একটি বিস্ফোরণ, কয়েকটি ভেঙে যাওয়া সংসার
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন, সাভার
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আশুলিয়ার জামগড়ায় প্রীতি গ্রুপের এফ অ্যান্ড এফ কারখানা চত্বরে গ্যাস সিলিন্ডারবাহী কাভার্ডভ্যানে বিস্ফোরণের ঘটনায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ধোঁয়া কেটে গেছে, উদ্ধার অভিযানও শেষ হয়েছে; কিন্তু এটি শুধু একটি বিস্ফোরণ নয়; কয়েকটি ভেঙে যাওয়া সংসারের ধারাবাহিক গল্প।
এ দুর্ঘটনায় যেসব পরিবার স্বজন হারিয়েছে, তাদের জীবনে শোকের যে অধ্যায় শুরু হয়েছে, তা সহজে শেষ হওয়ার নয়।
রোববার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে বিস্ফোরণের পর মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ৫৫ বছরের জয়নব বেগম। কয়েক দিন আগে মেয়ের কাছে বেড়াতে এসেছিলেন তিনি। আশুলিয়ার জামগড়ায় মেয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় বিস্ফোরণের ধাতব অংশের আঘাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। মেয়ের কাছে বেড়াতে এসে আর নিজের বাড়িতে ফেরা হলো না তার।
এ ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন নজরুল ইসলামও। কারখানার সামনের রাস্তায় পেঁয়াজ-রসুন বিক্রি করতেন তিনি। বিস্ফোরণের পর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। স্থানীয় নারী ও শিশু হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
বাবাকে খুঁজতে হাসপাতালে ছুটে এসেছিলেন ছেলে সামিউল ইসলাম। কিন্তু বাবাকে বাঁচানোর আশায় আসা ছেলেকে শেষপর্যন্ত বাবার লাশ নিয়ে ফিরতে হয়েছে।
নজরুলের পরিবার মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার আবুডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা। বর্তমানে তারা আশুলিয়ার শিমুলতলায় থাকেন। সংসারের প্রয়োজনে কারখানার সামনে পণ্য বিক্রি করতেন নজরুল। জীবিকার সেই জায়গাটিই হয়ে উঠেছে তার মৃত্যুর শেষ ঠিকানা।
অন্যদিকে আগুন নিয়ন্ত্রণের পরও কয়েকটি লাশের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে রাতভর স্বজনেরা হাসপাতাল, ঘটনাস্থল ও মর্গের আশপাশে অপেক্ষা করেছেন। কারও হাতে ছিল স্বজনের ছবি, কেউ ফোনে খবরের অপেক্ষায় ছিলেন।
একটি বিস্ফোরণ শুধু কারখানা চত্বরেই আগুন ধরায়নি; তা ছড়িয়ে দিয়েছে বহু পরিবারের জীবনে শোক ও অনিশ্চয়তা। কারও মা আর ফিরবেন না, কারও বাবা আর সন্ধ্যার পর বাড়িতে ফিরবেন না। আবার কোনো পরিবার প্রিয়জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছে।
জামগড়ার এ দুর্ঘটনা রেখে গেছে অন্তত সাতটি মৃত্যুর হিসাব, অসংখ্য আহত মানুষ এবং কয়েকটি পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী শূন্যতা। আগুন নিভে গেলেও স্বজন হারানো পরিবারগুলোর জীবনে সেই আগুনের ক্ষত থেকে যাবে বহুদিন।
আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম আজ দুপুরে যুগান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় সাতজন মারা গেছেন। মোসাম্মাৎ জয়নব (৫৫), বুলবুল হেসেন (৪৫), নজরুল ইসলাম (৪২) নামে তিনজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। সকালে ময়নাতদন্তের পর স্বজনদের কাছে তাদের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকিদের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে। ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হবে।
তিনি বলেন, কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এ ঘটনায় আশুলিয়া থানায় একটি সাধারণ ডাইরি করেছে পুলিশ। তবে কোনোপক্ষ মামলার আবেদন করেনি।
ফায়ার সার্ভিসের সাভার জোনের ইনচার্জ হাফিজুর রহমান যুগান্তরকে জানান, বিস্ফোরণের তীব্রতায় পুরো কারখানা চত্বর ও এর আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে এবং দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এ দুর্ঘটনায় লড়ির ভেতর ও নিচ থেকে পাঁচজনসহ মোট সাতজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া অন্তত ৪০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। তিনি বলেন, যেভাবে সিলিন্ডারগুলো লোকালি লোড করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ অবৈধ।
