পচা সুপারি এখন শিল্পের কাঁচামাল
Advertisement
হাবিবুর রহমান হাবীব, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৪ এএম
রাজারহাটের দিনোবাজারে পচা সুপারি বাছাইয়ের কাজে ব্যস্ত শ্রমিকরা। একসময় ফেলনা হিসেবে পড়ে থাকা এই সুপারি এখন শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস। ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একসময় গাছ থেকে ঝরে পড়া পচা সুপারি কৃষকের কাছে ছিল পুরোপুরি ফেলনা। গাছের নিচে পড়ে থেকে পচে যেত, কেউ কুড়িয়েও নিত না। সেই পচা সুপারিই এখন কুড়িগ্রামের রাজারহাটে হয়ে উঠেছে শিল্পের কাঁচামাল। গাছতলা থেকে সংগ্রহ করে শুকানো, বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতের পর এসব সুপারি চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে।
একে ঘিরে রাজারহাটের দিনোবাজারে গড়ে উঠেছে পচা সুপারির পাইকারি বাজার। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, এখানে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ টন পচা সুপারি কেনাবেচা হচ্ছে। আর সংগ্রহ, শুকানো, বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন শতাধিক শ্রমিক, যাদের বড় একটি অংশ নারী।
গ্রামের বাড়ির আঙিনা কিংবা সুপারি বাগানের নিচে এখন আর পচা সুপারি পড়ে থাকতে দেখা গেলে সেটিকে সবাই ফেলনা মনে করেন না। হকাররা এসব সুপারি কুড়িয়ে বস্তায় ভরেন। রোদে শুকিয়ে নিয়ে আসেন দিনোবাজারে। সেখান থেকে ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে আবার বাছাই ও প্রক্রিয়াজাত করেন।
ফেলনা থেকে কাঁচামাল
দিনোবাজারে নিয়মিত পচা সুপারি কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ১১ ব্যবসায়ী। তাদের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ টন সুপারি সংগ্রহ করা হয়।
মানভেদে প্রতি কেজি পচা সুপারি ৬০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত কেনা হয়। এরপর পরিষ্কার, বাছাই ও শুকানোর কাজ শেষে তা ট্রাক যোগে পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, এসব প্রক্রিয়াজাত সুপারি বাণিজ্যিক রং প্রস্তুতকারী কারখানা ও অন্যান্য শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ফলে যে সুপারি একসময় মাটিতে পড়ে থেকে নষ্ট হতো, সেটিই এখন স্থানীয়ভাবে অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করছে।
পচা সুপারি কুড়িয়েই সংসার
এই ব্যবসার সবচেয়ে বড় সুফল পাচ্ছেন স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষ। দিনোবাজারে সুপারি শুকানো, বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতের কাজে শতাধিক শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের বড় অংশই নারী।
সাগরিকা নামের এক শ্রমিক বলেন, আগে কাজের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হতো। এখন বছরের ছয়টা মাস স্থায়ীভাবে এখানে কাজ পাই। প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করতে পারছি, যা আমার সংসার চালাতে সাহায্য করছে।
ছাটবান্ধা এলাকার নারী শ্রমিক রেণুবালা বলেন, আগে বসে থাকতাম। এখন এই সুপারি বাছাই ও শুকানোর কাজ করে দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরি পাচ্ছি। সংসার খুব সুন্দরভাবে চলছে।
তাদের মতো আরও অনেক নারী-পুরুষের কাছে এই মৌসুমি কাজটি এখন বাড়তি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বছরের প্রায় ছয় মাস কাজ থাকলেও ওই সময়ের আয় তাদের পারিবারিক খরচ মেটাতে সহায়তা করছে।
বেকারত্ব থেকে ব্যবসায়
পচা সুপারি শুধু শ্রমিকদের কাজের সুযোগ তৈরি করেনি, উদ্যোক্তাও তৈরি করেছে।
ব্যবসায়ী সুজা মিয়া জানান, একসময় তিনি বেকার ছিলেন। পরে পচা সুপারি সংগ্রহ ও সরবরাহের ব্যবসায় যুক্ত হন।
তিনি বলেন, বছরের প্রায় ছয় মাস এই ব্যবসা চলে। আগে আমি বেকার ছিলাম। এই ব্যবসা শুরুর পর থেকে এখন বেশ ভালোভাবে দিন কাটছে।
ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি প্রতি মাসে গড়ে ৫০ টন পচা সুপারি বিভিন্ন স্থানে পাঠান। এতে তার মাসে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা নিট লাভ থাকে।
আরেক ব্যবসায়ী লাভলু মিয়া বলেন, এই ব্যবসা শুরুর মাধ্যমে আমি নিজে যেমন উপার্জন করছি, তেমনি এলাকার প্রায় ১০০ জন শ্রমিকের জীবিকার পথ উন্মুক্ত করতে পেরেছি। এটাই আমার বড় তৃপ্তি।
কুড়িগ্রামে সম্ভাবনার বড় ক্ষেত্র
কুড়িগ্রামে সুপারি চাষের বিস্তৃত এলাকা রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় প্রায় ১ হাজার ২৬৫ হেক্টর জমিতে সুপারি বাগান রয়েছে।
ফলে উৎপাদিত সুপারির পাশাপাশি ঝরে পড়া ও নষ্ট হয়ে যাওয়া সুপারি সংগ্রহ করে কাজে লাগানোর সুযোগও রয়েছে। রাজারহাটে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সেই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছেন।
এতে একদিকে কমছে পচে যাওয়া সুপারির অপচয়, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে বিকল্প কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ।
তবে এখনো এই ব্যবসা অনেকটাই ব্যক্তি উদ্যোগনির্ভর। আধুনিক কোনো প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র নেই। অধিকাংশ সুপারি খোলা জায়গায় রোদে শুকিয়ে ও হাতে বাছাই করে প্রস্তুত করা হয়।
ব্যবসায়ীদের দাবি, আধুনিক ড্রায়ার মেশিন, প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেওয়া গেলে এ খাত আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে দেশের বাইরেও বাজার তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি উদ্যোগ নেই
রাজারহাট উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা হৈমন্তী রানী বলেন, যে সুপারি একসময় নর্দমার ফেলনা ছিল, তা এখন কৃষকের বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করেছে। এই প্রক্রিয়াজাত বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে কৃষক, ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক শ্রমিক-সবাই আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
তবে এই সম্ভাবনাময় খাতকে আরও আধুনিক ও সম্প্রসারিত করতে সরকারি কোনো নতুন পরিকল্পনা বা প্রকল্প রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপাতত এ ধরনের কোনো নতুন পরিকল্পনা বা প্রকল্প আমাদের হাতে নেই।
পচা সুপারির গল্প আসলে মানুষের গল্প
রাজারহাটের দিনোবাজারে স্তূপ করে রাখা পচা সুপারি বাইরে থেকে দেখলে হয়তো খুব সাধারণ একটি দৃশ্য। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে একটি বদলে যাওয়া অর্থনীতির গল্প।
কেউ গাছতলা থেকে সুপারি কুড়িয়ে আয় করছেন। কেউ রোদে শুকাচ্ছেন। কেউ বাছাই করে মজুরি পাচ্ছেন। কেউ আবার ব্যবসা করে নিজের পাশাপাশি অন্যদেরও কাজের সুযোগ তৈরি করছেন।
যে পণ্য একসময় মাটিতে পড়ে থেকে পচে যেত, সেটিই এখন মাসে প্রায় ৫০ টন বেচাকেনা হচ্ছে এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান।
রাজারহাটের এই গল্প তাই শুধু পচা সুপারি বিক্রির গল্প নয়। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে-গ্রামের চোখে মূল্যহীন কোনো পণ্যও উদ্যোগ, শ্রম আর বাজারের সংযোগে মানুষের জীবিকার নতুন পথ খুলে দিতে পারে।
