অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড
তুহিন-ফাহাদের পূর্বপরিকল্পনার তথ্য, সামনে আসছে নানা যোগসূত্র
Advertisement
সাঈদ হাসান, কুবি
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৪ পিএম
ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডে চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারদের মধ্যে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন ও ফাহাদের পূর্বপরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।
অপ্রতিমের বাবা ব্যবসায়ী কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের করা হত্যা মামলায় তুহিন ও ফাহাদসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার মোবাইল ফোনে আসা একাধিক কলের সূত্র ধরে অপর দুই কিশোরের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা থেকেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত। তবে তদন্তে আইফোনের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা ধার দেওয়া নিয়ে বিরোধের তথ্যও পাওয়া গেছে। এই বিরোধ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো ভূমিকা রেখেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে, অভিযুক্তদের সঙ্গে স্থানীয় ‘কোটবাড়ি বাইকার্স গ্রুপ’ নামের একটি কিশোর গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার তথ্যও সামনে এসেছে। এ ছাড়া ফাহাদ ও কামরুলকে ওই গোষ্ঠীর নেতৃস্থানীয় সদস্য রাতুলের জন্মদিন উদযাপনের অনুষ্ঠানে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে রাতুলকে কোটবাড়ি এলাকায় শোডাউনে অংশ নিতে দেখা যায়।
তুহিনের বিরুদ্ধে আগের অভিযোগ
প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনের বিরুদ্ধে এর আগেও বন্ধুর মোটরসাইকেল নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। এ ঘটনায় ২০২৫ সালে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন ভুক্তভোগী সোহাগের মা মরিয়ম আক্তার।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল রাতে কুমিল্লার সালমানপুরে অলি মিয়ার দোকানের সামনে থেকে সোহাগের মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান তুহিন। পরে মোটরসাইকেলটি ফেরত না দেওয়ায় থানায় অভিযোগ করেন সোহাগের মা। অভিযোগে মোটরসাইকেলটির ক্রয়মূল্য ২ লাখ ৫ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়।
সোহাগের পরিবারের অভিযোগ, তুহিনের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভালো সম্পর্ক থাকায় তিনি আগেও বিভিন্ন ঘটনায় পার পেয়ে গেছেন।
অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনকে দেখা গিয়েছে
প্রতিবেদকের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে প্রধান অভিযুক্ত তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। পরে তারা একটি অটোরিকশায় করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এসে নামেন।
ফাহাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট
অভিযুক্ত ফাহাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ সেপ্টেম্বর তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ছবি পোস্ট করেন। ছবিটির সঙ্গে তিনি ‘১৯৮০ এর রাজত্ব’ লিখেছিলেন।
এর চার দিন পর, ১৫ সেপ্টেম্বর, ‘কোটবাড়ি বাইকার্স গ্রুপ জুনিয়র’-এর নেতৃস্থানীয় সদস্য রাতুলের জন্মদিন উদযাপনের একটি ছবি ফাহাদের অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করা হয়। ছবিতে ওই গোষ্ঠীর কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে তাকে দেখা যায়।
হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ অপ্রতিমের বাবা ব্যবসায়ী কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের মোবাইল সরঞ্জামাদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেরই ডেলিভারিম্যান হিসেবে চাকরি করতেন। দুই সপ্তাহ আগে ১৪ হাজার টাকা মাসিক বেতনে তিনি কাজে যোগ দেন। তবে, এখনো তার সঙ্গে চুক্তিপত্র হয়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা থেকেই অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনা ঘটে। তবে তদন্তে আইফোনের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে ফাহাদের সঙ্গে আরেকটি বিরোধের তথ্যও পেয়েছে পুলিশ।
সূত্র বলছে, ফাহাদকে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল অপ্রতিম। সম্প্রতি সে টাকা ফেরত চায়। এ নিয়ে অপ্রতিমের ওপর বিরক্ত ছিল ওই কিশোর। অপ্রতিম বেঁচে না থাকলে টাকা ফেরত দিতে হবে না—এমন চিন্তাও তার মধ্যে ছিল বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন। তাই তুহিনের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ফাহাদও জড়িয়ে পড়ে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এসব ব্যক্তি ও ঘটনার পারস্পরিক যোগসূত্র কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এখনো তদন্তাধীন। পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, পরিকল্পনায় কারা জড়িত ছিল এবং প্রত্যেকের ভূমিকা কী—এসব বিষয় আরও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
এছাড়াও, তৃতীয় আসামি কামরুলের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করা বিভিন্ন সময়ের পোস্ট থেকে জানা যায় সে স্থানীয় 'কোটবাড়ি বাইকার্স গ্রুপ' নামক কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয় সদস্য।
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়া ও তার লাশ পাওয়ার পরে শোক প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সে চারটি পোস্ট দিয়েছে।
