Logo
Logo
×

Advertisement

সারাদেশ

মাছ চাষেই বদলে গেছে ৭০০ পরিবারের ভাগ্য

Advertisement

Icon

হাবিবুর রহমান হাবীব, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম)

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৫ পিএম

মাছ চাষেই বদলে গেছে ৭০০ পরিবারের ভাগ্য

Advertisement

এক সময় ছিল ডোবা, বিল আর ধানের জমি। দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী। এখন সেই জনপদেই চোখে পড়ছে পুকুরের সারি। বাড়ির চারপাশে পুকুর, পুকুরে মাছ আর মাছকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে মানুষের জীবিকা। মাছ চাষ বদলে দিয়েছে পুরো গ্রামের অর্থনীতি।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার হরিশ্বর তালুক গ্রামের এমন চিত্র এখন স্থানীয়দের কাছে যেন সাফল্যের এক অনন্য গল্প। প্রায় ৭শ পরিবার সরাসরি মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত। মাছ চাষ ও সংশ্লিষ্ট নানা কাজে জড়িয়ে আছে প্রায় দেড় হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে হরিশ্বর তালুক গ্রাম। কয়েক বছর আগেও গ্রামটির বড় একটি অংশজুড়ে ছিল ডোবা, বিল ও ধানি জমি। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। পাকা সড়ক ধরে গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়ে একের পর এক পুকুর। কোনোটি ছোট, কোনোটি আবার বিশাল-দেখলে মনে হয় যেন বিলের মতো।

সরেজমিনে দেখা যায়, পুকুরগুলো ঘিরে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন গ্রামের নারী-পুরুষ। কেউ নৌকায় করে মাছের খাবার দিচ্ছেন, কেউ জাল টানছেন, আবার কেউ মাছ নিয়ে ছুটছেন স্থানীয় আড়তের দিকে। মাছ চাষের পাশাপাশি পাহারাদার, জেলে, ভ্যানচালক, শ্রমিক, মাছের খাবার ও ওষুধ বিক্রির সঙ্গে যুক্ত মানুষও এখান থেকে আয় করছেন।

ধানের জমিতেই শুরু মাছ চাষ

স্থানীয়রা জানান, প্রায় আড়াই দশক আগে গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের যাত্রা শুরু হয়। ২০০০ সালে ইলিয়াস আলী নামের এক ব্যক্তি প্রথম ধানের জমিতে মাছ চাষ শুরু করেন। তার সাফল্য দেখে অন্যরাও উৎসাহিত হন। একে একে ধানি জমিতে তৈরি হতে থাকে পুকুর। বাড়তে থাকে চাষির সংখ্যা।

মাছ চাষে সফল হতে স্থানীয় চাষিরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ফিড কোম্পানির কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আধুনিক পদ্ধতি আয়ত্ত করছেন। তেলাপিয়া, রুই, কাতলা, মৃগেলসহ বিভিন্ন কার্পজাতীয় মাছের পাশাপাশি পাঙ্গাশ, পাবদা, গুলশা ও ট্যাংরাও চাষ করা হচ্ছে।

গ্রামের প্রায় ৭০ শতাংশ মাছের পুকুর একসময় ধানি জমি ছিল। বছরে একবার বোরো ধান চাষের পর বাকি সময় এসব জমিতে চলে মাছের চাষ।

কোটি টাকার মাছের কারবার

চাষিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রামে প্রায় ৩শ পুকুর রয়েছে। এর মধ্যে ১শটি বড়, ৭০টি মাঝারি এবং ১৩০টি ছোট পুকুর। এসব পুকুরে বছরে বিপুল পরিমাণ মাছ উৎপাদন হচ্ছে।

চাষিদের দাবি, বছরে উৎপাদিত মাছের বাজারমূল্য প্রায় ৪০ কোটি টাকা।

তবে উপজেলা মৎস্য অফিসের হিসাবে, হরিশ্বর তালুক গ্রামে ডোবা ও অন্যান্য জলাশয় বাদ দিয়ে পুকুর রয়েছে ২১১টি। এসব পুকুরে বছরে প্রায় ৭০৩ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়।

২৯ একরজুড়ে জাহাঙ্গীরের মাছের রাজ্য

গ্রামের তরুণ মাছচাষি জাহাঙ্গীর আলমের রয়েছে ২৯ একর জমিতে পাঁচটি বড় পুকুর। এর মধ্যে তিন একর নিজের জমি, আর বাকি জমি লিজ নেওয়া। তার দাবি, মাছ চাষে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। তেলাপিয়া, রুই, কাতলা ও মৃগেলের পাশাপাশি পাঙ্গাশ, পাবদা ও গুলশা-ট্যাংরাও চাষ করেন তিনি। বছরে প্রায় এক হাজার মণ মাছ উৎপাদন করেন বলে জানান জাহাঙ্গীর। সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে প্রায় ছয় লাখ টাকা লাভ হয় তার।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আগে এই জমিতে ধান চাষ করতাম। মাছ চাষ শুরু করার পর আয় বেড়েছে। এখন কয়েকটি পুকুরে নিয়মিত মাছ চাষ করছি।

কোটি টাকা বিনিয়োগ শাহ আলমের

সফল মাছচাষিদের তালিকায় রয়েছেন মো. শাহ আলম। তার রয়েছে ২৩ একর জমিতে তিনটি বড় পুকুর। মাছ চাষে কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছেন তিনি। বছরে প্রায় ১৫ লাখ টাকা আয় করেন বলে জানান।

আরেক চাষি আবুল কালাম আজাদ জানান, বছরে তার এক কোটি টাকার বেশি মাছ বিক্রি হয়। তার মতে, মাছ চাষ শুধু চাষিদেরই লাভবান করছে না; এর সঙ্গে যুক্ত পাহারাদার, জেলে, ভ্যানচালক ও শ্রমিকসহ অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে।

‘মৎস্য বিভাগের সহযোগিতা কম’

মাছচাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় মৎস্য বিভাগের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পেলেও বিভিন্ন ফিড কোম্পানির প্রতিনিধিরা নিয়মিত তাদের প্রশিক্ষণ দেন। এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মাছের খাবার, রোগ প্রতিরোধ ও আধুনিক চাষপদ্ধতি সম্পর্কে তারা নতুন নতুন কৌশল শিখছেন।

আরেক চাষি আব্দুল জব্বার বলেন, বাজারজাত খাবারের পাশাপাশি নালিগুড়, চিটাগুড়, খৈল ও ময়দাসহ বিভিন্ন উপকরণ মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পানির গুণগত মান ঠিক রাখতে চুন, লবণ, ওষুধ ও সারও ব্যবহার করেন তারা।

তবে মাছের খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় লাভ কমছে বলে জানান কয়েকজন চাষি। বাঙালপাড়ার শাহীন পাটোয়ারি বলেন, গত ছয় মাসে প্রতি কেজি মাছের খাবারের দাম প্রায় এক টাকা বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে এবং লাভ কমেছে।

সুনাম ছড়িয়েছে পুরো জেলায়

রাজারহাট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এমদাদুল হক বলেন, রাজারহাট উপজেলায় পাঁচ হাজারের বেশি পুকুর রয়েছে। আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে হরিশ্বর তালুকের চাষিরা সফল হয়েছেন। তাদের সুনাম এখন পুরো কুড়িগ্রাম জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ গ্রামের চাষিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

একসময় যে গ্রামের মানুষের জীবনে দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী, সেই হরিশ্বর তালুক এখন মাছকে ঘিরে স্বাবলম্বিতার নতুন গল্প লিখছে। পুকুরের পানিতে শুধু মাছই নয়, ভেসে উঠছে শত শত পরিবারের স্বপ্নও।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

হৃদযন্ত্রে ফুটো: শ্বাসকষ্টে ছটফট করছে দুই মাসের শিশু ছাকওয়ান

হৃদযন্ত্রে ফুটো: শ্বাসকষ্টে ছটফট করছে দুই মাসের শিশু ছাকওয়ান

‘সারের ডিলারশিপ না দেন, বিষের ডিলারশিপ দেন’ ছাত্রদল নেতার মন্তব্য ভাইরাল

‘সারের ডিলারশিপ না দেন, বিষের ডিলারশিপ দেন’ ছাত্রদল নেতার মন্তব্য ভাইরাল

৩০ হাজার টাকার ঋণ দিয়ে শুরু, আরিফুল এখন কোটিপতি

৩০ হাজার টাকার ঋণ দিয়ে শুরু, আরিফুল এখন কোটিপতি

এক শিক্ষার্থীর জন্য ১৯ শিক্ষক-কর্মচারী

এক শিক্ষার্থীর জন্য ১৯ শিক্ষক-কর্মচারী

কুড়িগ্রাম-২ আসনে এনসিপির আতিক মোজাহিদ বিজয়ী

কুড়িগ্রাম-২ আসনে এনসিপির আতিক মোজাহিদ বিজয়ী

আরও পড়ুন

দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত ছাত্রদল নেতার মৃত্যু

দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত ছাত্রদল নেতার মৃত্যু

কক্সবাজারে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার

কক্সবাজারে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার

নেত্রকোনায় বিপুল পরিমাণ মাদকসহ নারী আটক

নেত্রকোনায় বিপুল পরিমাণ মাদকসহ নারী আটক

গোপনে ভিডিও ধারণ করে গৃহবধূকে ব্ল্যাকমেইল

গোপনে ভিডিও ধারণ করে গৃহবধূকে ব্ল্যাকমেইল

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম