রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলা: ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
Advertisement
ইরফানুর রহমান, রাবি
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৯ পিএম
রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলা
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার অভিযোগ উঠেছে। রোববার (৪ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় চার সাংবাদিক গুরুতর আহত হন। এছাড়া আরও কয়েকজন সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী আহত ও লাঞ্ছিত হন।
এর আগে গত শনিবার রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারকে নিয়ে ছাত্রদল নেতা এম আহসান হাবীবের একটি ফেসবুক পোস্টে রাকসুর সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক রাকিবুল ইসলামের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এ বিরোধের সূত্রপাত হয়। পরে এ নিয়ে পালটাপালটি পোস্ট ও জিয়া হলের সামনে অবস্থানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ’ নামে একটি গ্রুপে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারকে নিয়ে শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি এম আহসান হাবীবের একটি ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে তার বিরোধের সূত্রপাত হয়।
ওই পোস্টে ছাত্রদল নেতা এম আহসান হাবীব লেখেন- ‘খুনি, ধর্ষক, চাঁদাবাজ, মববাজ, নিয়োগ বাণিজ্যকারী, অর্থ আত্মসাৎকারী কুলাঙ্গার সালাউদ্দিন আম্মারের ডিএনএ টেস্টের দাবি জানাচ্ছি। আমি নিশ্চিত সে বহু নারীকে ভয় দেখিয়ে, ফাঁদে ফেলে অথবা লোভ দেখিয়ে বহুবার ধর্ষণ করেছে। ওর হিম্মত থাকলে ও প্রমাণ করুক সে ভার্জিন।’
ওই পোস্টের মন্তব্যে রাকিবুল ইসলাম লেখেন, ‘কার খুনের আসামি করলি? ক্লিয়ার কর। এগুলো ছাত্রলীগের বয়ান।’
তার মন্তব্যের জবাবে আহসান হাবীব লেখেন, ‘পঙ্গু মাসুদের খুনি সালাউদ্দিন আম্মার।’
পাল্টা জবাবে রাকিবুল অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করে লেখেন, ‘আগেই খুনি বানাই দিছো। এসব ছাত্রলীগ চু না। সালাহউদ্দিন আম্মারের সমালোচনা আছে। কিন্তু ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্য হাসিল হইতে দেওয়া হবে না। শা*** ছিঁড়া ফালানো খা*** পোলাগো। সো সাবধান।’
এ ঘটনার পরে রাকসুর সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক রাকিবুলকে মেসেঞ্জারে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এম আহসান হাবীব লেখেন, ‘বে*** ব্যাটা আমারে যে ছাত্রলীগ কইলি আমার প্রোফাইল দেখছস একবার? আমি একা যতো ছাত্রলীগ পিটায়ে পুলিশে দিছি তোর বাপ আম্মার আর তোর দাদা শফিকের দল জামাত-শিবির সারা দেশেও অতো ছাত্রলীগ পিটায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে একমাত্র মামলার বাদী আমি। সাহস থাকলে আয় আমার সামনে। গো*** ছাল তুলে ফেলবো বে*** ব্যাটা। আমারে চিনস? সৎ সাহস থাকলে লোকেশন বল তোর দেখা যাবে কে কার শা*** মা*** ছিঁড়ে ফেলে। ছাত্রলীগ, শিবির, বাম সব মিলেও এক আহসান হাবিবের চো*** সামলাতে পারবি না, টোটাল ছাত্রদলের কথা বাদই দিলাম।’
সেই মেসেজের জবাবে রোববার (৪ অক্টোবর) সকালে রাকিবুল বলেন, ‘ক্যাম্পাসেই থাকি। আজকে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত পরিবহণ মার্কেটে আছি। একাই থাকব। যদি পারে কেউ রাকিবের গায়ে হাত দিয়ে দেখাক। দেশ কারো কাছে বর্গা দেওয়া হয় নাই।’
পরে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত পরিবহণ চত্বরে অবস্থান করেন রাকিবুল। ফেসবুকে একাধিক পোস্টে তিনি তার অবস্থানের কথা জানান। বিকাল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে ছাত্রদল নেতা আহসান হাবীব না আসায় রাকিবুল চলে যান। পরে বিকাল ৫টা ৫৪ মিনিটে সেখানে অবস্থান নেন আহসান হাবীব। তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন ছাত্রদল নেতাকর্মীর হাতে বেসবল ব্যাট দেখা যায়। তারা রাত ১০টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থানের ঘোষণা দেন।
সন্ধ্যায় ছাত্রদল নেতাকর্মীদের এমন অবস্থানের সমালোচনা করে শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলাম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন- ‘তারেক রহমানের সোনার ছেলেরা চাঁদাবাজি ছেড়ে দিয়ে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করছে।’ এরপর রাতে ছাত্রদলের অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন নেতাকর্মী শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে জড়ো হন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তাদের কয়েকজনের হাতে রামদা, চাপাতি, হকিস্টিক, পাইপ ও বেসবল ব্যাটসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলামকে মারধর করা।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা
খবর পেয়ে প্রক্টর মাহবুবুর রহমান ঘটনাস্থলে গেলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অস্ত্রগুলো লুকিয়ে ফেলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। পরে তাদের হাতে অস্ত্র দেখতে পেয়ে দৈনিক সমকাল ও আজকের পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিরা ভিডিও ধারণ করতে গেলে সমকালের প্রতিনিধিকে লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়।
এ সময় আজকের পত্রিকার প্রতিনিধির মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিনিধিকেও মারধর করা হয়। পরে প্রক্টর সাংবাদিকদের হলের ভেতরে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার খবর পেয়ে অন্য সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গেলে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল ও আগামীর সময়ের প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলামকে মারধর করা হয়। এতে জাহিদুলের মাথা ফেটে যায়। এছাড়াও অন্য সাংবাদিকরা রক্ষা করার জন্য এগিয়ে এলে তাদের পুঁতে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।
হামলায় জড়িত ছাত্রদল নেতারা
এ ঘটনায় জড়িত ছাত্রদল নেতারা হলেন—বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ও আইন বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এম আহসান হাবীব; ছাত্রদল কর্মী ও অর্থনীতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের (ড্রপআউট) শিক্ষার্থী বিশাল চক্রবর্তী (যিনি এর আগে শাখা ছাত্রলীগের সেক্রেটারি আসাদুল্লাহ হিল গালিবের সঙ্গে রাজনীতি করতেন); যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের হাসিবুল ইসলাম; সহ-দপ্তর সম্পাদক ও সংগীত বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শাহরিয়ার আলম অথী; সহ-সভাপতি ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শরিফুল ইসলাম; সহ-সভাপতি ও আইবিএ ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের তাকবীর আহমেদ ইমন এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক ও ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের সৈয়দ সাজহারুল ইসলাম।
হামলার পরে সামাজিক মাধ্যমে নিজের টাইমলাইনে এক পোস্টে জড়িত ছাত্রদল নেতা ও সহ-সভাপতি এম আহসান হাবীব দাবি করেন, ‘কোনো নিরপেক্ষ সাংবাদিকের ওপর হামলা করা হয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তিকারী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, জিয়া হলের জিএস আরিফুলকে ধরতে জিয়া হলে গেলে সংক্ষুব্ধ ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ওপর যেসব সাংবাদিক নামধারী গুপ্ত শিবিরছানা হামলা করতে এসেছে, তাদের প্রতিহত করা হয়েছে মাত্র।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নীরব ভূমিকা
রোববার বিকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহণ চত্বরে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান করছিলেন রাবি ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, রাকসুর সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক রাকিবুল ইসলামকে মারধরের উদ্দেশ্যে তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন। ওই সময় হাসিবুল ইসলাম ফেসবুকে হকিস্টিক হাতে ছবি তুলে পোস্ট করে নিজের অবস্থানের জানান দেন। তবে ওই সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ৮টার দিকে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
হামলার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যর্থ, আমাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। আমরা পুলিশকে ফোন দিয়েছি, কিন্তু পুলিশও ভয়ে পালিয়ে গেছে।’
প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, হামলার আগে থেকেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে অবস্থানের অভিযোগের পরও যদি তখনই প্রশাসন ব্যবস্থা নিত, তাহলে পরবর্তী হামলার ঘটনা এড়ানো যেত কিনা—এমন প্রশ্ন তুলছেন সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীরা।
ঘটনার পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে জিয়া হলে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলীম এবং উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ। এ সময় ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকরা প্রশাসনের কাছে তিন দফা দাবি তুলে ধরে রাত ২টা পর্যন্ত হল প্রাধ্যক্ষের কক্ষেই অবস্থান নেন। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সোমবার দুপুর ১২টার মধ্যে মামলা করার আশ্বাস দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, মামলা হয়েছে এটা নিশ্চিত। হল প্রশাসন মামলা করেছে। তবে কাদের আসামি করা হয়েছে আমি জানি না।
জিয়া হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, হামলার ঘটনায় হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। তবে মামলায় নির্দিষ্ট কোনো নাম উল্লেখ না করে কতিপয় অজ্ঞাতনামা শিক্ষার্থীকে আসামি করা হয়েছে।
হামলার ঘটনায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও নাম কেন আসেনি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভিডিওতে হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে ধারণা থাকলেও প্রমাণ ছাড়া মামলায় কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের নাম উল্লেখ করা যায় না। অভিযুক্তরা ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিনা, তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত মামলায় সংগঠনের পরিচয় দেওয়া সম্ভব নয়।
হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শাস্তির দাবি
এদিকে আজ সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ব্যানারে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মানববন্ধনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা হামলার ঘটনায় জড়িত চিহ্নিত ছাত্রদল নেতাকর্মীদের দ্রুত শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকরা দোষীদের গ্রেফতারের দাবিতে বিকাল ৪টা পর্যন্ত আলটিমেটাম দিয়েছেন।
