ডাক্তার নেই, নদী পেরিয়ে সদরে যেতেই মরে গরু-মহিষ
Advertisement
হাবিবুর রহমান হাবীব, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৫ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
উত্তাল তিস্তার বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন গবাদিপশু। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ, ছিনাই ও ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের বিভিন্ন চরে হাজারও পরিবার গরু, মহিষ, ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালন করে সংসার চালায়। তবে দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা এবং চরাঞ্চলে সরকারি পশুচিকিৎসাসেবার অভাবে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছে এসব গবাদিপশু।
চরবাসীর অভিযোগ, চরাঞ্চলে স্থায়ীভাবে কোনো সরকারি পশুচিকিৎসক না থাকায় গবাদিপশু অসুস্থ হলে দ্রুত কোনো সেবা মেলে না। বাধ্য হয়ে নদী পাড়ি দিয়ে যেতে হয় উপজেলা সদরে। তবে বর্ষা মৌসুমে তিস্তার তীব্র স্রোত, নৌকার সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া এবং রাতে যাতায়াতের ঝুঁকিতে অনেক সময় অসুস্থ পশুকে হাসপাতালে নেওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক সময় চিকিৎসা শেষে ফেরার পথে নৌকা না পেয়ে সারারাত নদীর ঘাটে পশুর সঙ্গে কাটাতে হয়। এতে বাড়তি ব্যয়ের পাশাপাশি পথের মধ্যেই অসুস্থ পশুর মৃত্যু ঘটে।
উপজেলা পরিসংখ্যান বিভাগের ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চর বিদ্যানন্দে জনসংখ্যা ২ হাজার ৮২২ এবং চর তৈয়বখাঁয় ৭১২ জন। ছিনাই ইউনিয়নের কালুয়ার চরে প্রায় ২ হাজার এবং ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের চর খিতাবখাঁয় প্রায় ৬শ ও চর গতিয়াশামে প্রায় ৭শ মানুষের বসবাস।
সরকারিভাবে চরাঞ্চলের গবাদিপশুর পৃথক কোনো শুমারি না থাকলেও স্থানীয়দের হিসাবমতে, এসব চরে কয়েক হাজার গবাদিপশু রয়েছে। এর মধ্যে চর বিদ্যানন্দে প্রায় ২ হাজার, চর তৈয়বখাঁয় ১ হাজার, কালুয়ার চরে ১ হাজার ৮শ, চর খিতাবখাঁয় ৭০০ এবং চর গতিয়াশামে প্রায় ১ হাজার গবাদিপশু রয়েছে।
পশ্চিম চর বিদ্যানন্দের বাসিন্দাদের দাবি, সেখানে গত কয়েক মাসে বিভিন্ন রোগে অন্তত ৩০টি গরু মারা গেছে; যার মধ্যে গাভি, বাছুর ও বিদেশি জাতের গরু রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মনসুর আলী জানান, তিন মাস আগে তার প্রায় ৭০ হাজার টাকা মূল্যের একটি গরু মারা যায়। তিনি বলেন, আমাদের এখানে কোনো সরকারি ডাক্তার আসেন না। গরু অসুস্থ হলে কাউনিয়ার ভাইয়ের হাট থেকে গ্রাম্য ডাক্তার আনতে হয়। তারা ৫শ টাকা করে ভিজিট নেয়, কিন্তু সঠিক চিকিৎসার অভাবে শেষপর্যন্ত পশু বাঁচানো যায় না।
তিনি আরও জানান, শুধু গরুই নয়, তার ৯টি হাঁসসহ এলাকায় প্রায় ১শ হাঁস ও বেশ কিছু ছাগল অজ্ঞাত রোগে মারা গেছে।
কড়াই বরিশাল এলাকার খামারি মাছুম মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার ৮৫ হাজার টাকা দামের গরুটার পেট ফুলে গেলে নৌকা না পাওয়ায় সদরের হাসপাতালে নিতে পারিনি। স্থানীয় এক ব্যক্তি চিকিৎসা দিলেও শেষপর্যন্ত গরুটা মরে যায়। চরে যদি সরকারি ডাক্তার থাকত, তবে এই ক্ষতি হতো না।
আরেক খামারি রশীদুল বলেন, গরু-ছাগল লালন-পালন করেই আমাদের সংসার চলে। একটা গরু মারা যাওয়া মানে সংসারের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়া।
এদিকে সঠিক চিকিৎসা ও পরামর্শের অভাবে ঝুঁকি আরও বাড়ছে। পশ্চিম চর বিদ্যানন্দের ছামসুল মিয়া জানান, ছয় মাস আগে তার একটি গরুর শরীরে গুটি দেখা দিলে তিনি কাউকে না জানিয়ে সেটি জবাই করে মাংস বিক্রি করেন। মাংস কাটার সময় হাত কেটে গেলে তিনি মারাত্মক সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন।
চিকিৎসকদের মতে, রোগাক্রান্ত পশু এভাবে জবাই করা এবং বিক্রি করা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রহমত আলী বলেন, লাম্পি স্কিন ডিজিজ বা ভাইরাসের কারণে এমনটা হতে পারে। বর্তমানে বিনামূল্যে পিপিআর টিকাদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আগামী ১৫ তারিখের মধ্যে আমরা টিম নিয়ে সরাসরি দুর্গম চরগুলোতে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। চরে সরেজমিন গিয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে।
চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন সংস্থার সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের সমস্যা সমাধানে দীর্ঘসূত্রতা বন্ধ করতে হবে। চরের সার্বিক উন্নয়ন ও সংকট নিরসনে একটি স্বতন্ত্র চর বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন এখন সময়ের দাবি।
চরবাসীর স্পষ্ট দাবি—উপজেলা সদরে গিয়ে নয়, দুর্গম চরাঞ্চলেই নিয়মিত মোবাইল ভেটেরিনারি ক্যাম্প ও টিকাদান কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। কারণ চরের একজন কৃষকের কাছে একটি গবাদিপশু কেবল প্রাণী নয়, তা পুরো পরিবারের বেঁচে থাকার শেষ সম্বল।
