প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ
চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগপত্র পাননি যশোরের ১০৬ জন
Advertisement
যশোর ব্যুরো
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০২৫ সালের প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগপত্র পাননি ১০৬ চাকরি প্রার্থী। সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করায় হতাশ তারা। শনিবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস চত্বরে তারা অবস্থান নেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার দেশের বিভিন্ন জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়। নিয়োগ পরীক্ষায় চুড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন ২৯০ জন। এদেরমধ্যে ১৮৪ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি ১০৬ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে কিনা, সেটি স্পষ্ট করেনি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ।
১০৬জন সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষক শনিবার ছুটির দিনেও সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জড়ো হতে থাকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস চত্বরে। কর্মকর্তাদের কারও সাড়া না পেয়ে চলে যান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়েও। সেখানে জড়ো হয়ে অবস্থান কর্মসূচিতে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন নিয়োগপত্র না পাওয়া এসব চাকরিপ্রত্যাশীরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেন অভিভাবকেরাও। প্রশ্ন তোলেন নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে।
মনিরামপুরের বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান বলেন, ২০২৫ সালে সহকারী প্রাথমিক শিক্ষকের নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেডিকেল সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে অপেক্ষায় ছিলাম নিয়োগপত্র পাওয়ার। পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে সরকারি চাকরিতে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হওয়ায় খুশি ছিলেন মা–বাবা ছাড়াও নিকট আত্মীয় স্বজনেরা। খুশিতে মসজিদের ঘোষণা দিয়ে এলাকায় বিতরণ করেছিলেন মিষ্টি। কিন্তু অন্যরা নিয়োগপত্র পেলেও আমি পাইনি। হতাশায় বাড়িতে ফিরতে পারছি না।
মাহফুজুরের দাবি, ‘সরকারি চাকরি করার স্বপ্ন নিয়ে গ্রাম থেকে যশোরে এসেছিলাম। ৮ বছর ধরে ছাত্রাবাসে পড়াশুনা করছি। অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে বিভিন্ন চাকরি পরীক্ষা দেই। এরমধ্যে ২০২৫ সালে সহকারী প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে চুড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছিলাম। তখন বাড়ির লোকজন খুশি হয়। এলাকায় মিষ্টি বিতরণও করে। স্বপ্নও দেখতে শুরু করি, একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলবো। দীর্ঘ আট মাস ধরে নিয়োগপত্র না দিয়ে আমাদের গত বৃহস্পতিবার চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়। ওই তালিকায় আমার নাম না পেয়ে জেলা অফিসে যোগাযোগ করি, তারা জানায় গোয়েন্দা ভেরিফিকেশন রিপোর্টের ভিত্তিতে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাহফুজ বলছিলেন, ‘আমার চাকরি হওয়াতে মা বাবা অনেক খুশি হয়েছিলেন। এলাকায় সবাই জানে আমার চাকরি হয়েছে। এখন যদি চাকরি না হয়; কোন মুখ নিয়ে বাড়িতে যাবো।’
নিয়োগ বঞ্চিত হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমি অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। এখন ভেরিফিকেশনের কারণে নিয়োগ না পাওয়ায় আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা হতাশ। খবরটি শোনার পর মা কান্না করেছেন, বাবাও স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। আমাকে কেন বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটি স্পষ্টভাবে জানানো হোক।’
মনিরামপুরের পিউলী রায় বলেন, প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ায় দুটি সরকারি চাকরিতে অংশগ্রহণ করিনি। আর কোনো চাকরিতে আবেদনও করা নেই। প্রাথমিকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। এখন আমি কী করব?
বাঘারপাড়ার বাসিন্দা ইন্দ্রজিৎ ভৌমিক বলেন, বাদ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করেনি। কারণ ছাড়াই বাদ দেওয়ায় নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। আসলে কারণ জানতে চাই।
শার্শার বাসিন্দা সোহেল রানা বলেন, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম। প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ায় সেই চাকরি ছেড়ে এসেছি। এখন প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগে বাদ পড়লাম। আমার তো দুই চাকরিই হারালাম। এভাবে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া ঠিক হয়নি।
ছেলের সঙ্গে ডিসি অফিসে আসেন আব্দুল হামিদ। পেশায় কৃষক এই বাবা বলেন, ‘বিনা টাকায় চাকরি হওয়ায় গ্রামের মানুষ খুশি হয়েছিল। কাল রাতে শুনি ছেলেরে নাকি বাদ দেওয়া হয়েছে। এই কথা শুনে বাড়ির লোক সব স্তব্ধ হয়ে গেছে। ছেলে ও তার মা খাওয়া দাওয়া বাদ দিয়েছে। হওয়া চাকরি যোগদান করার আগে বাদ দেওয়া অবিচার। আমি আর আমার ছেলে কোনো দল করি না। দ্রুত আমার ছেলেরে নিয়োগপত্র দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
শনিবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একটি কর্মসূচিতে সরকারি সফরে আসেন যশোর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এ সময় ডিসি অফিস চত্বরে অবস্থান করা সুপারিশপ্রাপ্ত পরীক্ষার্থীরা প্রতিমন্ত্রীর পথ আটকে ধরেন। প্রতিমন্ত্রী পরীক্ষার্থীদের কথা শুনে সভাকক্ষে প্রবেশ করেন। পরে প্রতিমন্ত্রী পরীক্ষার্থীদের বলেন, ‘তাদের বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা দ্রুতই আপনাদের (পরীক্ষার্থীরা) সমস্যা সমাধান কিংবা বাদ দেওয়ার কারণ জানাবেন।’
নিয়োগপত্র পাওয়ার পর আগামী ১ অক্টোবর নিজ নিজ জেলা শিক্ষা কার্যালয়ে যোগদান করার কথা প্রার্থীদের। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর থেকে তাদের পদায়ন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
