Logo
Logo
×

Advertisement

সারাদেশ

মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব

দুই যুগ ধরে দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে অর্ধশত বিশালাকৃতির গুইসাপ

Advertisement

Icon

জাহিদ রিপন, ফরিদপুর

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম

দুই যুগ ধরে দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে অর্ধশত বিশালাকৃতির গুইসাপ

দুই যুগ ধরে দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে অর্ধশত বিশালাকৃতির গুইসাপ

Advertisement

হঠাৎ করে দেখলে অনেকেরই মনে হতে পারে কুমির। দলবেঁধে জলাশয়ের পাড়ে আসে খাবারের সন্ধানে। আসলে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীগুলো কুমির নয়, বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর নাম ‘গুইসাপ’।

ফরিদপুরের সদরপুরে বাজারসংলগ্ন একটি জলাশয়ের তীরজুড়ে অবাধে বিচরণ করছে বিশালাকৃতির অর্ধশত গুইসাপ। প্রায় ৪০ কেজির মতো ওজনের গুইসাপগুলো দলবদ্ধ হয়ে ময়লার ভাগাড়, ঝোপঝাড়, বাজার এবং বাড়ির উঠানে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়।

মানুষের সঙ্গে এ প্রাণীগুলোর বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এরা মানুষ ও পরিবারের কোনো ক্ষতি করে না। কারো ক্ষতি করে না বলে স্থানীয়দের কাছে এ প্রাণীগুলো যেন পোষা হয়ে উঠেছে। 

কথিত রয়েছে- এ প্রাণী যেখানে থাকে সেখানে ক্ষতিকারক সাপ, ইঁদুর থাকতে পারে না। বিশেষ করে বাজার ও বাসা-বাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া পচা মাছ, মরা মুরগি, জবাই করা গরু-ছাগলের নাড়িভুঁড়িসহ ময়লা আবর্জনা খেয়েই এরা বেঁচে থাকে। পাশাপাশি বাজার-ঘাট বাড়ির আঙিনা ময়লা দুর্গন্ধ থেকে রেহাই দিচ্ছে। এদের খাবারের তেমন সমস্যা নেই। তাই প্রাণীগুলো বছরের পর বছর খেয়ে-দেয়ে বিশাল আকার ধারণ করে বেঁচে রয়েছে। তাই গুইসাপগুলো স্থানীয়দের কাছে ও বাজারের মানুষের কাছে পোষা প্রাণীতে পরিণত হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা সদর বাজারসংলগ্ন খালের তীরজুড়ে প্রায় দুই যুগ ধরে দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিশালাকৃতির গুইসাপগুলো। প্রথমে দুই-চারটি গুইসাপ দেখা গেলেও বংশবিস্তারের মাধ্যমে এখন এগুলোর সংখ্যা প্রায় অর্ধশত। তবে কারো কোনো ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠেনি প্রাণীগুলো। বাজার ও বাসাবাড়ির উঠানে এদের প্রকাশ্যে বিচরণ দেখা গেলেও ময়লা-আবর্জনা, পচা-গলা খাবার ছাড়া গেরস্তের হাঁস-মুরগি বা কোনো কিছুর ক্ষতি করে না। তাই স্থানীয়রা দেখলে তাদের খাবার দেয়।

প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গুইসাপ শান্ত স্বভাবের প্রাণী। এরা সাধারণত মাটির গর্ত, গাছের কোটর, পুরোনো দেওয়ালের ফাটল কিংবা পরিত্যক্ত ইটভাটায় বাস করে। প্রাণীটি দিবাচর, তাই দিনে শিকার করে এবং রাতে বিশ্রাম নেয়। সাধারণত বিষধর সাপ ও সাপের ডিম, মৃত মাছ, ব্যাঙ, কাঁকড়া, শামুক এবং পচা প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। প্রাণীগুলো পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশে সাধারণত তিন ধরনের গুইসাপের দেখা মেলে। এর মধ্যে রামগদি বা কালো গুইসাপ আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম গুইসাপ। এটি দৈর্ঘ্যে ৮ থেকে ৯ ফুট এবং ওজন ৪০ কেজির মতো হতে পারে। এদের আলাদা করা কিছুটা কঠিন, তাই সব প্রজাতিই মানুষের কাছে গুইসাপ নামে পরিচিত।

এই প্রাণীটি এলাকাভেদে তারবেল, গুইল, ঘইড়াল ইত্যাদি নামেও পরিচিত। গুইসাপ অত্যন্ত উপকারী প্রাণী। গুইসাপ প্রাণীটি কমে যাওয়ার কারণে পরিবেশে ফসলের জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড়, ইঁদুরের উৎপাত বাড়ার পাশাপাশি বিষাক্ত সাপের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া পচা-গলা প্রাণীদেহ খেয়ে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়া থেকেও রক্ষা করে।

বাজারের পরিচ্ছন্নকর্মী চন্দন জানান, বাজারের ময়লা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করি। গুইসাপগুলো ময়লা আবর্জনা খেয়ে আমার অনেকটা পরিশ্রম কমিয়ে দেয়। এতে মরা মুরগির দুর্গন্ধ ছড়ানো থেকে বাজারের ব্যবসায়ীরা রক্ষা পান।

বাজারের ব্যবসায়ী সুজন শেখ জানান, গুইসাপগুলো কোথা থেকে কিভাবে এসেছে জানা নেই। তারা মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। বরং বাজারে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এ কারণে কেউ তাদের তাড়িয়ে দেয় না, বরং নিরাপদে বসবাস করতে সহায়তা করছে। অচেনা কোনো মানুষ দেখলে প্রথমে কুমির ভেবে ভয় পাবে। প্রথমে আমরাও ভয় পেলেও এখন আর দেখে কেউ ভয় পায় না। সবাই উপকারী বন্ধু মনে করে। অনেকেই তাদের খেতে দেয়। তারা তাদের মতো করে সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়। প্রাণীগুলো এখন আর মানুষকে ভয় পায় না।

বাজারের আরেক ব্যবসায়ী জিন্নাত খান বলেন, দেখে মনে হয় একেকটির ওজন প্রকারভেদে এক থেকে দেড় মণের মতো। বাজারে, ঝোপঝাড়ে ও প্রকাশ্যে বিচরণ তাদের। শুধু বাজার নয়, মাঝে মাঝে গুইসাপগুলো আশপাশের বাড়ির উঠানেও চলে আসে। তবে এগুলো সম্পূর্ণ নিরীহ প্রাণী। এখন পর্যন্ত কাউকে কামড়ানো বা কারো ক্ষতি করেতে শুনিনি। যার কারণে কারো মধ্যে তেমন ভয়ের সৃষ্টি করে না। বরং এলাকাবাসী তাদের উপস্থিতিকে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. লাবলু বলেন, প্রায় দুই যুগ আগে এখানে দুই থেকে তিনটি গুইসাপ দেখা যায়। এখন এর সংখ্যা প্রায় ৫০টির মতো হবে। দেখতে বিশালাকৃতির কুমির মনে হতে পারে। ময়লা-আবর্জনা অর্থাৎ মানুষের ফেলে দেওয়া পচা-গলা খাবার খায়। তাদের সামনে দিয়ে হাঁস-মুরগি ঘুরে বেড়ালেও খায় না। যার কারণে মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠছে। প্রাণীগুলো অনেকটাই বিলুপ্তপ্রায়। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের দাবি প্রাণীগুলোর অবাধ বিচরণ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে তাদের টিকিয়ে রাখা। না হলে এক সময় প্রাণীগুলো হারিয়ে যাবে।

ফরিদপুর পরিবেশ উন্নয়ন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান বলেন, গুইসাপ প্রাণীটি মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। বরং এরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। এখন অনেকটাই বিলুপ্ত। এই গুইসাপগুলোকে রক্ষা করে এবং তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

এ ব্যাপারে সদরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সব্যসাচী মজুমদার বলেন, সংখ্যায় ৫০টির মতো হবে। ৮ থেকে ১০টি মিলে দলবদ্ধভাবে বিচরণ করতে দেখা যায়। এখানে তাদের পর্যাপ্ত খাবার থাকায় তারা এখান থেকে অন্য কোথাও যায় না। আবার মানুষজন খাবার দেওয়ায় তাদের সঙ্গে এক ধরনের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। এদের সাপের মতো বিষ নেই। তবে এদের শরীরে ব্যাকটেরিয়া থাকায় যদি কাউকে কামড় বা লেজ দিয়ে আঘাত করে সেই স্থানে ইনফেকশন হতে পারে।

তিনি বলেন, ধানখেতের ইঁদুর ও ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের উপকার করে বলে গুইসাপকে কৃষকের বন্ধুও বলা হয়। এরা সাঁতারেও অত্যন্ত দক্ষ। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জলাভূমির আশপাশে এদের আবাসস্থল দেখা যায়। তবে এগুলোর কোনো সমস্যা হলে আমরা চিকিৎসা দিতে পারি, কিন্তু সংরক্ষণের দায়িত্ব বন বিভাগের।

ফরিদপুরে সহকারী বন সংরক্ষক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তাওহীদ হোসেন বলেন, বিষয়টি জানতে পেরেছি। আমরা আজই সরেজমিন গিয়ে দেখব। তারপর প্রাণীগুলোকে কিভাবে সংরক্ষণ করা যায় সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আকারে প্রস্তাবনা পাঠানো হবে।

সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শরিফ শাওন বলেন, প্রাণীগুলো যাতে তাদের মতো করে বেঁচে থাকতে পারে, কেউ যাতে তাদের ক্ষতি না করতে পারে সে বিষয়ে খেয়াল রাখা হবে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ফরিদপুরে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৫, আহত ১১

ফরিদপুরে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৫, আহত ১১

ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে বাস-অ্যাম্বুলেন্স সংঘর্ষ, নিহত ৩

ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে বাস-অ্যাম্বুলেন্স সংঘর্ষ, নিহত ৩

ট্রেনের ধাক্কায় স্বপ্ন থেমে গেল ফরহাদের

ট্রেনের ধাক্কায় স্বপ্ন থেমে গেল ফরহাদের

ভাঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জন নিয়ে সংঘর্ষ, আহত ১০

ভাঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জন নিয়ে সংঘর্ষ, আহত ১০

হানিট্র্যাপে ফেলে ব্যবসায়ীকে মারধর, আটকে রাখার অভিযোগ

হানিট্র্যাপে ফেলে ব্যবসায়ীকে মারধর, আটকে রাখার অভিযোগ

দুই ‘জিনের বাদশা’ গ্রেফতার

দুই ‘জিনের বাদশা’ গ্রেফতার

আরও পড়ুন

বাস-মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ, যুবকের মৃত্যু

বাস-মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ, যুবকের মৃত্যু

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি টুটুল গ্রেফতার

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি টুটুল গ্রেফতার

কসবায় ৯ রাউন্ড চাইনিজ গুলিসহ যুবক আটক

কসবায় ৯ রাউন্ড চাইনিজ গুলিসহ যুবক আটক

কলাগাছের সুতায় কলাবতী শাড়ি

কলাগাছের সুতায় কলাবতী শাড়ি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম