সন্তানহীন সংসারে স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা শাহানাজ
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪০ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘আমার কোনো সন্তানাদি নেই। স্বামী ছিল একমাত্র ভরসা। সেই ভরসাও আজকে শেষ হয়ে গেল।’ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নতুন ভবনের চারতলার ৪০২ নম্বর ওয়ার্ডের ডেঙ্গু বিভাগের বেডের পাশে স্বামী লিটন মিয়ার নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলছিলেন শাহানাজ বেগম। স্বামী আর নেই কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না তার। বারবার স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলছিলেন, ‘আমার স্বামী ঘুমাচ্ছে, মরেনি।’
১২ বছর আগে লিটন মিয়ার সঙ্গে বিয়ে হয় শাহানাজ বেগমের। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে তাদের কোনো সন্তান হয়নি। স্বামীই ছিলেন তার একমাত্র ভরসা। ডেঙ্গুতে সেই স্বামীকে হারিয়ে এক মুহূর্তেই যেন নিঃস্ব হয়ে গেলেন তিনি। হাসপাতালের বেডের পাশে স্বামীর নিথর দেহ আঁকড়ে ধরে তার কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ।
লিটনের বাড়ি গাজীপুরের সফিপুর আনসার একাডেমির তিন নম্বর গেটসংলগ্ন এলাকায়। তিন ভাই, দুই বোন ও স্ত্রীকে নিয়ে সেখানেই ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি। আনসার একাডেমির পাশে গোমতী টেক্সটাইল লিমিটেডে প্রায় ১০ বছর ধরে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি করতেন।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বুধবার সকালে ঢামেক হাসপাতালের নতুন ভবনের চারতলার ৪০২ নম্বর ওয়ার্ডের ডেঙ্গু বিভাগে ভর্তি হন। এর আগে মঙ্গলবার গাজীপুরের সফিপুর সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
ঢামেক হাসপাতালের নতুন ভবনের সি-স্টাফ নার্স নাজনীন নাহার যুগান্তরকে জানান, হাসপাতালে আনার সময়ই লিটনের অবস্থা খারাপ ছিল। পরে ডায়রিয়া-আমাশয়ের মতো সমস্যা দেখা দেয়। রক্তচাপও খুব কম ছিল। দুই হাতে স্যালাইন দেওয়া হয়। রাতে ও সকালে স্যালাইন দিয়ে তার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হয়। এরপরও অবস্থার অবনতি হতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি মারা যান।
স্বজনরা জানান, লিটন প্রায় পাঁচ দিন ধরে তীব্র জ্বরে ভুগছিলেন। ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি কর্মস্থলে নাইট ডিউটিতে ছিলেন। পরদিন সকালে ডিউটি শেষে বাসায় ফেরেন। ভোর থেকে তার প্রচণ্ড জ্বর ও শরীর ব্যথা শুরু হয়। গুরুতর জ্বর নিয়ে দুদিন বাসায় ছিলেন। পরে অবস্থার অবনতি হলে সোমবার তাকে প্রথমে কালিয়াকৈরের শিমুলতলী সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে শয্যা না থাকায় তাকে সফিপুর সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে স্ত্রী শাহানাজ যুগান্তরকে জানান, গত বছরও লিটনের ডেঙ্গু হয়েছিল। তখন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি। এবারও তার স্বামী সুস্থ হয়ে ফিরবেন, এমন আশাই করেছিলেন তিনি।
লিটনের বড় ভাই মো. জুয়েল মিয়া যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা তিন ভাই ও দুই বোন। লিটন মিয়া মেজ ভাই। টানাটানির সংসার হলেও আমার ভাই আমাদের সব ভাই-বোনকে অনেক ভালোবাসত। তাকে হারিয়ে আমাদের পরিবার একেবারে শূন্য হয়ে গেল।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জুয়েল বলেন, ‘মৃত্যুর এক মিনিট আগে লিটন বলেছিল, আমাকে একটু নিচে শোয়াও, আমার শরীরটা ভালো লাগছে না। এরপরই আমার ভাই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল। এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, একটু আগেও যে ভাই আমার সঙ্গে কথা বলল, সে আর নেই।’

