Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

আল্লামা আহমদ শফীর মৃত্যু ও গন্তব্যহীন পথচলার এক বছর

Advertisement

Icon

এম ওমর ফারুক আজাদ

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:০৩ পিএম

আল্লামা আহমদ শফীর মৃত্যু ও গন্তব্যহীন পথচলার এক বছর

ফায়ার সার্ভিসের একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে আল্লামা শফীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের ছবি।

Advertisement

একদা জুমার খুতবা দিচ্ছিলেন হজরত হাসান (রা.)। তার পিতা হজরত আলীও (রা.) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। 

হজরত হাসান (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আমি গত রাতে একটি স্বপ্ন দেখেছিলাম। দেখলাম হাশরের মাঠে আদালত কায়েম হলো। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা তার কুদরতি চেয়ারে বসে আছেন। রাসুল (সা.) গিয়ে চেয়ারের একটি খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে গেলেন। 

অতঃপর হজরত আবু বকর (রা.) এসে রাসুলের কাঁধে হাত রাখলেন, এরপর হজরত ওমর (রা.) এসে হাত রাখলেন আবু বকরের (রা.) কাঁধে। হঠাৎ হজরত উসমান (রা.) তার কর্তিত মস্তক মোবারক হাতে নিয়ে আসলেন। 

হজরত উসমান (রা.) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালাকে বলছেন, ‘ইয়া বারি তায়ালা আপনার বান্দাদের থেকে জিজ্ঞেস করুন যারা নিজেদের আপনার শেষ নবীর উম্মত দাবি করে; আমার কী দোষ ছিল আমাকে নির্মমভাবে শহিদ করল!’

এরপর হাসান (রা.) বললেন, আমি দেখলাম এ সময় তার মস্তক থেকে রক্ত গড়িয়ে সারা জমিন ভিজে যেতে লাগল। (তারিখে উম্মত- খেলাফতে রাশেদা, পৃষ্ঠা: ৪৬৪)

ইসলামের ইতিহাস গবেষকরা বলেছেন,স্বপ্নে উসমান (রা.) এর মস্তক থেকে যে রক্ত প্রবাহিত হয়েছিল তা ছিল মূলত ফেতনা বা অশান্তি; যা পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় ধরে মুসলিম বিশ্বকে অনৈক্য ও ফেতনার আগুন হয়ে পুড়িয়েছিল।

আজ ১৮ সেপ্টেম্বর। গত বছরের এই দিনে হাটহাজারী মাদ্রাসার কিছু বিপথগামী ও ভাড়াটিয়া (অন্য মাদ্রাসা থেকে হায়ার করে আনা) ছাত্রদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে পদত্যাগ করেন একবিংশ শতাব্দীর মুকুটহীন সম্রাট শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.)। একদিনের মাথায় মানসিক চাপ ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইহধাম ত্যাগ করেন তিনি। 

মূলত, হজরত উসমান (রা.) এর শাহাদাতের পর ইসলামী খেলাফতে যেমন বিশৃঙ্খলা ও প্রকাশ্য নৈরাজ্য শুরু হয়েছিল। শাইখুল ইসলাম আল্লামা আহমদ শফীর মৃত্যুর পরও এ দেশের কওমি আলেমরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে।

আল্লামা আহমদ শফী এ দেশের মুসলিম জনমানসে একবিংশ শতাব্দীর বিস্ময়। দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে একাধারে দারুল উলুম হাটহাজারীর মহাপরিচালকের পাশাপাশি শায়খুল হাদিসের দায়িত্ব পালন করেছেন। 

কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ শিক্ষা বোর্ড বেফাকের চেয়ারম্যান, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীরসহ এক কথায় কওমি অঙ্গনের এক সর্বেসর্বা বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ছিলেন তিনি। বটবৃক্ষের মতো এ দেশের আলেমদের আগলে রেখে পিতৃছায়া দিয়েছিলেন। 

কওমি মাদ্রাসাকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। আলেম সমাজ ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে হাজারও বিরোধের মাঝেও কেউ তার ভয়ে কখনো মুখ খোলার কিংবা আগবাড়িয়ে কিছু করবার দুঃসাহস করতেন না। তিনি ছিলেন ঐক্যের সর্বোচ্চ কাণ্ডারি। 
  
শত বছরে পার হলেও ফজর নামাজের পর থেকে মধ্যরাত অবধি হাদিসের পাঠদান, দেশব্যাপী সফর করতেন, যা ছিল রীতিমতো এক বিস্ময়কর ব্যাপার। 

২০২০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর হাটহাজারী মাদ্রাসায় শুরু হয় কথিত ছাত্র আন্দোলন। সেদিনের বিক্ষোভে শায়খুল ইসলামের কার্যালয় ভাঙচুর, অপমান আর মানসিক নির্যাতনের ভিডিও ফুটেজ এখনো নেট দুনিয়ায় ঘুরছে।

শায়খুল ইসলামের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর এ দেশের আলেম সমাজ ও কওমি মাদ্রাসাগুলোর ওপর নেমে আসে মুসিবতের পাহাড়সম মেঘ। অনেককে ভুগতে হচ্ছে লাঞ্ছনা, নির্যাতনে। মাদ্রাসা মাদ্রাসায় চলছে অস্থিতিশীলতা।  

গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বরের পর থেকে অদ্যাবধি এক অন্ধকার অধ্যায় পার করছে কওমি অঙ্গন। এ তরী পার করবার নাই কোনো নাবিক। হাটহাজারী মাদ্রাসার মহতামিমের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মুফতিয়ে আযম (রহ.) এর দুনিয়ার মায়া ত্যাগ আমাদের কি ইঙ্গিত দেয় তা একমাত্র চক্ষুষ্মান ও গভীর চিন্তার আলেম ও মানুষেরাই বুঝতে পারবেন।

গত বছরের এই দিনেই কিছু অপরিনামদর্শী ছাত্র হামলে পড়েছিল শতাব্দীর মহামনীষী শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর ওপর। রচনা করেছিল এক কালো ইতিহাস! কলংকিত করেছিল হাটহাজারীর পবিত্র ভূমিকে। কওমি অঙ্গনে বপন করেছে বিভক্তির স্থায়ী বীজ। ইতিহাস সাক্ষী, আল্লাহর ওলীদের সঙ্গে বেয়াদবিকারীরা যুগে যুগে লাঞ্ছিত হয়েছে।

যতদিন পর্যন্ত শায়খুল ইসলামের সঙ্গে ঔদ্ধত্য আচরণ ও তার কার্যালয় ভাঙচুরসহ মানসিক নির্যাতনকারী উগ্র ছাত্র এবং তাদের গডফাদারদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত সেদিনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীরা তওবা করে ফিরে না আসবে- ফেতনার কালো মেঘ কওমি অঙ্গনকে তাড়িয়ে বেড়াবেই। 

এছাড়াও কিয়ামতের ময়দানে শায়খুল ইসলাম যদি আল্লাহর কাছে বিচার নিয়ে বলেন- হে আল্লাহ! আমার কী অপরাধ ছিল। আমার সন্তানতুল্য ছাত্ররা আমাকে কী অপরাধে মানসিক নির্যাতন করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল? আমার কার্যালয়ে ভাঙচুর করে আমার আত্মাকে টুকরো টুকরো করে দিল? 

হে আল্লাহ আমার পরবর্তী নেতৃত্বদানকারীদের থেকে প্রশ্ন করুন কেন তারা এর বিচার বা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তখন কি উত্তর দেওয়ার থাকবে আমাদের?

লেখক: সাংবাদিক ও ফাযিলে দারুল উলুম হাটহাজারী

Advertisement

আল্লামা আহমদ শফী মৃত্যু গন্তব্যহীন পথচলার এক বছর

Advertisement

আরও পড়ুন

চায়ের আমন্ত্রণে সাংবিধানিক পদ থেকে পদত্যাগ: সাংবিধানিক রক্ষাকবচ কোথায়?

চায়ের আমন্ত্রণে সাংবিধানিক পদ থেকে পদত্যাগ: সাংবিধানিক রক্ষাকবচ কোথায়?

চীনারা কি বাংলাদেশকে অনলাইন স্ক্যাম নেটওয়ার্কের নতুন ঘাঁটি বানাচ্ছে?

চীনারা কি বাংলাদেশকে অনলাইন স্ক্যাম নেটওয়ার্কের নতুন ঘাঁটি বানাচ্ছে?

ইরানের মিত্র নাকি নিজস্ব স্বার্থে চলে হুথিরা

ইরানের মিত্র নাকি নিজস্ব স্বার্থে চলে হুথিরা

ড. ইউনূসকে হেনস্তা করে কী অর্জন করল আওয়ামী লীগ?

ড. ইউনূসকে হেনস্তা করে কী অর্জন করল আওয়ামী লীগ?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম