যুগান্তরে সংবাদ প্রকাশ
ঢামেকে রোগীর স্বজনদের ওপর হামলার অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস
Advertisement
হাজারীবাগ (ঢাকা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১০ এএম
ঢামেকে মারধরের শিকার ভুক্তভোগী পরিবার। ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে এসে রোগীর স্বজনদের মারধরের অভিযোগ নিয়ে দৈনিক যুগান্তরে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছে হাসপাতাল প্রশাসন। ভুক্তভোগী পরিবারকে ডেকে কথা বলেছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম ফরহাদ হোসেন।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে পরিবারের সদস্য মমতাজ বেগম ও মো. আসাদুল্লাহ পরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে আগামী দুই দিনের মধ্যে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে স্বাস্থ্যকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা এ অভিযোগের ঘটনায় ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তদন্তের কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
গত ১০ অক্টোবর শনিবার রাতে ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চার নম্বর কক্ষের পাশে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। এ নিয়ে ১২ অক্টোবর সোমবার বিকালে দৈনিক যুগান্তরের অনলাইন সংস্করণে ‘ঢামেকে চিকিৎসা নিতে এসে রোগীর স্বজনদের ওপর হামলার অভিযোগ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশের পরদিনই হাসপাতাল প্রশাসনের সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারের সাক্ষাৎ হয়।
পরিবারের অভিযোগ, কুমিল্লার তিতাস থানার আলমপুর এলাকায় মারামারির ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া ইয়াকুবকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢামেকে আনা হয়েছিল। শনিবার রাত ৮টার দিকে হাসপাতালে পৌঁছে জরুরি বিভাগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও রসিদ জমা দেন তারা। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও চিকিৎসা না পেয়ে অনুরোধ করতে গেলে প্রথমে ইয়াকুবকে মারধর করা হয়। পরে তাকে রক্ষা করতে গিয়ে তার শ্বশুর মো. আসাদুল্লাহ, শাশুড়ি মমতাজ বেগম ও শ্যালক সিয়াম হোসেনও মারধরের শিকার হন বলে অভিযোগ পরিবারের।
ভুক্তভোগী মমতাজ বেগমের অভিযোগ, রাত ৮টা থেকে তারা বারবার চিকিৎসার অনুরোধ করলেও তাদের অপেক্ষা করতে বলা হয়। রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে ইয়াকুবকে জরুরি বিভাগের চার নাম্বার কক্ষের পাশে নেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা ও যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে তিনি চিকিৎসার অনুরোধ জানালে কয়েকজন স্টাফ তাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন। এ সময় বেশি কথা বললে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে দাবি তার।
মমতাজ বলেন, ‘আমার মেয়ের জামাই পাঁচ ঘণ্টা ধরে কষ্ট পাচ্ছিল। আমরা বারবার চিকিৎসার অনুরোধ করেছি। কিন্তু সে নিজের কষ্টের কথা বলতেই তাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। আমার স্বামী প্রতিবাদ করতে গেলে তার নাকে ঘুষি মারা হয়। নাক ফেটে রক্তে পাঞ্জাবি ভিজে যায়। এরপর আমার ছেলে সিয়াম এগিয়ে গেলে তাকেও মারধর করা হয়।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ছেলেকে মারধর করতে দেখে তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে পেছন থেকে স্টিলের পাইপ দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। এতে মাথা ঘুরে তিনি মাটিতে পড়ে যান। পরে এক কর্মী কাঁচি নিয়ে তার দিকে তেড়ে আসেন বলেও দাবি করেন তিনি। এ সময় বাইরে থাকা লোকজন চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। দরজা খোলার পর একজনের হাতে বড় ছুরি দেখতে পান বলেও অভিযোগ করেন মমতাজ। আতঙ্কিত হয়ে তারা সেখান থেকে চলে আসেন।
তার ভাষ্য, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন, তা তারা ভাবেননি। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন তিনি।
রোগীর শ্বশুর মো. আসাদুল্লাহ বলেন, মেয়ের জামাইকে ভালো চিকিৎসা করানোর জন্য ঢাকা মেডিকেলে এনেছিলাম। কিন্তু চিকিৎসা নিতে এসে হাসপাতালের নার্স ও কর্মচারীদের হাতে আমরা লাঞ্ছিত হয়েছি। আমার নাকে ঘুষি মেরে ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার স্ত্রী ও ছেলেকেও মারধর করা হয়েছে। ৫৯ বছর বয়সি
আসাদুল্লাহ জানান, ঘটনার পর তিনি ও তার স্ত্রী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তাদের কাছে রক্তমাখা পাঞ্জাবিসহ কাপড়চোপড়ও রয়েছে বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।
রোগীর শ্যালক সিয়াম হোসেনের অভিযোগ, প্রথমে তার দুলাভাই ইয়াকুবকে মারধর করা হয়। তাকে রক্ষা করতে গেলে তার বাবা আসাদুল্লাহর নাকে ঘুষি মারা হয়। পরে বাবাকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে তাকেও মারধর করা হয়। এরপর মা মমতাজ বেগম এগিয়ে গেলে তার মাথায় স্টিলের পাইপ দিয়ে আঘাত করা হয়। সিয়ামের দাবি, মোট পাঁচজন এ হামলায় জড়িত ছিলেন।
পরিবারের দাবি, ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের ১১ অক্টোবর রোববার সকাল ৯টায় প্রশাসনিক ভবনে ডেকে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে না পেয়ে তারা শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে হাসপাতালের স্টাফ নার্স তুহিন, জাকির হোসেন, তিতাস হোসেন, মো. সালাম ও অফিস সহকারী জাকির হোসেনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্তরা আসাদুল্লাহ, তার স্ত্রী, ছেলে সিয়াম ও মেয়ের জামাই ইয়াকুবকে মারধর করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করেন। আসাদুল্লাহর স্ত্রীর মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত জখম এবং তার নাক ফাটিয়ে দেওয়া হয়। পরে তাদের প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন আসাদুল্লাহ।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন (ক্যাজুয়ালটি) ডা. মোস্তাক আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, জরুরি বিভাগে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নিয়ে হাসপাতাল প্রশাসন তাদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল। তবে তারা আগে দেখা করতে আসেননি। হাসপাতাল প্রশাসন এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের বিষয়ে সর্বদা সচেষ্ট।
তিনি আরও বলেন, আমরা ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে দোষী ব্যক্তিদের যথাযথ শাস্তি হওয়ার পক্ষে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত না হয়।
এদিকে, ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে শাহবাগ থানার এসআই মনিরুল ইসলাম এ প্রতিবেদকের খারাপ ব্যবহার করেন অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে খালি আপনারা সাংবাদিকরা ফোন দেন। আপনাদের কাছে কি আমি জবাব দিব? আমরা রিপোর্ট দিব থানায়। সকাল থেকে আরও সাংবাদিক ফোন দিছে। আপনাদের কাছে বলতে বাধ্য নয়। ফালতু সাংবাদিক। এ কথা বলেই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে এর আগে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ এবং হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং দুই দিনের মধ্যে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন বলে জানিয়েছে পরিবার।
এখন হাসপাতাল প্রশাসনের দেওয়া আশ্বাস অনুযায়ী তদন্ত কতটা নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয় এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেই নজর ভুক্তভোগী পরিবারের।

-6ace57562db82.jpeg)
