রাকসু ভোটের আগে আম্মারকে বহিষ্কার, শিবিরের বিরুদ্ধে ফায়দা নেওয়ার অভিযোগ
Advertisement
রাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম
সালাহউদ্দিন আম্মার। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মারকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ‘সাথী’ পদ থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি সামনে আসার পর ক্যাম্পাসে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পরবর্তী রাকসু নির্বাচনে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে শিবির কৌশল গ্রহণ করছে বলে অভিযোগ করেছে ক্যাম্পাসের কয়েকটি ছাত্রসংগঠন।
ছাত্রসংগঠনগুলোর দাবি, রাকসু নির্বাচনে ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেল থেকে আম্মারের জিএস নির্বাচিত হওয়া এবং ওই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মেহেদী সজীবের পরে শাখা শিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা ছিল। সম্প্রতি আম্মারকে বহিষ্কারের বিষয়ে কয়েকটি চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর সেই আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে।
তবে শিবিরের দাবি, রাকসু নির্বাচনের এক মাসেরও বেশি আগে আম্মারকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। ফলে তাকে ‘ডামি প্যানেল’-এর মাধ্যমে নির্বাচনে আনার অভিযোগের ভিত্তি নেই।
গত বুধবার প্রকাশ্যে আসা তিনটি চিঠিতে আম্মারকে শিবির থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি উঠে আসে। চিঠিগুলোতে তার বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়া, সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে যেসব অভিযোগ
২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি শাখা শিবিরের তৎকালীন সভাপতি এবং বর্তমান রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে আম্মারের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী মহানগর ও জেলা কমিটিতে অর্থের বিনিময়ে পদ-বাণিজ্যের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে তার ‘সাথী’ পদ স্থগিত রেখে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়।
পরবর্তী একটি চিঠিতে বলা হয়, অভিযোগগুলোর ‘যথাযথ জবাব’ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সংগঠনের মাসিক সেক্রেটারিয়েট বৈঠকে আম্মারের ‘সাথী’ পদ বাতিল করে তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এছাড়া গত ৩১ জুলাই শাখা শিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সালের স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠিতে আম্মারের বহিষ্কারের বিষয়টি উল্লেখ করে সংগঠনের নেতাকর্মীদের তার সঙ্গে যোগাযোগ না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে আম্মারের কর্মকাণ্ড এবং ‘ক্ষেত্রবিশেষে ফৌজদারি অপরাধে জড়িত হওয়ার’ অভিযোগ তুলে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির কথাও বলা হয়।
‘রাজনৈতিক কৌশল’ দেখছেন ছাত্রসংগঠনগুলো
শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি শাকিলুর রহমান সোহাগ বলেন, আম্মারকে শিবির থেকে বিচ্ছিন্ন দেখানোর চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে তিনি সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। শিবিরের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে, তার মানে এই নয় যে আম্মার শিবির করেন না। এটি তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ। শিক্ষার্থীদের কাছে তাকে নিরপেক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
ছাত্র অধিকার পরিষদের শাখা সভাপতি মেহেদী মারুফও বহিষ্কারের বিষয়টিকে ‘লোকদেখানো’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, অফিসিয়ালি শিবির করতে না পারা কাজগুলোই আম্মার করেন। এখন এসে আম্মারের সঙ্গে শিবিরের সম্পর্ক নেই, এমন একটি ধারণা শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি নেহাতই শিবিরের আরেকটি অপকৌশল।
শাখা ছাত্র ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ কায়সার আহমেদ বলেন, শিবিরের একটি বর্ধিত ভার্সন হলো আম্মার। সংগঠন হিসেবে শিবির যেসব কর্মকাণ্ডের দায় নিতে পারত না, সেগুলো আম্মারকে দিয়ে করানো হয়েছে।
তিনি বলেন, রাকসুর বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষের দিকে। আম্মারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে পরবর্তী নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তার পুনরায় ম্যান্ডেট পাওয়ার বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এ কারণে তাকে বহিষ্কার দেখিয়ে নতুন কোনো ‘বি’ টিম সামনে আনা হতে পারে।
শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, রাজনীতিতে মিথ্যা বা প্রতারণার কোনো সুযোগ নেই। আম্মারকে ঘিরে শিবিরের সাম্প্রতিক অবস্থান তাদের আগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই আমরা মনে করি।
‘ডামি প্যানেল’ ছিল না: শিবির
২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন দশক পর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেল থেকে জিএস নির্বাচিত হন সালাহউদ্দিন আম্মার। ওই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ছিলেন মেহেদী সজীব। নির্বাচনের সময় তার সঙ্গে শিবিরের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আলোচনা ছিল। পরে তিনি শাখা শিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদকের দায়িত্ব পান।
তবে আম্মারকে ‘ডামি প্যানেল’-এর মাধ্যমে নির্বাচনে জেতানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাখা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান।
তিনি বলেন, আম্মার যদি আমাদের জনশক্তি হতেন বা ডামি প্যানেলের অংশ হতেন, তাহলে রাকসু নির্বাচনের এক মাসেরও বেশি আগে তাকে বহিষ্কার করা হতো না। আমাদের কোনো ডামি প্যানেল ছিল না। আমাদের এ টিম, বি টিম কোনোটিই ছিল না। বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রার্থী নিয়ে একটি ইনক্লুসিভ প্যানেল করার চেষ্টা করেছি।
মেহেদী সজীবের বিষয়ে তিনি বলেন, রাকসু নির্বাচনের সময় তিনি শিবিরের দায়িত্বশীল ছিলেন না। পরবর্তী সময়ে তিনি শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করে দায়িত্বশীল হয়েছেন। নির্বাচনের সময় শিবিরের পক্ষ থেকে মেহেদী সজীবকে সংগঠনের দায়িত্বশীল হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কোনো বক্তব্যও দেওয়া হয়নি।
অভিযোগ অস্বীকার আম্মারের
নিজের বিরুদ্ধে শিবিরের আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার। গত বুধবার রাতে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, আমি শেষ অধিবেশনে ছিলাম। এসে দেখি, আমি নাকি নারীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা, অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২০২৫ সালে বহিষ্কার হয়েছি।
নারীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশার অভিযোগ অস্বীকার করে আম্মার বলেন, আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।
আম্মার বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন কমিটি গঠনের সময় রাজশাহীর স্থানীয় শিক্ষার্থীরা একটি কমিটি নিয়ে তার কাছে এসেছিলেন। তবে ওই কমিটি গঠনের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে আম্মার বলেন, জুলাই আন্দোলন নিয়ে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য তৎকালীন উপাচার্যের পরামর্শে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের কাছে পৃষ্ঠপোষকতার প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। পরে সেটিকে ‘চাঁদা চাওয়ার চিঠি’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে বলে দাবি আম্মারের।
শিবির সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তিনি বলেন, আমি কখনোই শিবিরের সংশ্লিষ্টতা গোপন করিনি। যখন অনেকে পরিচয় দিতে ভয় পেত, তখনও শিবিরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছি। কিন্তু এখন যে অভিযোগগুলো আনা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত নই।
আম্মারের দাবি, শিবির তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ করলেও সেগুলোর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি। তিনি বলেন, আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, আজ পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর কোনোটির সঙ্গেই আমি সম্পৃক্ত নই।
আরেকটি ফেসবুক পোস্টে অর্থের বিনিময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পদ দেওয়ার অভিযোগের প্রমাণ দিতে শিবিরের প্রতি চ্যালেঞ্জ জানান তিনি। অভিযোগগুলোকে মিথ্যা অপপ্রচার বলেও মন্তব্য করেন আম্মার।
বহিষ্কারের কারণ জানাল শিবির
আম্মারকে বহিষ্কারের বিষয়ে শাখা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, আমাদের সংগঠনে কাউকে বহিষ্কার করা হলে সেটি পাবলিক করা হয় না। এটি আমাদের নীতিবিরুদ্ধ। আমাদের সাবেক এক ভাই ভুলবশত এটি করেছেন। আমরা ইতোমধ্যেই তার কাছে এর জবাব চেয়েছি।
বহিষ্কারের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমরা অভিযোগ পাওয়ার পর তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিই, কিন্তু তিনি সেটি করেননি। তাই তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ছাত্রশিবির আম্মারের কোনো কাজ সমর্থন করেনি। তিনি রাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধি হওয়ায় রাকসুতে আমাদের সংগঠনের প্রতিনিধিরা তার সঙ্গে শুধু সমন্বয় করেছেন, সমর্থনের কোনো বিষয় নেই।

-6abe79993e8d8.jpg)

