Logo
Logo
×

Advertisement

শিক্ষাঙ্গন

কওমি মাদ্রাসা রক্ষায় শায়খ আহমাদুল্লাহর ৬ প্রস্তাব

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ১০:২৯ পিএম

কওমি মাদ্রাসা রক্ষায় শায়খ আহমাদুল্লাহর ৬ প্রস্তাব

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

কওমি মাদ্রাসাগুলোতে শিশুদের শারীরিক ও যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ, জনআস্থা অটুট রাখা এবং দ্বীনি শিক্ষাব্যবস্থার ভাবমূর্তি রক্ষায় ছয় দফা প্রস্তাব দিয়েছেন প্রখ্যাত ইসলামি আলোচক ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে দেশের শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম ও দায়িত্বশীল মুরব্বিদের প্রতি তিনি এ আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, গণমাধ্যমের একটি অংশের একপেশে উপস্থাপনাকে সামনে রেখে বাস্তব সমস্যাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। একইভাবে বিচ্ছিন্ন কয়েকজন ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো কওমি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে দেওয়াও ন্যায়সঙ্গত নয়।

পোস্টে শায়খ আহমাদুল্লাহ লিখেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে কওমি মাদরাসাগুলো বারবার নেতিবাচক সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। একজন সাবেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে তিনি মনে করেন, দ্বীনি শিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি ও মানুষের আস্থা রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মনন গঠনে কওমি মাদরাসার অবদান অনস্বীকার্য। যুগের পর যুগ এই শিক্ষাব্যবস্থা মানুষের মধ্যে দ্বীনি শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ ও আদর্শিক চেতনা ছড়িয়ে আসছে। রাষ্ট্রীয় কোনো অনুদান ছাড়াই জনগণের দানে পরিচালিত লিল্লাহ বোর্ডিং ও এতিমখানাগুলোর মাধ্যমে লাখো এতিম, দরিদ্র ও অসহায় শিশুর শিক্ষা, আবাসন, খাদ্য ও চিকিৎসার দায়িত্বও এসব প্রতিষ্ঠান বহন করে আসছে। ফলে একদিকে রাষ্ট্র একটি বড় সামাজিক দায়িত্ব থেকে অনেকটাই মুক্ত থাকছে, অন্যদিকে দ্বীনি পরিবেশে সন্তানদের শিক্ষিত করতে আগ্রহী অসংখ্য পরিবারের আস্থার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কওমি মাদরাসা।

তবে এই অবদানের পাশাপাশি কিছু অস্বস্তিকর বাস্তবতাও স্বীকার করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন আবাসিক মাদরাসায় শিশুদের শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা সামনে এসেছে। অথচ ইসলামি শরিয়তে শিশুদের প্রতি কোমল আচরণের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। একই সঙ্গে যৌন নিপীড়ন ও সমকামিতাকে কবিরা গুনাহ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাই কতিপয় নামধারী শিক্ষকের এমন নিন্দনীয় ঘটনাকে তিনি উদ্বেগজনক ও লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেন।

শায়খ আহমাদুল্লাহ আরও বলেন, মাদরাসা শিক্ষিতরাও মানুষ। তারা ভুলের ঊর্ধ্বে নন। সমাজের অন্যান্য শ্রেণির মানুষের মতো তাদের মধ্যেও কেউ কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারেন। তাই অপরাধের ধরন ও গুরুত্ব অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

পোস্টে গণমাধ্যমের একটি অংশের সমালোচনাও করেছেন তিনি। তার দাবি, সমাজের অন্যান্য স্তরের তুলনায় আলেমদের অপরাধের হার কম হলেও কোনো ইসলামী পোশাকধারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই অনেক ক্ষেত্রে তা অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হয়। কোথাও কোথাও একজনের অপরাধ পুরো কওমি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। অন্যদিকে মাদরাসাগুলোর ইতিবাচক অবদান খুব কমই সংবাদে গুরুত্ব পায়।

উদাহরণ হিসেবে তিনি সম্প্রতি ফেনীর এক মক্তব শিক্ষকের ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে ওই শিক্ষক নির্দোষ প্রমাণিত হন এবং পরে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হয়। এ ছাড়া বহু বছর আগের মীমাংসিত ঘটনাও অনেক সময় নতুন ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে প্রচার করা হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে গণমাধ্যমের সমালোচনার পাশাপাশি বাস্তব সমস্যাকে অস্বীকার না করার আহ্বান জানিয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, সব সংবাদই মিথ্যা নয়। তাই মিডিয়ার অতিরঞ্জন বা ষড়যন্ত্রের অজুহাতে শিশু নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে মানুষের আস্থা কমে যাবে। শেষ পর্যন্ত এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে পুরো দ্বীনি শিক্ষাব্যবস্থার।

শায়খ আহমাদুল্লাহর ৬ প্রস্তাব

দ্বীনি শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, জবাবদিহিমূলক ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে ছয়টি প্রস্তাব দিয়েছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ।

প্রথম প্রস্তাব—

আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশের অধীনে শীর্ষ আলেম, আইনজ্ঞ ও মনস্তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটি গঠন। গুরুতর শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে এই কমিটি দ্রুত তদন্ত করবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সোপর্দ করার সুপারিশ করবে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের একটি কেন্দ্রীয় কালো তালিকা তৈরির প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি, যাতে তারা অন্য কোনো মাদরাসায় চাকরি নিতে না পারেন। আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে নিরপরাধ ব্যক্তির সম্মান পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছেন।

দ্বিতীয় প্রস্তাব—

ভুক্তভোগীদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় অভিযোগ গ্রহণ সেল ও হটলাইন চালুর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, অভিযোগকারীর পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রাখতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা নিশ্চিত করে অভিযোগ দ্রুত তদন্ত কমিটির কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তৃতীয় প্রস্তাব—

প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। ক্লাসরুম, বারান্দা, নূরানি, হিফজ ও আবাসিক বিভাগে সিসিটিভি স্থাপন এবং সার্বক্ষণিক মনিটরিং নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। কম বয়সী শিশুদের যথাসম্ভব অনাবাসিক রাখার পরামর্শও দিয়েছেন। আবাসিক মাদরাসায় বিছানার মধ্যে পর্যাপ্ত দূরত্ব রাখা এবং আর্থিক সক্ষমতা থাকলে পৃথক খাটের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেছেন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত সেবা নেওয়ার প্রচলন সম্পূর্ণ বন্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

চতুর্থ প্রস্তাব—

শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য কঠোর আচরণবিধি প্রণয়ন, শিশু মনস্তত্ত্ব ও শিশু সুরক্ষাবিষয়ক নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ, পরিপক্ব ও বিবাহিত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষকদের জন্য পারিবারিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কোয়ার্টার নির্মাণ ও নিয়মিত ছুটির ব্যবস্থারও সুপারিশ করেছেন।

পঞ্চম প্রস্তাব—

তিনি বালিকা মাদরাসার প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম পুরোপুরি নারী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রয়োজন ছাড়া সেখানে পুরুষ শিক্ষক বা কর্মচারী নিয়োগ না দেওয়ার পাশাপাশি বালিকা মাদরাসাগুলো যথাসম্ভব অনাবাসিক রাখার পরামর্শও দিয়েছেন।

ষষ্ঠ প্রস্তাব—

দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত ও মানহীন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পরিকল্পিত নীতিমালার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কার্যকর মাননিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বানও জানান তিনি।

শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, এসব প্রস্তাব সরাসরি বাস্তবায়ন করা আল-হাইআতুল উলইয়া বা বেফাকুল মাদারিসের পক্ষে সব ক্ষেত্রে সম্ভব নাও হতে পারে। তবে নিবন্ধন, নীতিমালা প্রণয়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর তদারকির মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পোস্টের শেষাংশে তিনি বলেন, দেশের মাদরাসাগুলো নীতি, নৈতিকতা ও মানবিক আদর্শের অন্যতম নিরাপদ ঠিকানা। এই পবিত্র অঙ্গনের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হলে তার ক্ষতি পুরো মুসলিম সমাজকেই বহন করতে হবে। তাই আত্মপক্ষ সমর্থনের পরিবর্তে আত্মসমালোচনা ও আত্মসংশোধনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, কওমি মাদরাসা ও দ্বীনি শিক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে দায়িত্বশীল আলেমরা তার প্রস্তাবগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন এবং সেগুলো বাস্তবায়নে সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম