চট্টগ্রাম বন্দর: শিপ হ্যান্ডলিং লাইসেন্স স্থগিত ও অনুমোদন নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা
Advertisement
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৫ পিএম
চট্টগ্রাম বন্দর। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রাম বন্দরে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর লাইসেন্স অনুমোদন ও লাইসেন্স স্থগিত রাখা নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়মনীতি না মেনে লাইসেন্স স্থগিত যেমন হচ্ছে; তেমনি আবার একই কায়দায় নতুন অপারেটর লাইসেন্স অনুমোদনও দেওয়া হচ্ছে।
এ কারণে সাধারণ অপারেটরদের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে অসন্তোষ। যার প্রভাব পড়ছে বন্দরের বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়ায় পণ্য খালাস প্রক্রিয়ায়। জাহাজ বরাদ্দ এবং কাজ বণ্টনেও অবৈধ হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। স্থগিত হওয়া চার লাইসেন্সের বিপরীতে কাজ না থাকায় অসংখ্য শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) গত ৭ সেপ্টেম্বর চারটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বা কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করেন। সেগুলো হচ্ছে- সী কোস্ট শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং লিমিটেড, ইউনিয়ন ট্রেডার্স, প্যাসিফিক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড এবং বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল শিপিং করপোরেশন।
বন্দর কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, জাহাজ বণ্টন সংক্রান্ত নির্দেশনা যথাযথভাবে প্রতিপালন না করায় চার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে; কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কী ধরনের নির্দেশনা তারা প্রতিপালন করেনি এজন্য নিয়ম অনুযায়ী তাদের শোকজ করা যেত। জবাব সন্তোষজনক না হলে ব্যবস্থা নেওয়া যেত; কিন্তু এভাবে সরাসরি লাইসেন্স স্থগিত করে দেওয়ার ঘটনাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং কারও স্বার্থ রক্ষার জন্যই সেটি করা হয়েছে।
অন্যদিকে এর আগে মেসার্স ডি ভি হাজী আব্দুল আজীজ অ্যান্ড কোম্পানি নামে একটি ‘বিতর্কিত’ ও ওয়ারিশ সংক্রান্ত জটিলতায় প্রশ্নবিদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় লাইসেন্স বা কাজের অনুমতি প্রদান করা হয়। আওয়ামী লীগ দলীয় বন্দর-পতেঙ্গা আসনের সাবেক এমপি এমএ লতিফ এ লাইসেন্সের একসময় অংশীদার ছিলেন। বর্তমানে এটির মালিকানা রয়েছে শিল্পী আবদুল মান্নান রানার।
অভিযোগ আছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ মেয়াদের শেষ সময়ে কোনো টেন্ডার ও প্রতিযোগিতা ছাড়াই নিয়মবহির্ভূতভাবে ২৩টি লাইসেন্স অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সাবেক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ থেকে শুরু করে ছাত্রলীগ নেতা আরশেদুল আলম বাচ্চুসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে এসব লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। এমনও অনেক নেতা আছেন যারা জীবনে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করেননি। বন্দরে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয় তাও তারা জানেন না। মূলত লাইসেন্সগুলো নিয়ে তা তৃতীয়পক্ষের কাছে বিক্রি করে নিজেদের পকেট ভারি করার উদ্দেশ্যই ছিল প্রধান।
তখনও বিদ্যমান শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা অভিযোগ করেছিলেন, কোনো নীতিমালার তোয়াক্কা না করে বন্দরের আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রিত বোর্ড ২৩টি লাইসেন্স অনুমোদন করে। বিদ্যমান ৩১ অপারেটর যেখানে কাজ পাচ্ছে না সেখানে নতুন ২৩ লাইসেন্স অনুমোদন দিলে পণ্য খালাস খাতে নৈরাজ্য সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এমন অভিযোগ এনে তখন এসব লাইসেন্স প্রদানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং আদালতে মামলা করে দেন ভুক্তভোগীরা। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার এসে এসব লাইসেন্স বাতিল করে দেয়।
সূত্র জানায়, বর্তমানে একই পথে হাঁটতে শুরু করেছে চট্টগ্রাম বন্দরের একটি স্বার্থান্বেষী চক্র। তারা অকারণে কিছু লাইসেন্স স্থগিত, নতুন লাইসেন্স অনুমোদন করছে। এতে করে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটিং খাতে নৈরাজ্য সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, টেন্ডারের মাধ্যমে প্রয়োজন বিবেচনা করে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে নীতিমালা মেনে লাইসেন্স প্রদান করলে সমস্যা নেই। কিন্তু বন্দর ও দেশের স্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে কার্যক্রম হাতে নেওয়া হচ্ছে।
শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সরওয়ার হোসেন সাগর যুগান্তরকে বলেন, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা বন্দরের বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে লাইটার জাহাজ (ছোট জাহাজ) পণ্য খালাসের ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করে আসছে। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে কখনো গণহারে যোগ্য-অযোগ্য সবাইকে লাইসেন্স প্রদান করছে। কখনো কোনো কারণ ছাড়াই কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করছে। আবার কখনো কখনো বিতর্কিত কিংবা স্থগিত হওয়া প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স উজ্জীবিত করছে। সর্বশেষ যে চারটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে সেই চারটি প্রতিষ্ঠানকে আত্মপক্ষ সমর্থনেরও সুযোগ দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, বন্দরের এহেন কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ অপারেটর এবং শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ অবস্থায় যদি তারা কাজ বন্ধ করে দেয় তবে বহির্নোঙরে পণ্য খালাস বন্ধ হয়ে যাবে। এতে সারা দেশে পণ্যের জন্য হাহাকার তৈরি হবে। যার দায় বন্দরকেই নিতে হবে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলেও চট্টগ্রাম বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর লাইসেন্স প্রদান বা স্থগিতের ইস্যুতে এখানে মামলার কিছু বিষয় আছে। তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত না জেনে কিছু বলতে পারছি না। তবে আউটার অ্যাঙ্করেজে (বহির্নোঙরে) বুধবার রাত পর্যন্ত পণ্য খালাসে কোনো ধরনের সমস্যা তৈরি হয়নি।
