ভ্যাকসিন ও বায়োটেক ড্রাগ তৈরিতে বাংলাদেশ কি সক্ষমতা অর্জন করেছে?
jugantor
ভ্যাকসিন ও বায়োটেক ড্রাগ তৈরিতে বাংলাদেশ কি সক্ষমতা অর্জন করেছে?

  ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন ও ড. রেজাউল করিম  

১২ জুলাই ২০২০, ২১:০৭:১১  |  অনলাইন সংস্করণ

সাধারণত একটি ভ্যাকসিনের বাজারে আসতে কমপক্ষে ১০ বছর প্রয়োজন।

ভ্যাকসিন নিয়ে দেশের মিডিয়াতে সাম্প্রতিককালে বেশ আলোচনা হচ্ছে। আমাদের দেশ নতুন ভ্যাকসিন তৈরির সক্ষমতা কি অর্জন করতে পেরেছে? এটা অনুধাবন করার জন্য দেশের ঔষধ শিল্পের সক্ষমতা নিয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে অভিমত তুলে ধরার আগে আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা এবং অভিজ্ঞতা জানানো দরকার। আমরা দু’জনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজিতে গ্রাজুয়েট। ড. হোসেন এর ১০ বছরের বেশি সময় বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফিল্ডে বিশ্বমানের ট্রেইনিং (PhD, National University of Singapore, Postdocs- DUKE-NUS Graduate Medical School and Singapore Cancer Centre) আছে এবং রয়েছে দেশে একাডেমিয়া (এসোসিয়েট প্রফেসর) এবং ইন্ডাস্ট্রি মিলে (সিনিয়র ম্যানেজার, বায়োটেক ডিভিশন, দেশের একটি প্রতিষ্ঠিত ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি) ১০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা।

অন্যদিকে ড. করিম ইমিউনোলোজিস্ট হিসেবে বর্তমানে WHO-Utrecht Center of Excellence for Affordable Biotherapeutics, নেদারল্যান্ডসে বায়োথেরাপিউটিক ডেভলোপমেন্টর প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন যেখানে তার টিমের একটি বায়োটেক ড্রাগ (এন্টিবডি) প্রথম ধাপের (Phase-I) ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে।

ড. করিম Netherlands Medicines Evaluation Board (MEB) এর সাবেক নির্বাহী পরিচালকের সাথে বর্তমানে কাজ করছেন। তাঁর বিশ্বের স্বনামধন্য তিনজন বিজ্ঞানীর (ইমিউনোলজিস্ট) অধীনে রিসার্চ ট্রেইনিং (MS. PhD and Postdocs) নেয়ার সুযোগ হয়। ড. করিম নেদারল্যান্ডসে ন্যাসড্যাক (NASDAQ) এনলিস্টেড. একটি বায়োটেক ড্রাগ ডেভেলোপমেন্ট কোম্পানিতে দু’বছর প্রি-ক্লিনিক্যাল সায়েন্টিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন যেখানে তার টিমে দুটি বায়োটেক এন্টিবডি ফেজ-১/২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে। দু’জনের দেশ-বিদেশের প্রায় ২০ বছরের একাডেমিয়া, রিসার্চ এবং ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অভিমত তুলে ধরছি।

দেশের ঔষধ শিল্পের উত্থান

গত ৩০ বছরে দেশের ঔষধ শিল্প লক্ষ্যনীয় অগ্রগতি সাধন করেছে। স্থানীয়ভাবে ৯৮% চাহিদা মেটানোর পর বাংলাদেশের উৎপাদিত জেনেরিক ড্রাগ (অর্থাৎ- মূল ঔষধ প্রস্তুতকারকের তৈরিকৃত ঔষধের অণুলিপি) বিশ্বের ১৩০টিরও বেশি দেশে রফতানি করা হচ্ছে। এ থেকে দেশ প্রতিবছর ১৩০ মিলিয়ন ড.লারের বৈদাশিক মুদ্রা অর্জন করে। এই উন্নতির মূলে রয়েছে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ড্রাস্ট্রিগুলোর চ্যালেঞ্জিং উদ্যোগ এবং ড্রাগ এড.মিনিস্ট্রেশন (Directorate General of Drug Administration) এর কার্যকরি সহায়তা।

ঔষধ অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের মত নয়, এখানে ঔষধের গুনগত মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরী কেননা অসুস্থ মানুষ নিরাময়ের উদ্দেশ্যে এগুলো সেবন করেন। ঔষধের গুনগত মান বজায় রাখতে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে প্রডাকশন প্ল্যান্ট, কিউসি (QC- quality control) এবং কিউএ (QA-Quality Assurance) ডিপার্টমেন্টগুলো যথাযথ এবং সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন অনুসরণ করছে কিনা তা ঔষধ প্রশাসনের রেগুলেটরি ডিপার্টমেন্ট সরেজমিনে তদন্ত করে সার্টিফিকিকেশন প্রদান করে।

বিদেশে (যেমন আমেরিকা, ইউরোপ) রফতানি করার অনুমোদন পেতে সেসব দেশের রেগুলেটরি অথোরিটির জটিল বাধা অতিক্রম করতে হয়। আশা জাগানিয়া বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ জেনেরিক ড্রাগের ক্ষেত্রে গত তিন দশকে প্রভূত দক্ষতা (ইন্ডাস্ট্রি স্থাপন, দক্ষ জনশক্তি, রেগুলেটরি বিষয়াদি) অর্জন করেছে।

বাংলাদেশ কি প্রচলিত জেনেরিক ড্রাগের কাঁচামাল তৈরিতে সক্ষম?

দেশের ঔষধ শিল্পের যথেষ্ট অগ্রগতি হলেও এখনো বাংলাদেশ ঔষধ প্রস্তুতের কাঁচামাল (এপিআই, Active pharmaceutical ingredient) তৈরিতে সক্ষমতা অর্জন করেনি। এগুলো বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে মূলত ঔষধের ফর্মুলেশন এবং প্যাকেজিং হয়। ২০৩৩ সালের মধ্যে কাঁচামাল তৈরির সক্ষমতা অর্জন না করতে পারলে দেশের ঔষধ শিল্প হুমকির মধ্যে পড়ে যাবে।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এতদিন বাংলাদেশ ঔষধের মূল প্রস্তুতকারক কোম্পানির প্যাটেন্ট ইস্যুতে ছাড় পেয়ে এসেছে। জেনেরিক ড্রাগের কাঁচামাল তৈরি করতে অনেক দক্ষতা, বিনিয়োগ এবং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন যা কিনা বাংলাদেশের কোন ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি এখনো অর্জন করতে পারেনি। হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি এপিআই তৈরির সক্ষমতা অর্জন করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আশা করা যায় ২০৩৩ সালের মধ্যে কয়েকটি কোম্পানি সম্ভবত সেই সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।

জেনেরিক এবং বায়োটেক ড্রাগ (যেমন ইনসুলিন) এর তুলনামূলক প্রযুক্তিগত জটিলতা

জেনেরিক ড্রাগগুলোর (small molecule, যেমন প্যারাসিটামল, এন্টিবায়োটিক) এপিআই কেমিকেল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা হয়। অন্যদিকে বায়োটেক ড্রাগ (Large molecule) বা বায়োলজিক্স (যেমন ইনসুলিন) বায়োলজিক্যাল প্রসেসের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। কেমিকেল ড্রাগ সিন্থেসিস কন্ট্রোল করা তুলনামূলকভাবে সহজ এবং ব্যাচ ভেরিয়েশনও কম।

অপরপক্ষে বায়োলজিক্যাল সিস্টেমকে কন্ট্রোল করা অনেক দুরূহ কাজ, ব্যাচ ভ্যারিয়েশনও হয় বেশি। তাই বায়োলজিক্সের গুনগত মান নিশ্চিত করতে বড় ইনভেস্টমেন্টসহ বায়োমেডিকেল ফিল্ডের উচ্চতর সায়েন্টিফিক এবং টেকনিক্যাল দক্ষতা প্রয়োজন। সে কারণে বায়োটেক ড্রাগগুলোর প্রস্তুতকারক মূলত উন্নত বিশ্ব(আমেরিকা এবং ইউরোপ)। যেকোন নতুন কেমিকেল ড্রাগ আবিষ্কার করার জন্য কমপক্ষে ১৫ হাজার পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষ ডকুমেন্টেশন করতে হয়। অন্যদিকে একটি বায়োলজিক্সের জন্য সাধারণত প্রয়োজন ৬০ হাজার ডকুমেন্টেশন।

বাংলাদেশে হাতেগোনা কয়েকটি ফার্মা কোম্পানি বায়োটেক ড্রাগ (বায়োসিমিলার) তৈরির স্কিল অর্জনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তারা এখনো বাজারজাত করার মত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। বর্তমানে যেসমস্ত দেশী কোম্পানির বায়োটেক প্রডাক্ট আমরা দেখি সেগুলো মূলত ফর্মুলেশন নির্ভর যার প্রধান কাঁচামাল বাইরে থেকে আমদানি করা হয়। এগুলো উন্নত বিশ্বে বাজারজাত করার তেমন সুযোগ নেই।

প্রতিবেশি ভারতের কিছু বায়োটেক ড্রাগ (বায়োসিমিলার) এফডিএ (FDA) এবং ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সি (EMA)-এর অনুমোদন পেয়েছে তাই ওই ড্রাগ গুলো আমেরিকা ও ইউরোপের বাজারে ব্যবহৃত হচ্ছে ।

ভারতে উৎপাদিত ওই ড্রাগগুলো পশ্চিমা দেশে উৎপাদিত ড্রাগের চেয়ে সস্তা কিন্তু একই মানের হওয়ায় ভারতের ড্রাগগুলোর চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। অদূর ভবিষ্যতে ভারতের বায়োটেক ড্রাগগুলো পশ্চিমা বিশ্বে সম্ভবত সফলতা লাভ করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশও এক্ষেত্রে সুযোগ নিতে পারে যদি গবেষণাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হয় যা কিনা ভারতের সাফল্যের মূলমন্ত্র।

ভ্যাকসিনের গুনগত মান এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

যেকোন বায়োলজিক্সের মতো একটি নতুন ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে অনেক বেশি সায়েন্টিফিক স্কিল, রিসোর্স ও সময় ব্যয় হয়। সাধারণত একটি ভ্যাকসিনের বাজারে আসতে কমপক্ষে ১০ বছর প্রয়োজন। এত দীর্ঘ সময় ব্যয় হওয়ার মূল কারন হচ্ছে ভ্যাকসিনটি সুস্থ মানুষের জন্য নিরাপদ কিনা তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিশ্চিত হওয়া।

ভ্যাকসিনের কাজ হচ্ছে আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা সিস্টেমকে (Immune system) সক্রিয় করে ভবিষ্যতে যদি কোন প্রাণঘাতী ভাইরাস আক্রমণ করে তা মোকাবেলা করা। যদি ভ্যাকসিনটি শরীরের প্রতিরক্ষা সিস্টেমকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সক্রিয় করে তাহলে তা হতে পারে প্রাণঘাতী।

প্রসঙ্গত, ১৯৬০ সালের পর থেকে কিছু ভাইরাসের (যেমন ডেঙ্গু, সার্স করোনা ভাইরাস-১, আরএসভি) বিরুদ্ধে নিরাপদ ভ্যাকসিন তৈরিতে আশানুরূপ সফলতা আসেনি।

ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিনগুলো ভাইরাসকে পরাস্ত না করে বরং নিজের প্রতিরক্ষা সিস্টেমের বিরুদ্ধেই (immune backfire) কাজ করেছে। অনেক বছর প্রচেষ্টার পর ডেঙ্গু ভ্যাকসিন (ডেংভ্যাকসিয়া) বাজারে ছেড়েছিল বিশ্বের সুনামধন্য সানোফি ফার্মাসিউটিক্যালস।

২০১৭ সালে এই ডেঙ্গু ভ্যাকসিন দেয়ার পর ফিলিপাইনে কয়েকজনের মৃত্যু হয় যার মূল কারণ ছিল এন্টিবডি ডিপেন্ডেন্ট এনহেন্সমেন্ট (Antibody-dependent Enhancement) ইমিউন ব্যাকফায়ার। এখনো সানোফির বিরুদ্ধে মামলা চলছে। Th1 mediated inflammatory reaction-এর কারনেও ইমিউন সিস্টেম নিজের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে। এসব কারনে আরএসভি (respiratory syncytial virus) ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিনের রিসার্চ প্রায় দুই যুগ বন্ধ ছিল। বিড়ালের করোনা (feline infectious peritonitis virus) ভাইরাসের বিরুদ্ধে ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিন ইমিউন ব্যাক ফায়ারের ইস্যুতে ব্যর্থ হয়।

এ প্রসঙ্গে সবচাইতে প্রথমে এবং সর্বাগ্রে যে বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার তা হলো, যে ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেটগুলো ইমিউন ব্যাকফায়ার করার কারণে বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা অন্যান্য সমস্যা তৈরি করেছিল, সেগুলো যেসব ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরি হয়েছিল, তাদের অনেকেই কোভিড.-১৯ এর মত ফুসফুসে সংক্রমণকারী (lower respiratory tract infection) ভাইরাস। তাই নিঃসন্দেহে কোভিড.-১৯ ভ্যাকসিন তৈরিতে যে অভূতপূর্ব সতর্কতা প্রয়োজন তা বলাই বাহুল্য।

কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে immune backfire এর ঘটনা ঘটে যা সাইটোকাইন ঝড় (Cytokine storm) নামে অভিহিত। এটি তীব্র আকার ধারণ করার কারণে রোগী মারা যায়।

সবচেয়ে চিন্তার বিষয় এই যে, করোনার ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিন ইমিউন ব্যাকফায়ার (Antibody-dependent Enhancement and Th1 mediated inflammation) করবে কিনা তা নিশ্চিত করে বিজ্ঞানীরা বলতে পারছেন না। এজন্য ভ্যাকসিন ফিল্ডের বড় বড় রিসার্চাররা জনগণের চাপে পড়ে তাড়াহুড়ো করে ভ্যাকসিন বাজারে ছাড়তে নিষেধ করছেন যা বিজ্ঞানের বিখ্যাত জার্নালে (Nature, Science, PNAS ) নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। তাই বড় বড় ভ্যাকসিন কোম্পানিগুলো (যাদের অনেকদিনের ভ্যাকসিন/বায়োলোজিক্স নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে) শুরুতে কম সময়ের টাইমলাইন বেধে ঘোষণা দিলেও তা থেকে সরে আসতে দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিককালে আমেরিকার বিখ্যাত বিজ্ঞানী ড. ফাউচি এ বিষয়ে আমেরিকান জনগণকে সচেতন করছেন।

ভ্যাকসিনের গুনগত মান নিশ্চিত করতে ভ্যাকসিনের Chemistry-manufacturing and control (CMC), preclinical and clinical characterization নিরূপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রি-ক্লিনিক্যাল স্টেজে ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এনিমেল মডেলে পরীক্ষা করা হয়। এরপর মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রথম ধাপের (Phase I) মূল লক্ষ্যই হলো এই ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিনগুলো নিরাপদ কিনা (বিরূপ প্রতিক্রিয়া করে কিনা) তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা। এর জন্য অনেক ধরনের বায়োলজিক্যাল মেথড. ডেভেলোপমেন্ট এবং ভেলিডেশন করতে হয়। কোভিড-১৯ যেহেতু নতুন ভাইরাস তাই এসব যাচাই-বাছাই করার জন্য পর্যাপ্ত সময় দরকার। এ প্রসংগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে ভ্যাকসিন এর কোয়ালিটি, সেইফটি এবং কার্যকারিতা নিশ্চতকরণে প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক (state-of-art) ইনফ্রাস্ট্রাকচার এখনো দেশে গড়ে উঠেনি।

রেগুলেটরি অথোরিটি ভ্যাকসিন অনুমোদন দেয়ার আগে কয়েক হাজার পাতার ড.সিয়ার (dossier) সুচারূভাবে মূল্যায়ন করে। এজন্য অনেক সময় লাগতে পারে। যেমন ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সির গড়পড়তা ২১০ দিন প্রয়োজন। মূল্যায়ন করতে একটি বড় টিম কাজ করে যেখানে CMC, preclinical and clinical development এর বড় বড় বিজ্ঞানী, ক্লিনিসিয়ান রিসার্চারসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞ থাকেন। ভ্যাকসিন তৈরির বিভিন্ন ধাপ (CMC, preclinical and clinical development, dossier preparation) নিয়ে বিস্তারিত লেখার আশা রাখি।

জনগণের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোন দেশের সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বাংলাদেশের রেগুলেটরি অথোরিটি যেন ভ্যাকসিনের গুনগত মান নিশ্চিত করতে নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন।

ভ্যাকসিনের গুনগত মান এবং ঝুঁকি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিস্তারিত তথ্য –
১। Don’t rush to deploy COVID-19 vaccines and drugs without sufficient safety guarantees (Nature, 2020)
২। News Feature: Avoiding pitfalls in the pursuit of a COVID-19 vaccine (Proceedings of the National Academy of Sciences of the United States of America, 2020)
৩। COVID-19 vaccine design: the Janus face of immune enhancement (Nature Reviews Immunology, 2020)

লেখক: ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন

নির্বাহী পরিচালক, বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ ফাউণ্ডেশন, বাংলাদেশ এসোসিয়েট প্রফেসর, আইইউবি

ড. রেজাউল করিম

প্রজেক্ট ম্যানেজার, WHO-Utrecht Center of Excellence for Affordable Biotherapeutics, Netherlands

ভ্যাকসিন ও বায়োটেক ড্রাগ তৈরিতে বাংলাদেশ কি সক্ষমতা অর্জন করেছে?

 ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন ও ড. রেজাউল করিম 
১২ জুলাই ২০২০, ০৯:০৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
সাধারণত একটি ভ্যাকসিনের বাজারে আসতে কমপক্ষে ১০ বছর প্রয়োজন।
নতুন কেমিকেল ড্রাগ আবিষ্কার করার জন্য কমপক্ষে ১৫ হাজার পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষ ডকুমেন্টেশন করতে হয়। ফাইল ছবি

ভ্যাকসিন নিয়ে দেশের মিডিয়াতে সাম্প্রতিককালে বেশ আলোচনা হচ্ছে। আমাদের দেশ নতুন ভ্যাকসিন তৈরির সক্ষমতা কি অর্জন করতে পেরেছে? এটা  অনুধাবন করার জন্য দেশের ঔষধ শিল্পের সক্ষমতা নিয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে অভিমত তুলে ধরার আগে আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা এবং অভিজ্ঞতা জানানো দরকার। আমরা দু’জনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজিতে  গ্রাজুয়েট।  ড. হোসেন এর ১০ বছরের বেশি সময়  বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফিল্ডে  বিশ্বমানের ট্রেইনিং (PhD, National University of Singapore, Postdocs- DUKE-NUS Graduate Medical School and Singapore Cancer Centre) আছে  এবং রয়েছে দেশে একাডেমিয়া (এসোসিয়েট প্রফেসর) এবং ইন্ডাস্ট্রি মিলে (সিনিয়র ম্যানেজার, বায়োটেক ডিভিশন, দেশের একটি প্রতিষ্ঠিত ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি) ১০ বছরের  কাজের অভিজ্ঞতা।

অন্যদিকে ড. করিম ইমিউনোলোজিস্ট  হিসেবে বর্তমানে WHO-Utrecht Center of Excellence for Affordable Biotherapeutics, নেদারল্যান্ডসে  বায়োথেরাপিউটিক ডেভলোপমেন্টর প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন যেখানে তার টিমের একটি বায়োটেক ড্রাগ (এন্টিবডি) প্রথম ধাপের (Phase-I)  ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে।

ড. করিম Netherlands Medicines Evaluation Board (MEB) এর সাবেক নির্বাহী পরিচালকের সাথে বর্তমানে কাজ করছেন। তাঁর বিশ্বের স্বনামধন্য তিনজন বিজ্ঞানীর (ইমিউনোলজিস্ট) অধীনে রিসার্চ ট্রেইনিং (MS. PhD and Postdocs) নেয়ার সুযোগ হয়। ড. করিম নেদারল্যান্ডসে ন্যাসড্যাক (NASDAQ) এনলিস্টেড. একটি বায়োটেক ড্রাগ ডেভেলোপমেন্ট কোম্পানিতে দু’বছর প্রি-ক্লিনিক্যাল সায়েন্টিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন যেখানে তার টিমে দুটি বায়োটেক এন্টিবডি ফেজ-১/২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে। দু’জনের দেশ-বিদেশের প্রায় ২০ বছরের একাডেমিয়া, রিসার্চ এবং ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অভিমত তুলে ধরছি।

দেশের ঔষধ শিল্পের উত্থান

গত ৩০ বছরে  দেশের ঔষধ শিল্প লক্ষ্যনীয় অগ্রগতি সাধন করেছে। স্থানীয়ভাবে ৯৮% চাহিদা মেটানোর পর বাংলাদেশের উৎপাদিত জেনেরিক ড্রাগ (অর্থাৎ- মূল ঔষধ প্রস্তুতকারকের তৈরিকৃত ঔষধের  অণুলিপি) বিশ্বের ১৩০টিরও বেশি দেশে রফতানি করা হচ্ছে। এ থেকে দেশ প্রতিবছর ১৩০ মিলিয়ন ড.লারের বৈদাশিক মুদ্রা অর্জন করে। এই উন্নতির মূলে রয়েছে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ড্রাস্ট্রিগুলোর চ্যালেঞ্জিং উদ্যোগ এবং ড্রাগ এড.মিনিস্ট্রেশন (Directorate General of Drug Administration) এর কার্যকরি সহায়তা।

ঔষধ অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের মত নয়, এখানে ঔষধের গুনগত মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরী কেননা অসুস্থ মানুষ নিরাময়ের  উদ্দেশ্যে এগুলো সেবন করেন। ঔষধের  গুনগত মান বজায় রাখতে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে প্রডাকশন প্ল্যান্ট, কিউসি (QC- quality control) এবং কিউএ (QA-Quality Assurance) ডিপার্টমেন্টগুলো যথাযথ এবং সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন অনুসরণ করছে কিনা তা ঔষধ প্রশাসনের রেগুলেটরি ডিপার্টমেন্ট সরেজমিনে তদন্ত করে সার্টিফিকিকেশন প্রদান করে।

বিদেশে (যেমন আমেরিকা, ইউরোপ) রফতানি করার অনুমোদন পেতে সেসব দেশের রেগুলেটরি  অথোরিটির জটিল বাধা অতিক্রম করতে হয়। আশা জাগানিয়া বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ জেনেরিক ড্রাগের ক্ষেত্রে গত তিন দশকে প্রভূত দক্ষতা (ইন্ডাস্ট্রি স্থাপন, দক্ষ জনশক্তি,  রেগুলেটরি বিষয়াদি) অর্জন করেছে।        

বাংলাদেশ কি প্রচলিত জেনেরিক ড্রাগের কাঁচামাল তৈরিতে সক্ষম? 

দেশের ঔষধ শিল্পের যথেষ্ট অগ্রগতি হলেও এখনো বাংলাদেশ ঔষধ প্রস্তুতের কাঁচামাল (এপিআই, Active pharmaceutical ingredient) তৈরিতে সক্ষমতা অর্জন করেনি। এগুলো বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে মূলত ঔষধের ফর্মুলেশন এবং প্যাকেজিং হয়।  ২০৩৩ সালের মধ্যে কাঁচামাল তৈরির সক্ষমতা অর্জন না করতে পারলে দেশের  ঔষধ শিল্প হুমকির মধ্যে পড়ে যাবে।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এতদিন বাংলাদেশ ঔষধের মূল প্রস্তুতকারক কোম্পানির প্যাটেন্ট ইস্যুতে ছাড় পেয়ে এসেছে। জেনেরিক ড্রাগের কাঁচামাল তৈরি করতে অনেক দক্ষতা,  বিনিয়োগ এবং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন যা কিনা  বাংলাদেশের কোন ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি এখনো  অর্জন করতে পারেনি। হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি এপিআই তৈরির সক্ষমতা অর্জন করার  প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আশা করা যায়  ২০৩৩ সালের মধ্যে কয়েকটি কোম্পানি সম্ভবত সেই সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।      

জেনেরিক এবং বায়োটেক ড্রাগ (যেমন ইনসুলিন) এর তুলনামূলক প্রযুক্তিগত জটিলতা

জেনেরিক ড্রাগগুলোর (small molecule, যেমন প্যারাসিটামল, এন্টিবায়োটিক) এপিআই কেমিকেল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা হয়। অন্যদিকে বায়োটেক ড্রাগ (Large molecule) বা  বায়োলজিক্স (যেমন ইনসুলিন) বায়োলজিক্যাল প্রসেসের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। কেমিকেল ড্রাগ  সিন্থেসিস কন্ট্রোল করা তুলনামূলকভাবে সহজ এবং ব্যাচ ভেরিয়েশনও কম।

অপরপক্ষে বায়োলজিক্যাল সিস্টেমকে কন্ট্রোল করা অনেক  দুরূহ  কাজ, ব্যাচ ভ্যারিয়েশনও হয় বেশি। তাই বায়োলজিক্সের গুনগত মান নিশ্চিত করতে বড় ইনভেস্টমেন্টসহ বায়োমেডিকেল ফিল্ডের উচ্চতর সায়েন্টিফিক এবং টেকনিক্যাল দক্ষতা  প্রয়োজন। সে কারণে বায়োটেক ড্রাগগুলোর প্রস্তুতকারক মূলত উন্নত বিশ্ব(আমেরিকা এবং ইউরোপ)। যেকোন নতুন কেমিকেল ড্রাগ আবিষ্কার করার  জন্য কমপক্ষে  ১৫ হাজার পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষ ডকুমেন্টেশন করতে হয়। অন্যদিকে একটি বায়োলজিক্সের জন্য সাধারণত প্রয়োজন ৬০ হাজার ডকুমেন্টেশন।     

বাংলাদেশে হাতেগোনা কয়েকটি ফার্মা কোম্পানি বায়োটেক ড্রাগ (বায়োসিমিলার) তৈরির স্কিল অর্জনের  প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তারা এখনো বাজারজাত করার মত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।  বর্তমানে যেসমস্ত দেশী কোম্পানির বায়োটেক প্রডাক্ট আমরা দেখি সেগুলো মূলত ফর্মুলেশন নির্ভর যার প্রধান কাঁচামাল বাইরে থেকে আমদানি করা হয়। এগুলো উন্নত বিশ্বে বাজারজাত করার তেমন সুযোগ নেই।

প্রতিবেশি ভারতের কিছু বায়োটেক ড্রাগ (বায়োসিমিলার) এফডিএ (FDA) এবং ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সি (EMA)-এর  অনুমোদন পেয়েছে তাই ওই ড্রাগ গুলো আমেরিকা ও ইউরোপের বাজারে ব্যবহৃত হচ্ছে ।  

ভারতে উৎপাদিত ওই ড্রাগগুলো পশ্চিমা দেশে উৎপাদিত ড্রাগের চেয়ে সস্তা কিন্তু একই মানের হওয়ায় ভারতের ড্রাগগুলোর চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। অদূর ভবিষ্যতে ভারতের বায়োটেক ড্রাগগুলো পশ্চিমা বিশ্বে সম্ভবত সফলতা লাভ করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশও এক্ষেত্রে  সুযোগ নিতে পারে যদি গবেষণাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হয় যা কিনা ভারতের সাফল্যের মূলমন্ত্র।

ভ্যাকসিনের গুনগত মান এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

যেকোন বায়োলজিক্সের মতো একটি নতুন ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে অনেক বেশি সায়েন্টিফিক স্কিল, রিসোর্স ও সময় ব্যয় হয়। সাধারণত একটি ভ্যাকসিনের বাজারে আসতে কমপক্ষে ১০ বছর প্রয়োজন।  এত দীর্ঘ সময় ব্যয় হওয়ার মূল কারন হচ্ছে ভ্যাকসিনটি  সুস্থ মানুষের জন্য নিরাপদ কিনা তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিশ্চিত হওয়া।

ভ্যাকসিনের কাজ হচ্ছে আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা সিস্টেমকে (Immune system) সক্রিয়  করে ভবিষ্যতে যদি কোন প্রাণঘাতী ভাইরাস আক্রমণ করে তা মোকাবেলা করা। যদি ভ্যাকসিনটি শরীরের প্রতিরক্ষা সিস্টেমকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সক্রিয় করে তাহলে তা হতে পারে প্রাণঘাতী।

প্রসঙ্গত,  ১৯৬০ সালের পর থেকে  কিছু ভাইরাসের (যেমন ডেঙ্গু, সার্স করোনা ভাইরাস-১, আরএসভি) বিরুদ্ধে নিরাপদ ভ্যাকসিন  তৈরিতে আশানুরূপ সফলতা আসেনি।

ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিনগুলো  ভাইরাসকে পরাস্ত না করে বরং নিজের প্রতিরক্ষা সিস্টেমের বিরুদ্ধেই (immune backfire) কাজ করেছে। অনেক বছর প্রচেষ্টার পর ডেঙ্গু ভ্যাকসিন (ডেংভ্যাকসিয়া) বাজারে ছেড়েছিল বিশ্বের সুনামধন্য সানোফি ফার্মাসিউটিক্যালস।

২০১৭ সালে এই ডেঙ্গু ভ্যাকসিন দেয়ার পর ফিলিপাইনে কয়েকজনের মৃত্যু হয় যার মূল কারণ  ছিল  এন্টিবডি ডিপেন্ডেন্ট এনহেন্সমেন্ট (Antibody-dependent Enhancement) ইমিউন ব্যাকফায়ার। এখনো সানোফির বিরুদ্ধে মামলা চলছে। Th1 mediated inflammatory reaction-এর কারনেও ইমিউন সিস্টেম নিজের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে। এসব কারনে আরএসভি (respiratory syncytial virus)  ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিনের  রিসার্চ প্রায় দুই যুগ বন্ধ ছিল।  বিড়ালের করোনা (feline infectious peritonitis virus) ভাইরাসের বিরুদ্ধে ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিন ইমিউন ব্যাক ফায়ারের ইস্যুতে ব্যর্থ হয়।  

এ প্রসঙ্গে সবচাইতে প্রথমে এবং সর্বাগ্রে যে বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার তা হলো, যে ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেটগুলো ইমিউন ব্যাকফায়ার করার কারণে বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা অন্যান্য সমস্যা তৈরি করেছিল, সেগুলো যেসব ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরি হয়েছিল, তাদের অনেকেই কোভিড.-১৯ এর মত ফুসফুসে সংক্রমণকারী (lower respiratory tract infection) ভাইরাস। তাই নিঃসন্দেহে কোভিড.-১৯ ভ্যাকসিন তৈরিতে যে অভূতপূর্ব সতর্কতা প্রয়োজন তা বলাই বাহুল্য।
 
কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত  বয়স্কদের ক্ষেত্রে immune backfire এর ঘটনা ঘটে যা  সাইটোকাইন ঝড় (Cytokine storm) নামে অভিহিত। এটি  তীব্র  আকার ধারণ করার কারণে রোগী মারা যায়।

সবচেয়ে চিন্তার বিষয় এই যে, করোনার ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিন ইমিউন ব্যাকফায়ার  (Antibody-dependent Enhancement and Th1 mediated inflammation) করবে  কিনা তা নিশ্চিত করে বিজ্ঞানীরা বলতে পারছেন না। এজন্য ভ্যাকসিন ফিল্ডের বড় বড় রিসার্চাররা জনগণের চাপে পড়ে তাড়াহুড়ো করে ভ্যাকসিন বাজারে ছাড়তে নিষেধ করছেন যা বিজ্ঞানের বিখ্যাত জার্নালে (Nature, Science, PNAS ) নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।  তাই বড় বড় ভ্যাকসিন কোম্পানিগুলো (যাদের অনেকদিনের ভ্যাকসিন/বায়োলোজিক্স নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে) শুরুতে কম সময়ের টাইমলাইন বেধে ঘোষণা দিলেও তা থেকে সরে আসতে দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিককালে আমেরিকার  বিখ্যাত  বিজ্ঞানী ড. ফাউচি এ বিষয়ে আমেরিকান জনগণকে সচেতন করছেন।

ভ্যাকসিনের গুনগত মান নিশ্চিত করতে ভ্যাকসিনের Chemistry-manufacturing and control (CMC), preclinical and clinical characterization নিরূপন  অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রি-ক্লিনিক্যাল স্টেজে  ভ্যাকসিনের  পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এনিমেল মডেলে পরীক্ষা করা হয়। এরপর মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রথম ধাপের (Phase I) মূল লক্ষ্যই হলো এই  ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিনগুলো নিরাপদ কিনা (বিরূপ প্রতিক্রিয়া করে কিনা) তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা। এর জন্য অনেক ধরনের বায়োলজিক্যাল মেথড. ডেভেলোপমেন্ট এবং ভেলিডেশন করতে হয়।  কোভিড-১৯ যেহেতু নতুন ভাইরাস তাই এসব যাচাই-বাছাই করার জন্য পর্যাপ্ত  সময় দরকার।  এ প্রসংগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে ভ্যাকসিন এর কোয়ালিটি, সেইফটি এবং কার্যকারিতা নিশ্চতকরণে  প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক (state-of-art) ইনফ্রাস্ট্রাকচার এখনো দেশে গড়ে উঠেনি।    

রেগুলেটরি অথোরিটি ভ্যাকসিন অনুমোদন দেয়ার আগে কয়েক  হাজার পাতার ড.সিয়ার (dossier) সুচারূভাবে  মূল্যায়ন করে। এজন্য অনেক   সময় লাগতে পারে। যেমন ইউরোপিয়ান মেডিসিনস  এজেন্সির গড়পড়তা  ২১০  দিন প্রয়োজন। মূল্যায়ন করতে একটি বড় টিম কাজ করে যেখানে CMC, preclinical and clinical development এর  বড় বড় বিজ্ঞানী, ক্লিনিসিয়ান রিসার্চারসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞ থাকেন। ভ্যাকসিন তৈরির বিভিন্ন ধাপ (CMC, preclinical and clinical development, dossier preparation) নিয়ে বিস্তারিত  লেখার আশা রাখি।      

জনগণের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোন দেশের সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বাংলাদেশের রেগুলেটরি অথোরিটি যেন ভ্যাকসিনের গুনগত মান নিশ্চিত করতে নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন।

ভ্যাকসিনের গুনগত মান এবং ঝুঁকি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিস্তারিত তথ্য –
১। Don’t rush to deploy COVID-19 vaccines and drugs without sufficient safety guarantees (Nature, 2020)
২। News Feature: Avoiding pitfalls in the pursuit of a COVID-19 vaccine (Proceedings of the National Academy of Sciences of the United States of America, 2020)
৩। COVID-19 vaccine design: the Janus face of immune enhancement (Nature Reviews Immunology, 2020)

লেখক: ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন

নির্বাহী পরিচালক, বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ ফাউণ্ডেশন, বাংলাদেশ এসোসিয়েট প্রফেসর, আইইউবি

ড. রেজাউল করিম

প্রজেক্ট ম্যানেজার, WHO-Utrecht Center of Excellence for Affordable Biotherapeutics, Netherlands