ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বাড়ছে, আতঙ্কে যাত্রীরা
Advertisement
মো. ফজলে রাব্বি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৯:২২ পিএম
ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বাড়ছে, আতঙ্কে যাত্রীরা
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গত ২৩ জুন গভীর রাতে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী তূর্ণা এক্সপ্রেস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহর রেলওয়ে স্টেশন অতিক্রম করছে। হঠাৎ বাইরে থেকে ছোড়া একটি পাথর জানালার কাচ ভেদ করে ডান চোখে আঘাত লাগে ট্রেনযাত্রী ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর শহরের কান্দিপাড়া এলাকার বাসিন্দা আয়কর আইনজীবী শ্যামল চন্দ্র দাসের।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে কয়েক ঘণ্টার অস্ত্রোপচারের পরও তার ডান চোখটি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
এর ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনের আউটার পৈরতলা এলাকায় চলন্ত মহানগর এক্সপ্রেসে বাইরে থেকে ছোড়া পাথরের আঘাতে আহত হন নাইমুল হাসান। মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তার মাথায় পাঁচটি সেলাই দেন। এর কয়েক দিনের ব্যবধানে শহরের কলেজপাড়া এলাকায় পারাবত এক্সপ্রেসে ভ্রমণের সময় একইভাবে আহত হন আরেক যাত্রী মোহাম্মদ আজাদ।
কয়েক দিনের ব্যবধানে একই জেলায় এমন একাধিক ঘটনায় ট্রেনযাত্রীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একের পর এক ঘটনায় নিরাপদ রেলযাত্রা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে যাত্রীদের মধ্যে। জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের পুরো বছর এবং ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে পূর্বাঞ্চলীয় রেলপথে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ২২৪টি ঘটনা ঘটেছে। রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ঘটনার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশ বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথগুলোর একটি। তবে টঙ্গী, নরসিংদী, ভৈরব, আশুগঞ্জ, আখাউড়া, কসবা ও কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকাতেও একই ধরনের ঘটনার অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা-সিলেট রুটের আশুগঞ্জ-বিজয়নগর এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের আশুগঞ্জ-কসবা অংশ মিলিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রায় ৭২ কিলোমিটার রেলপথ এখন পূর্বাঞ্চলীয় রেল নেটওয়ার্কের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত।
আতঙ্ক শুধু যাত্রীদের নয়, ট্রেনচালক, গার্ড ও রেলওয়ে কর্মীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। গত বছরের আগস্টে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কলেজপাড়া এলাকায় মহানগর গোধূলি এক্সপ্রেসে পাথর নিক্ষেপে আহত হন লোকোমাস্টার আব্দুল্লাহ আল বাকি। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ধারাবাহিক হামলা এবং একজন আইনজীবীর চোখ হারানোর ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
লোকোমাস্টার আবুল কালাম আজাদ বলেন, সূর্য ডুবে যাওয়ার পর ভয়টা আরও বেশি কাজ করে। অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু এলাকা অতিক্রম করার সময় দরজা-জানালা বন্ধ রেখেই ট্রেন চালাতে হয়।
তাজবীর আহমেদ নামে আখাউড়ার এক যাত্রী বলেন, গত ১৫ জুন আমি ঢাকা থেকে মহানগর এক্সপ্রেসে করে আখাউড়া আসছিলাম, ট্রেনটি ভৈরব স্টেশনে ঢুকার আগে হঠাৎ বাইরে থেকে ছোড়া কাঁঠালের একটি অংশ দিয়ে ডিল মারে। এতে আমার ডান চোখে মারাত্মক আঘাত পাই। রেলপথের অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে; কিন্তু চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের প্রবণতা কমেনি; বরং সাম্প্রতিক সময়ে এটি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে কিন্তু অধিকাংশ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
তাদের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
আখাউড়া রেলওয়ে থানার ওসি মো. আব্দুল কুদ্দুস বলেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ শুধু মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্য হুমকি নয়, এতে সরকারি সম্পত্তিরও ক্ষতি হয়। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে তিনটি মামলা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
