ঢাকার ফুটপাতে বয়স্ককে মারধর-কান ধরে ওঠবস, প্রকৃত ঘটনা কী?
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৮ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর ধানমন্ডিতে এক তরুণীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে এক ব্যক্তিকে ফুটপাতে মারধর ও কান ধরে ওঠবস করানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ঘটনাস্থলে দুই পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকলেও তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শহীদ আবদুল্লাহ আল মাসুদ রানা (৪৮) নামে ওই ব্যক্তিকে আটক করে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। তবে পুলিশের উপস্থিতিতে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে ওই ব্যক্তিকে মারধরের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
সোমবার দুপুরে ধানমন্ডির সাতমসজিদ সড়কে বাংলাদেশ আই হসপিটালের বিপরীত পাশের ফুটপাতে এ ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ২ মিনিট ১২ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, এক যুবক ক্ষুব্ধ হয়ে গালিগালাজ করতে করতে ওই ব্যক্তিকে চড়-থাপ্পড় ও লাথি মারছেন। একপর্যায়ে তাঁকে কান ধরে ওঠবসও করানো হয়।
এ সময় আশপাশে থাকা কয়েকজন পথচারীকে ‘মেয়ের গায়ে হাত দিয়েছে’ ও ‘ক্যানটিনে ঘটনাটি ঘটেছে’ বলে মন্তব্য করতে শোনা যায়। তাদের কেউ কেউ মোবাইল ফোনে পুরো দৃশ্য ধারণ করছিলেন। একপর্যায়ে বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ালে মারধরকারী যুবক ও এক পথচারী ওই ব্যক্তির মোবাইল ফোন নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এরপর তাকে আবারও চড় মারা হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, এসব ঘটনা যখন ঘটছিল, তখন মাত্র কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন দুই পুলিশ সদস্য। তবে তারা মারধর থামাতে বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন— এমন দৃশ্য ভিডিওতে দেখা যায়নি। পুলিশের উপস্থিতিতেই এভাবে একজনকে মারধরের ঘটনায় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ও মন্তব্য করেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও।
একটি পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘আহা-বাংলাদেশ! আহা স্বাধীনতা! আহা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আইনের শাসন! পুলিশের সামনেই দিনেদুপুরে প্রকাশ্যে একজন বাবার বয়সী লোকের উপর মব সৃষ্টি করছে, অথচ পুলিশ দর্শকের মতো ভূমিকা নিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু দেখছে?’
অন্য একটি পোস্টের ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছে, ‘উক্ত ব্যক্তির ভাগনির সঙ্গে খারাপ আচরণ করা সত্ত্বেও পুলিশ কোনো আইনি সাহায্য না করায়, ভুক্তভোগী পরিবার শেষ পর্যন্ত এমন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার কারণে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই সংস্কৃতি আমাদের সমাজকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে?’
সম্রাট শাহাদত নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে প্রকাশিত ভিডিওটি ৪৬ লাখ বার দেখা হয়েছে। এতে প্রতিক্রিয়া পড়েছে ৬৪ হাজার এবং ভিডিওটি শেয়ার হয়েছে ১১ হাজার বার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী তরুণী মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে বলেন, লোকটি তাকে ‘ব্যাড টাচ’ (খারাপ স্পর্শ) করেছে। ঘটনাটির পর ওই ব্যক্তিকে ধরে কর্তব্যরত দুই পুলিশ সদস্যের কাছে নিয়ে গেলে তারা লোকটিকে নিতে অনাগ্রহ দেখিয়ে তাকেই ধানমন্ডি নিয়ে মামলা করতে বলেন। লোকটির কাছে এমন আচরণের কারণ জানতে চাইলে তিনি ঘটনার দায় স্বীকার করে ‘সরি’ বলেছিলেন। পরে মামাকে ফোন করলে তিনি এসে ক্ষুব্ধ হয়ে লোকটিকে মারধর করেন। এরপর পুলিশ এসে লোকটিকে ধানমন্ডি থানায় নিয়ে যায়।
ধানমন্ডি থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মামুন ভূঁইয়া বলেন, ঘটনাস্থল থেকে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ নম্বরে ফোন দিলে তিনি ঘটনাস্থলে যান। এরপর শহীদ আবদুল্লাহকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়।
ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব জানান, তরুণীর শরীর স্পর্শ করার ঘটনায় ডিএমপির রমনা জোনের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইমরান আহমেদ অভিযুক্ত শহীদ আবদুল্লাহকে এক মাসের সাজা দিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়েছেন। শহীদ আবদুল্লাহ তরুণীকে শ্লীলতাহানির কথা স্বীকার করায় তাকে এই সাজা দেওয়া হয়েছে বলে ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান আহমেদ জানিয়েছেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত দুই পুলিশ সদস্য নীরব দর্শকের ভূমিকা কেন পালন করলেন—এ প্রশ্নের জবাবে ওসি ইমাদুল বলেন, উত্তেজিত জনতার মারমুখী আচরণের কারণে পুলিশ শহীদ আবদুল্লাহকে রক্ষা করতে এগিয়ে যেতে সাহস পায়নি। ঘটনাস্থলে তাদের ডিউটি ছিল। তবে শহীদ আবদুল্লাহকে মারধর করে যুবকটি আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ করেছেন। তাকে খুঁজছে পুলিশ। আর ঘটনাস্থলে থাকা দুই পুলিশ সদস্যের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেবেন।
পুলিশ কর্মকর্তা ইমদাদুল বলেন, শহীদ আবদুল্লাহ মোহাম্মদপুর এলাকায় থাকেন। পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি মানসিক রোগী। তিনি এমবিবিএস পড়ার সময় মানসিক রোগে আক্রান্ত হন। তার বিয়ে হয়েছিল। তবে অনেক আগেই স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছেন।
