Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

ইরানের মিত্র নাকি নিজস্ব স্বার্থে চলে হুথিরা

Advertisement

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০২ পিএম

ইরানের মিত্র নাকি নিজস্ব স্বার্থে চলে হুথিরা

Advertisement

১২ অক্টোবর রয়টার্স জানাল, রিয়াদের বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পর সৌদি আরবের ওপর নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। হুথিরা কিছু হামলার দায় স্বীকার করেছে, সৌদি কর্তৃপক্ষও বিবৃতি দিয়েছে। তবে দুই পক্ষের দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

হুথিদের নিয়ে আলোচনায় দুটি ভুল ধারণা বহুল প্রচলিত। প্রথমটি হলো, তারা ইরানের নির্দেশে চলা বাহিনী। দ্বিতীয়টি, তারা হরমুজ প্রণালির মতো বিশ্ব জ্বালানির পথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। দুটিই বাস্তবতার সরলীকরণ, আর এমন সরলীকরণ থেকেই ভুল নীতি জন্ম নেয়।

প্রথম ভুলটি ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না। 

হুথিদের আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ। আন্দোলনটির জন্ম উত্তর ইয়েমেনের সা'দা প্রদেশে, যা জায়দি শিয়া ঐতিহ্যের কেন্দ্র। জায়দি মতবাদ ইরানের দ্বাদশী শিয়া মতবাদ থেকে আলাদা। 

১৯৯০-এর দশকে সা'দায় ধর্মীয় পুনর্জাগরণ শুরু হয়, যার পেছনে ছিল সৌদি-প্রভাবিত সালাফি ধারার সঙ্গে মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলার ক্ষোভ। ২০০৪ সালে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন আল-হুথি নিহত হন, কিন্তু আন্দোলন থামেনি। ২০১০ সাল পর্যন্ত ছয় দফা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সংগঠনটি আরও শক্ত হয়। 

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ ও মার্কিন কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এর শিকড় ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায়; ইরানের সহায়তা এসেছে অনেক পরে।

তবে ইরানের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। তেহরান রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে এবং সামরিক সহায়তার অভিযোগও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে, যদিও সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায় না। কিন্তু সমর্থক আর নিয়ন্ত্রক এক নয়। হুথিদের নিজস্ব নেতৃত্ব, স্থানীয় লক্ষ্য ও আলাদা হিসাব আছে।

ক্ষমতায় ওঠাও ছিল রাষ্ট্রের পতনের ফল, শুধু সামরিক জয় নয়। ২০১১ সালের আরব বসন্তে আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতা ছাড়লে রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ভেঙে পড়ে। সরকার ছিল দুর্বল, সেনাবাহিনী বিভক্ত। এই সুযোগে হুথিরা সালেহপন্থী নেটওয়ার্কের সঙ্গে কৌশলগত সমঝোতা করে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে সানা দখল করে। 

২০১৫ সালের মার্চে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক অভিযান শুরু করে, কিন্তু তাতে সংকটের সমাধান হয়নি; ইয়েমেন পড়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুতর মানবিক সংকটে। ২০২২ সালের জাতিসংঘ-মধ্যস্থ যুদ্ধবিরতিও পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তিতে রূপ নেয়নি।

এরপর এল গাজা যুদ্ধ। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে হুথিরা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতির কথা বলে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়। কিন্তু আক্রান্ত সব জাহাজের ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি যোগ ছিল, এমন প্রমাণ নেই। ঝুঁকিতে পড়েছেন নাবিক ও শিপিং কোম্পানি, আর বাড়তি খরচের চাপ শেষ পর্যন্ত পড়ছে ভোক্তার ওপর। 

২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য হুথি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। ২০২৫ সালে ওমানের মধ্যস্থতায় মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধের সমঝোতা হলেও তা স্থায়ী সমাধান ছিল না; পরে কিছু অ-মার্কিন জাহাজ আবার হামলা ও হুমকির মুখে পড়ে। ঝুঁকি এড়াতে অনেক জাহাজ এখন আফ্রিকা ঘুরে যাচ্ছে, ফলে বেড়েছে যাত্রার সময়, জ্বালানি ব্যয় ও বীমা খরচ।

দ্বিতীয় ভুলটি ধরা পড়ে ভূগোলেই। হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে; এর উত্তরে ইরান, দক্ষিণে ওমান। ইয়েমেন থেকে এর দূরত্ব অনেক। হুথিদের নাগাল বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগর পর্যন্ত। 

বাব আল-মান্দেব এডেন উপসাগরকে লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত করে, আর সেই পথেই এশিয়া থেকে সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপে জাহাজ যায়।

মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে হরমুজ দিয়ে দৈনিক গড়ে প্রায় ২০.৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল গেছে, যা বিশ্বের তরল জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। একই সময়ে বাব আল-মান্দেব দিয়ে গেছে প্রায় ৪.২ মিলিয়ন ব্যারেল। দুটি পথই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সমান নয়। 

আবার সমুদ্রপথে ঝুঁকি বাড়লেই তেলের দাম নির্দিষ্ট হারে বাড়বে, এমনও নয়; দাম নির্ভর করে প্রকৃত সরবরাহ-বিঘ্ন, বিকল্প পথ, মজুত ও বাজারের প্রত্যাশার ওপর।

২০২৬ সালে সংঘাত ফের তীব্র হয়েছে। যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির ৫ অক্টোবরের গবেষণা-সংক্ষেপ অনুযায়ী, বছরের শুরুতে দক্ষিণ ইয়েমেনের শক্তিবিন্যাসে বড় পরিবর্তন ঘটে, পরে হুথি ও সৌদি-সমর্থিত শক্তির লড়াই আবার জোরালো হয়। রিয়াদের সাম্প্রতিক হামলা এই ধারাবাহিকতারই অংশ।

ধর্মীয় ভাষ্য ব্যবহারেও সতর্কতা দরকার। ইসলামে ন্যায়বিচার, নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষা ও যুদ্ধের সীমা মানার নির্দেশনা আছে। এটি সব পক্ষের কাজ যাচাইয়ের মানদণ্ড, কোনো একটি সংগঠনের বৈধতার সনদ নয়। হুথিদের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য হাদিসও প্রতিষ্ঠিত নয়। আবার সব জায়দি মুসলমানকে হুথি সমর্থক ভাবাও ভুল, কারণ ধর্মীয় সম্প্রদায় ও রাজনৈতিক সংগঠন এক জিনিস নয়।

ইয়েমেনকে শুধু ‘হুথি বনাম সৌদি’ বা ‘ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র’ দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে সংকটের বড় অংশ আড়ালে থেকে যায়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভেঙে পড়া রাষ্ট্র, সম্পদ বণ্টনের বিরোধ ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এর মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ: বাস্তুচ্যুত পরিবার, বেতন না পাওয়া কর্মচারী, খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার অভাবে থাকা মানুষ।

হুথিরা এই সংকটের একটি প্রধান পক্ষ, কিন্তু ইয়েমেনের পুরো বাস্তবতা নন। যে নীতি এই পার্থক্য বোঝে না, তা সংকট মেটাবে না, বাড়াবে।

লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ইয়েমেনে ত্রাণ পাচ্ছে না ৮ লাখ মানুষ

ইয়েমেনে ত্রাণ পাচ্ছে না ৮ লাখ মানুষ

সৌদি আরামকোর সদরদপ্তরে হামলায় ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’

সৌদি আরামকোর সদরদপ্তরে হামলায় ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’

সৌদি লিগে স্থগিত রোনালদোর আল নাসরের ম্যাচ

সৌদি লিগে স্থগিত রোনালদোর আল নাসরের ম্যাচ

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলায় ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলায় ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না

শ্রীলংকান সেই যুবকের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করল সৌদি আরব

শ্রীলংকান সেই যুবকের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করল সৌদি আরব

‘সৌদি আরবে হামলার জন্য ইরাকের মাটি ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না’

‘সৌদি আরবে হামলার জন্য ইরাকের মাটি ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না’

আরও পড়ুন

ইরানের মিত্র নাকি নিজস্ব স্বার্থে চলে হুথিরা

ইরানের মিত্র নাকি নিজস্ব স্বার্থে চলে হুথিরা

ড. ইউনূসকে হেনস্তা করে কী অর্জন করল আওয়ামী লীগ?

ড. ইউনূসকে হেনস্তা করে কী অর্জন করল আওয়ামী লীগ?

অন্যমত স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

কোরামিন দিয়ে ফ্যাসিস্টের পুনরুত্থানের চেষ্টা

কোরামিন দিয়ে ফ্যাসিস্টের পুনরুত্থানের চেষ্টা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম