সাত দিন পর সেই মাদ্রাসাছাত্র জিসান উদ্ধার
হাজারীবাগ (ঢাকা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৫ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর বংশাল থেকে নিখোঁজের সাত দিন পর ১১ বছরের মাদ্রাসাছাত্র মো. জিসানকে উদ্ধার করেছে পুলিশ।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টার দিকে বংশাল থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে অভিভাবকের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকালে বিষয়টি যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছেন ডায়েরির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাশেদুল ইসলাম।
জিসান গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থানার চরমাদারীপাড়া, হরিপুর ইউনিয়নের সাজু মিয়ার ছেলে। সে বংশাল থানাধীন সাতরওজা খাজে নেহাল জামে মসজিদের মাদ্রাসায় পড়ত। গত ২১ সেপ্টেম্বর আসরের নামাজের পর মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও সন্ধান না পেয়ে ২২ সেপ্টেম্বর বাবা সাজু মিয়া বংশাল থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন।
ডায়েরির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাশেদুল ইসলাম মাদ্রাসার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও অন্য ছাত্রদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ফুটেজে জিসানকে মাদ্রাসা থেকে বের হতে দেখা গেলেও এরপর সে কোন দিকে গেছে, তার আর কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। পরে জিসানের বাবা তার ছবি বিভিন্ন ফেসবুক অ্যাকাউন্টসহ ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।
নিখোঁজের খবর ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর সাজু মিয়ার ইমুতে অপরিচিত ও প্রতারক চক্রের সদস্যরা ফোন করে জিসানকে অপহরণ করা হয়েছে দাবি করে ৫০ হাজার টাকা চায়। পরে দেনদরবারের পর ১০ হাজার টাকা দিতে রাজি হন সাজু। ফোনকারীদের দেওয়া বিকাশ নম্বরে তিনি ১০ হাজার টাকা পাঠান। টাকা দেওয়ার পর জিসানকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হলেও পরে একই চক্র আবার ফোন করে টাকা দাবি করে। অন্য একটি নম্বর থেকেও পুলিশ পরিচয়ে জিসানকে উদ্ধার করে দেওয়ার কথা বলে টাকা চাওয়া হয়। একপর্যায়ে ৩ হাজার টাকা দাবি করলে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে পরিবার আর টাকা দেয়নি।
পুলিশ বিকাশ নম্বরটি পর্যালোচনা করে জানতে পারে, সেটির ঠিকানা গাজীপুরের শ্রীপুর থানা এলাকায়। পরে বংশাল থানা পুলিশের সহযোগিতায় ভুক্তভোগীর বাবাসহ শ্রীপুর থানা পুলিশ বিকাশের দোকান থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য বংশাল থানা পুলিশকে দেয়। তবে সেখানে কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
তদন্তে জানা যায়, মাদ্রাসার এক ছাত্রের মোবাইল ফোন ও ২০০-৩০০ টাকা জিসান লুকিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। জিজ্ঞাসাবাদে সে তা অস্বীকার করে। পরে তার বিছানার বালিশের নিচ থেকে ওই মোবাইল ফোনটি পাওয়া যায়। পুলিশের ধারণা, মোবাইল নেওয়ার অভিযোগে ভয় পেয়ে ২১ সেপ্টেম্বর আসরের নামাজের পর জিসান মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে যায়।
পুলিশের তদন্তে আরও জানা যায়, জিসান নিজেই মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে ওই দিন সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে একটি লঞ্চে চাঁদপুর চলে যায়। সেখানে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকার অটো মেকানিক সৈকতের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। একই দিন ২১ সেপ্টেম্বর সৈকতের সঙ্গে সে আবার ঢাকায় ফিরে আসে। পরে সৈকতের গ্যারেজে কাজ করে এবং তার বাসায় থাকে। কয়েকদিন সে সৈকতের সঙ্গেই ছিল।
জিসান নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে সৈকতকে জানায়, তার বাবা মারা গেছেন এবং মা অন্যত্র বিয়ে করেছেন। পরে তার কথাবার্তায় সৈকতের সন্দেহ হলে জিসানের মুখস্থ থাকা তার খালার মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে বিষয়টি তাকে জানানো হয়। ওই সূত্রে জিসানের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।
এসআই রাশেদুল ইসলাম জানান, তদন্তের শুরুতে তারা শিশুটিকে অপহরণ করা হয়েছে বলে মনে করেছিলেন। পরে তদন্ত গভীরে গিয়ে জানতে পারেন, জিসান নিখোঁজ হয়েছে। এই সুযোগে একটি প্রতারক চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পরিবারের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। চক্রটি প্রথমে ১০ হাজার টাকা নেয়, পরে আবারও টাকা দাবি করে। পুলিশ পরিচয় দিয়েও উদ্ধার করে দেওয়ার কথা বলে টাকা চাওয়া হয়। তবে পরিবার পরে আর টাকা দেয়নি।
তিনি আরও জানান, তদন্তে দেখা গেছে, জিসানের বাবার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত বিকাশ নম্বরটি দিয়ে প্রতারক চক্রটি আরও অনেকের কাছ থেকেও টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন। জিসানের বাবার কাছে অনলাইনে টাকা দাবি করা ব্যক্তিরা ইমুতে ফোন করে টাকা চাইছিল।
পরে জিসান যে ব্যক্তির কাছে এতদিন ছিল, তিনি তার পরিবারের জিসানের খালার মোবাইল নম্বরে ফোন দিলে ২৭ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে বংশাল থানার নিখোঁজ ডায়েরির তদন্তকারী কর্মকর্তা জিসানকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসেন। পরে বংশাল থানা পুলিশ তাকে অভিভাবকের কাছে বুঝিয়ে দেয়।
