মাছ কেনার সামর্থ্য নেই, কাঁটাই ভরসা নিম্নবিত্তের
Advertisement
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘যা ইনকাম করি, তা দিয়ে মাছ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নেই। পোলাপান মাছ খাইতে চায়। বলে, সবাই ভালো-মন্দ খায়, আমরা খাইতে পারি না। আমরাও মাছ খাইতে চাই। তখন ওদের বলি, বেতন পাইয়া নিই, খাওয়াবো। কিন্তু বেতন পাইলেও পরিবারের খরচ সামাল দিতে গিয়ে বড় মাছ কেনার মতো সামর্থ্য আর থাকে না। তাই মাছের পেটি আর কাঁটা কিনে নিয়ে যাই। অন্তত ওদের মাছ খাওয়ার আবদারটা রাখতে পারি।’
কথাগুলো বলতে গিয়ে কণ্ঠে ভারি হয়ে আসছিল কারওয়ান বাজারে মাছ কিনতে আসা নিরাপত্তাকর্মী আলী হোসেনের। পাঁচজনের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। মাস শেষে যে বেতন পান, তা দিয়ে সংসারের খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হয়। সন্তানদের মাছ খাওয়ার আবদার পূরণ করতে গিয়ে মাছের পেটি আর কাঁটা কিনেন। আস্ত মাছ কেনার সামর্থ্য না থাকায় মাছের কাঁটাই যেন তাদের ভরসা।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মাছ বাজার ঘুরে দেখা গেল, অনেকেই তাদের পছন্দের বড় মাছ কিনছেন, আবার সেই মাছ বাজারেই কাটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক বড় বড় হোটেলের জন্য শুধুমাত্র মাছের মাংস কিনছেন। আর সেই মাছের মাথা, লেজ, পেটি ও অন্যান্য কাটা অংশ আলাদা করে বিক্রি শুরু হলেই এগিয়ে আসছেন অল্প আয়ের কিছু মানুষ। কারও হাতে ৪০ টাকা, কারও ৫০ টাকা। এই সামান্য টাকাতেই পরিবারের জন্য মাছের কাঁটা কিনছেন তারা।

যে মাছের কাঁটা অনেকের কাছে ফেলে দেওয়ার মতো অংশ, অভাবী মানুষের কাছে সেটিই একবেলার খাবারে মাছের স্বাদ। বাজারের একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা এই দুই চিত্র যেন বলে দেয়, মাছ খাওয়ার ইচ্ছা সবার থাকলেও তা পূরণের সামর্থ্য সবার নেই।
কারওয়ান বাজারে মাছ কাটার জায়গায় দীর্ঘক্ষণ ঘোরাঘুরি করছিলেন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা আছিয়া। বড় মাছগুলো কাটা হচ্ছিল, আর সেদিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর ৪০ টাকা দিয়ে কিনলেন একটি মাছের কাঁটা।

আছিয়া কেন কাঁটা কিনছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কী করব, টাকা নাই। মাছ কেনার সামর্থ্য নেই। আমাদেরও তো খাইতে মন চায়। মাছ কিনতে না পারি, এগুলো খেয়ে তো বাঁচতে পারি। আমার স্বামী নেই। একটাই মেয়ে। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। জামাই ভালো না, কাজকর্ম করে না। আমাকেই সংসার টানতে হয়।’
একসময় পোশাক কারখানায় কাজ করতেন আছিয়া। সামান্য আয় হলেও তখন টুকটাক মাছ-মাংস কিনে খেতে পারতেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে এখন আর কাজ করতে পারেন না। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছেন এই ষাটোর্ধ্ব মানুষটি।

আছিয়া বলেন, ‘আগে গার্মেন্টসে কাজ করতাম। ইনকাম ছিল, টুকটাক মাছ-মাংস কিনে খাইতাম। এখন অসুস্থ, চাকরি করতে পারি না। বুড়া মানুষরে কেউ বাসাবাড়িতেও কাজে রাখতে চায় না। আজ সকালে একজন ১০০ টাকা দিল। সেই টাকা নিয়াই বাজার করতে আসছি।’
একই বাজারে মাছের কাটা কিনছিলেন ৭৬ বছর বয়সি আকবর হোসেন। জীবনের এই প্রান্তে এসেও পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে। আয় সীমিত হওয়ায় পরিবারের জন্য আস্ত মাছ কেনার সামর্থ্য নেই। কম দামে পাওয়া মাছের কাঁটাই তার ভরসা। সংসারের বোঝা আর অভাবের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন এই বৃদ্ধ। তিনি বলেন, বয়স হয়েছে, কিন্তু পরিবারের প্রয়োজন তো থেমে নেই। তাই শরীরের সামর্থ্য কমলেও জীবিকার চিন্তা থেকে মুক্তি নেই তার।
আলী হোসেন, আছিয়া কিংবা আকবর তাদের তিনজনের জীবন আলাদা হলেও অভাবের হিসাব প্রায় একই। সন্তানকে মাছ খাওয়াতে চাওয়া বাবাকে অপেক্ষা করতে হয় বেতনের দিনের। একসময় নিজের উপার্জনে সংসার চালানো নারীকে এখন অন্যের কাছে হাত পাততে হয়। আর বৃদ্ধ বয়সেও পরিবারের দায়িত্ব টেনে চলা মানুষকে হিসাব কষতে হয় দুবেলা খাবারের।
মাছ কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু নিম্ন আয়ের মানুষ নন, অনেক মধ্যবিত্ত ক্রেতাও মাছের কাঁটা ও পেটি কিনতে আসেন এই বাজারে। ক্রেতার সামর্থ্য অনুযায়ী ২০, ৪০ বা ৫০ টাকার মাছের কাঁটা বিক্রি হয়। কারও প্রয়োজন মাছের মাথা, কারও পেটি, আবার কেউ অল্প কয়েকটি কাঁটা কিনেই বাড়ি ফেরেন। তাদের অনেকের কাছে এটি পছন্দের বিষয় না হলেও সীমিত আয়ের মধ্যে খাবারের চাহিদা মেটানোর উপায়।
কারওয়ান বাজারের এই দৃশ্য শুধু মাছ কেনাবেচার গল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের আয়, ব্যয় আর ন্যূনতম চাহিদা পূরণের লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। বাজারে মাছ আছে, ক্রেতাও আছে। কিন্তু সবার ঝুড়িতে সেই সামর্থ্য নেই। কারও হাতে ব্যাগ ভর্তি মাছ, কারও হাতে ২০ বা ৪০ টাকার কাঁটা। অল্প আয়ের এই মানুষগুলো হয়ত বড় মাছ খাওয়ার স্বাদ কেমন জানে না। কিন্তু তারা পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে খাওয়ার আনন্দ জানে। জানে কীভাবে একে অপরের সঙ্গে খাবার ভাগাভাগি করে খাওয়া যায়।
