করছে, কী মানে চিকিৎসা দিচ্ছে এবং সরকারি অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তার স্বচ্ছ হিসাব থাকতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আলোচনাকে ‘সরকারি বনাম বেসরকারি’ বিতর্কে সীমাবদ্ধ না রাখা। সরকারের শক্তি হলো নীতি নির্ধারণ, জনস্বার্থ রক্ষা, ভর্তুকি প্রদান এবং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো। বেসরকারি খাতের শক্তি হলো দ্রুত বিনিয়োগ, প্রযুক্তি গ্রহণ, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং তুলনামূলকভাবে দ্রুত সেবা প্রদান।

বাংলাদেশে একসঙ্গে বড় আকারে PPP চালুর প্রয়োজন নেই। বরং রেডিওথেরাপি, PET-CT, ব্র্যাকিথেরাপি বা নির্বাচিত ক্যানসার ডায়াগনস্টিক সেবা দিয়ে কয়েকটি pilot project শুরু করা যেতে পারে। ছয় মাস বা এক বছর পর waiting time, cost-effectiveness, patient satisfaction এবং clinical outcome মূল্যায়ন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।

শেষ পর্যন্ত রোগী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেন নাকি বেসরকারি হাসপাতালে, সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি সময়মতো, নিরাপদ, মানসম্মত এবং আর্থিকভাবে সহনীয় চিকিৎসা পেলেন কি না।

এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে স্বচ্ছ, নিয়ন্ত্রিত এবং রোগীকেন্দ্রিক পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বাংলাদেশের ক্যানসার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানোর একটি বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে।

ডা. আরমান রেজা চৌধুরী
ক্যানসার বিশেষজ্ঞ
এভারকেয়ার হাসপাতাল ঢাকা

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

অগ্ন্যাশয় ক্যানসার রোগীদের জন্য স্বস্তির খবর, আসছে নতুন ওষুধ

অগ্ন্যাশয় ক্যানসার রোগীদের জন্য স্বস্তির খবর, আসছে নতুন ওষুধ

আর কখনো যেন শরীরে ক্যানসার বাসা বাঁধতে না পারে: সামিয়া

আর কখনো যেন শরীরে ক্যানসার বাসা বাঁধতে না পারে: সামিয়া

প্রতি ৮টি ক্যানসারের একটি সংক্রমণজনিত, ঝুঁকি কমাতে করণীয় জানালেন ভারতীয় চিকিৎসক

প্রতি ৮টি ক্যানসারের একটি সংক্রমণজনিত, ঝুঁকি কমাতে করণীয় জানালেন ভারতীয় চিকিৎসক

বাঁচতে চান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অর্ঘ্য

বাঁচতে চান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অর্ঘ্য

যেসব কারণে বাড়তে পারে পেটের ক্যানসারের ঝুঁকি, প্রতিরোধে করণীয়

যেসব কারণে বাড়তে পারে পেটের ক্যানসারের ঝুঁকি, প্রতিরোধে করণীয়

পুরুষদের ‘প্রোস্টেট ক্যানসার’, কোন বয়সের পর নিয়মিত পরীক্ষা জরুরি

পুরুষদের ‘প্রোস্টেট ক্যানসার’, কোন বয়সের পর নিয়মিত পরীক্ষা জরুরি

আরও পড়ুন

ক্যানসার চিকিৎসায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ: বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত পথ

ক্যানসার চিকিৎসায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ: বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত পথ

ডিমের কুসুম খেলে কি হার্টের সমস্যা বাড়ে?

ডিমের কুসুম খেলে কি হার্টের সমস্যা বাড়ে?

গ্লাস স্কিন: কাঁচের মতো উজ্জ্বল ত্বকের রহস্য কী?

গ্লাস স্কিন: কাঁচের মতো উজ্জ্বল ত্বকের রহস্য কী?

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি যে ১০ মানসিক সমস্যা, শীর্ষে ডিপ্রেশন

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি যে ১০ মানসিক সমস্যা, শীর্ষে ডিপ্রেশন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম