Logo
Logo
×

Advertisement

সারাদেশ

৩০ হাজার টাকার ঋণ দিয়ে শুরু, আরিফুল এখন কোটিপতি

Advertisement

Icon

হাবিবুর রহমান হাবীব, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম)

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম

৩০ হাজার টাকার ঋণ দিয়ে শুরু, আরিফুল এখন কোটিপতি

আরিফুল এখন কোটিপতি

Advertisement

সকালে খামারে ঢুকতেই একসঙ্গে কয়েকটি গরুর হাম্বা ডাক। যেন খামার মালিককে দেখেই তাদের চেনা অভিবাদন। পাশে সারি সারি লেয়ার মুরগির খাঁচা, একটু দূরে পুকুরে মাছের অবাধ বিচরণ। চারদিকে কর্মমুখর ব্যস্ততা। অথচ কয়েক বছর আগেও এই মানুষটির জীবন আটকে ছিল ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অফিসকক্ষ আর বাঁধাধরা কাজের মধ্যে।

চাকরি তার কাছে ছিল নিরাপদ আশ্রয়, কিন্তু স্বপ্নের ঠিকানা নয়। কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ আর নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডির জীবন টানেনি আরিফুল ইসলামকে। শেষপর্যন্ত চাকরির মায়া কাটিয়ে তিনি ফিরে আসেন নিজের গ্রামে। বাবার পড়ে থাকা জমিতে মাত্র ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু করেন ব্রয়লার মুরগির খামার। সেই ছোট্ট উদ্যোগই আজ তার জীবনের বড় সাফল্যের গল্প।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত গোবধা গ্রামের আরিফুল এখন ‘আফরা ক্যাটল ফার্ম’-এর সফল মালিক। তার খামারে বর্তমানে রয়েছে ১৫টি দুগ্ধবতী গাভি, ২ হাজার লেয়ার মুরগি এবং দুটি পুকুরে পাঙাশ মাছের চাষ। সব মিলিয়ে খামার থেকে তার মাসিক নিট আয় প্রায় ২ লাখ টাকা। আর খামারের বর্তমান স্থায়ী সম্পদের বাজারমূল্য তার হিসাবে প্রায় এক কোটি টাকা।

যেভাবে শুরু নতুন জীবনের অধ্যায়

রংপুরের কারমাইকেল কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় চাকরি নিয়েছিলেন আরিফুল। একই সময়ে বিয়েও করেন। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, তিনি চাকরিতেই থিতু হবেন; কিন্তু উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন তাকে চাকরিতে আটকে রাখতে পারেনি।

চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফেরার পর ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বাবার জমিতে ব্রয়লার মুরগির খামার করেন। তিন দফায় মুরগি বিক্রির লাভ জমিয়ে ২০২০ সালে কেনেন উন্নত জাতের গাভি। সেখান থেকেই ডেইরি খামারের যাত্রা শুরু। পরে লালমনিরহাট সেনা ক্যাম্পের নিলাম থেকে ৩০টি ষাঁড়ের বাছুর কিনে মোটাতাজাকরণ করেন। ২০২২ সালের শুরুতে সেগুলো বিক্রি করে বড় অঙ্কের অর্থ পান, যা তিনি পুনরায় খামার সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করেন।

২০২৪ সালে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকায় উন্নত ফ্রিজিয়ান জাতের গাভি কেনেন। এরপর বাবার দেওয়া ১০০ শতক জমির সঙ্গে আরও ১২০ শতক জমি ইজারা নিয়ে শুরু করেন উন্নত জাতের ঘাস চাষ। একটি-দুটি করে এখন তার খামারে গাভির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫টিতে। প্রতিদিন খামার থেকে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৮০ লিটার দুধ।

গরু, মুরগি ও মাছের সমন্বিত সাফল্য

আরিফুলের সাফল্যের মূল ভিত্তি সমন্বিত খামার পদ্ধতি। শুধু একটি খাতের ওপর নির্ভর না করে তিনি গড়ে তুলেছেন ডেইরি, পোল্ট্রি ও মাছের সমন্বিত খামার।

খামারের দুই পাশে প্রায় ১০০ শতক আয়তনের দুটি ছোট পুকুর রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রায় ৫০ হাজার টাকার পাঙাশ মাছের পোনা ছাড়েন তিনি। বর্তমানে সেই মাছের বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। অন্যদিকে ২ হাজার লেয়ার মুরগি থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি ডিম উৎপাদিত হয়। দানাদার খাবার ও আনুমানিক পরিচালনা খরচ বাদ দিয়ে শুধু ডিম বিক্রি থেকেই মাসে তার আয় থাকে প্রায় দেড় লাখ টাকা। গরুর দুধ, মুরগির ডিম আর পুকুরের মাছ—এই তিন উৎসের মেলবন্ধন আরিফুলকে পুরোপুরি স্বাবলম্বী করেছে।

শুরুতে স্বামীর পেশা বলতে সংকোচ হতো

আরিফুলের স্ত্রী উম্মে সাবিহাতুন জান্নাত (সিনতি) সৈয়দপুর আর্মি ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিষয়ে বিএসসি সম্পন্ন করেছেন। উচ্চশিক্ষিত স্বামী ভালো চাকরি ছেড়ে গ্রামে মুরগির বিষ্ঠা ও গোবর পরিষ্কারের কাজে নামবেন—শুরুতে বিষয়টি তিনি সহজে মেনে নিতে পারেননি। আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের কাছে স্বামীর পেশা বলতে সংকোচ হতো তার।

তবে সময়ের সঙ্গে সেই অনুভূতি বদলে গেছে। আরিফুলের একাগ্রতা, কঠোর শ্রম আর নিষ্ঠা দেখে শেষপর্যন্ত পাশে এসে দাঁড়ান স্ত্রীও। সিনতির ভাষায়, ‘খামারের প্রতি স্বামীর পরম যত্ন ও অক্লান্ত পরিশ্রমই আজ তাকে সফল করেছে।’

আরিফুলের বাবা মো. দলিল উদ্দিন ভূঁইয়া একজন সাবেক স্কুলশিক্ষক। ছেলের চাকরি ছেড়ে খামার করার সিদ্ধান্তে শুরুতে তারও তীব্র আপত্তি ছিল। তবে ছেলের অদম্য ইচ্ছা দেখে পরে ১০০ শতক জমি লিখে দেন তিনি। গর্বিত পিতা বলেন, ‘চাকরি না করে ছেলে আজ সফল উদ্যোক্তা। নিজের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি আরও চারজনের কর্মসংস্থান করেছে। বাবা হিসেবে আমি তার জন্য গর্ববোধ করি।’

চার পরিবারের স্থায়ী আয়ের পথ

আরিফুলের খামারে তৈরি হয়েছে স্থায়ী কর্মসংস্থান। খামারের নিয়মিত কর্মী রাজকুমার রায় আগে দিনমজুরি করতেন। রাজকুমার বলেন, ‘আগে সারা বছর কাজের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। এখন খামারে নিয়মিত কাজ করে মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতন পাচ্ছি। নিজের বাড়িতে তিনবেলা খেয়ে চাকরি করতে পারছি, পরিবার নিয়ে ভালো আছি।’

রাজকুমারের মতো আরও তিনজন কর্মী সেখানে কাজ করছেন, যাদের প্রত্যেকের মাসিক বেতন ১৫ হাজার টাকা।

চাকরি করে এত দূর আসতে পারতাম না

উদ্যোক্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, পড়াশোনা শেষে ব্রয়লার মুরগি দিয়ে শুরু করেছিলাম। পরিবারের আপত্তিতে কিছুদিন চাকরি করলেও মন টেকেনি। গ্রামে ফিরে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকায় একটি ভালো গাভি কিনি। সেই গাভি আর স্ত্রীর সার্বক্ষণিক সহযোগিতাই আজ আমাকে কোটি টাকার সমন্বিত খামারের মালিক করেছে। চাকরি করলে এত অল্প সময়ে এত দূর আসা কখনই সম্ভব হতো না। তবে খামার ব্যবস্থাপনায় মাঠপর্যায়ে সরকারি সহায়তা আরও সহজলভ্য করার দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান, প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে সরাসরি আর্থিক অনুদান দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও খামারিদের প্রয়োজনীয় টিকা, ওষুধ ও কারিগরি পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করা হচ্ছে। আরিফুল ইসলাম উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে যোগাযোগ করলে তাকে প্রয়োজনীয় সব কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিংয়ের বনরুটিতে পোকা

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিংয়ের বনরুটিতে পোকা

ডাক্তার নেই, নদী পেরিয়ে সদরে যেতেই মরে গরু-মহিষ

ডাক্তার নেই, নদী পেরিয়ে সদরে যেতেই মরে গরু-মহিষ

সেতু আছে, সংযোগ সড়ক নেই...

সেতু আছে, সংযোগ সড়ক নেই...

বাংলাদেশি ভেবে নিজ দেশের দুই নাগরিককে গুলি করে ফেলে গেল বিএসএফ

বাংলাদেশি ভেবে নিজ দেশের দুই নাগরিককে গুলি করে ফেলে গেল বিএসএফ

গাছে গাছে ঝুলছে মুগ্ধের সচেতনতার বাণী

গাছে গাছে ঝুলছে মুগ্ধের সচেতনতার বাণী

বিক্ষোভের মুখে জনসম্মুখে মাদ্রাসা অধ্যক্ষের পদত্যাগ

বিক্ষোভের মুখে জনসম্মুখে মাদ্রাসা অধ্যক্ষের পদত্যাগ

আরও পড়ুন

তাজমীন হত্যাকাণ্ড: সুমনের দেওয়া তথ্যে মোবাইল উদ্ধার

তাজমীন হত্যাকাণ্ড: সুমনের দেওয়া তথ্যে মোবাইল উদ্ধার

পদ্মার দুর্গম চরে দিনভর পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, গ্রেফতার ২৫

পদ্মার দুর্গম চরে দিনভর পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, গ্রেফতার ২৫

এমপি নায়াব ইউসুফ ফরিদপুরে সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা সহ্য করা হবে না

ফরিদপুরে সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা সহ্য করা হবে না

রাজশাহীর চরে বন্দুক-এয়ারগানসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার, গ্রেফতার ১

রাজশাহীর চরে বন্দুক-এয়ারগানসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার, গ্রেফতার ১

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম