বিএনপির দুর্গে মঞ্জুর হার, কারণ কী?
আহমদ মুসা রঞ্জু, খুলনা
প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম
নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিএনপির ‘অভেদ্য দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণ এবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী চারটি সংসদ নির্বাচনে যেখানে টানা জয় পেয়েছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রার্থীরা, সেখানে এবার প্রথমবারের মতো বিজয় পতাকা উড়িয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
মাঠের রাজনীতিতে তিন দশকের বেশি সময় সক্রিয়, সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে অল্প ব্যবধানে পরাজিত করে জয় পান জামায়াতের খুলনা মহানগর সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও খোদ বিএনপির নেতাকর্মীদের মতে, এ পরাজয়ের পেছনে মূলত কাজ করেছে মঞ্জুর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং দলের দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল।
অতীত নির্বাচনের ইতিহাস বলছে, ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে খুলনা-২ আসন ছিল বিএনপির দখলে। এমনকি ২০০৮ সালের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও এ আসনে জয়ী হয়েছিলেন মঞ্জু।
আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের সময়েও মঞ্জু ছিলেন একেবারে ওয়ান ম্যান আর্মি। সব মিলিয়ে জনপ্রিয়তায় তিনি ছিলেন অন্য সব আসনের থেকে আলাদা। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছিল না। ফলে মঞ্জু এবং তার বলয়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছিল বলে মনে করছেন তৃণমূল নেতারা। যে কারণে প্রার্থী ঘোষণার পরেও প্রথম দিকে তাকে সেভাবে নির্বাচনি কার্যক্রম চালাতে দেখা যায়নি।
টুটপাড়া এলাকার বাসিন্দা মনোয়ার হোসেন বলেন, প্রার্থী ঘোষণার পরও মঞ্জু ভাইকে প্রথম পর্যায়ে মাঠে দেখা যায়নি। নির্দিষ্ট কার্যক্রমের বাইরে নেতাকর্মীদের ডোর টু ডোর ওয়ার্ক করতে দেখা যায়নি। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী হেলাল ছিল মাঠে ময়দানে সক্রিয়। ফলে রেজাল্ট যা হওয়ার হয়েছে।
অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থী শেখ জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল ছিলেন পরিকল্পিত ও কৌশলী। দলটির কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচার চালায়, বিশেষ করে নারী ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে ছিল তাদের বিশেষ উদ্যোগ। বিএনপির প্রচারণা যেখানে প্রধানত মূল সড়ক ও বাজারকেন্দ্রিক ছিল, জামায়াত সেখানে অলিগলি পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
এছাড়াও বিএনপির পরাজয়ের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দলীয় গ্রুপিং। ২০২১ সালে খুলনা মহানগর বিএনপির কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর থেকেই মঞ্জুর সঙ্গে বর্তমান নেতৃত্বের দূরত্ব তৈরি হয়। মহানগর, থানা ও ওয়ার্ড কমিটি থেকে মঞ্জু অনুসারীদের বাদ দেওয়া নিয়ে যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তা নির্বাচনের সময়েও শুকায়নি। বর্তমান কমিটির অনেক নেতাই তার পক্ষে মাঠে নামেননি। নির্বাচনের সপ্তাহ খানেক আগে আনুষ্ঠানিকভাবে ঐক্যের ছবি দেখা গেলেও বাস্তবে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল প্রকট। বর্তমান কমিটির অনেক প্রভাবশালী নেতাকর্মী মঞ্জুর পক্ষে জোরালোভাবে মাঠে নামেননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিএনপি নেতা বলেন, আমরা ধানের শীষের জন্য কাজ করেছি, কিন্তু প্রার্থীর নিজের বলয় আমাদের সেভাবে মূল্যায়ন করেনি।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়ক সেকেন্দার আলী খান সাচ্চু নিজেও কোন্দলের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, কোন্দলের জন্য ইফেক্ট পড়েছে বেশি। নির্বাচনের আগে আমরা দুই অংশ এক হলেও সবাই সেভাবে কাজ করেনি।
বিএনপির গ্রুপিং কোন্দলের মধ্যেই মাঠ গুছিয়ে নেয় জামায়াত। ১৯৯৬ সালের পর দীর্ঘ সময় এ আসনে প্রার্থী না দিলেও এবার পরিকল্পিতভাবে মাঠে নামে জামায়াত। দলটির কর্মী জিকু আলম জানান, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়টি আমাদের মাথায় ছিল। ভোটাররা বিএনপির ওপর আস্থা রাখলেও তাদের বিশৃঙ্খলার সুযোগ আমরা কাজে লাগিয়েছি। ছোট ছোট ইউনিটে ভাগ হয়ে পাড়া-মহল্লাভিত্তিক কাজ, ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করাই ছিল জামায়াতের মূল কৌশল।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, এ আসনে এবার তুলনামূলক ভোট কম পড়েছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা ভোটের ফলে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
অন্যদিকে খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এখনো বুঝে উঠতে পারছি না কেন হারলাম। হিসাব মিলছে না। বিষয়টি নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করছি।
অন্যদিকে খুলনা-২ আসনে জামায়াতের এ জয় আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে দলটিকে। তারা এখন সুসংগঠিত হয়ে কাজ শুরু করেছে। আগামীতে এ আসনকে নিজেদের অনুকূলে আরও গ্রহণযোগ্য করে গড়ে তুলতে কাজ করছে দলটির নেতাকর্মীরা।
