তাজমীনের মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ
‘এ দেশে দুধের বাচ্চারাও তো নিরাপদ না’
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৮ পিএম
মৃত্যুর আগে পদুয়ার বাজারে তাজমীনের সিসিটিভি ফুটেজ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘আমার বুক থেকে পাখিটা ওরা কেড়ে নিয়ে গেল। এ দেশে দুধের বাচ্চারাও তো নিরাপদ না! আমি আর কার কাছে বিচার চাইব? আল্লাহ সবকিছু দেখেছেন, তিনিই আমার মেয়ের খুনিদের বিচার করবেন।’
শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লায় নিহত স্কুলছাত্রী জান্নাতুত তাজমীনের দাফন শেষে এভাবেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তার মা কেয়া আক্তার। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া নিষ্পাপ মেয়ের লাশ কবরে রেখে আসা এক মায়ের এই বুকফাটা হাহাকার ও আক্ষেপ উপস্থিত কাউকেই স্থির থাকতে দেয়নি। কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।
পরিবারের অভিযোগ, এক বান্ধবীর অসৎ সঙ্গ এবং একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের নির্মম লালসার শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে ফরিদা বিদ্যায়তনের শিক্ষার্থী তাজমীনকে।
মেয়ের মর্মান্তিক পরিণতির পেছনের ঘটনা তুলে ধরে মা কেয়া আক্তার সাংবাদিকদের বলেন, আমার মেয়ের বান্ধবীটা অত্যন্ত খারাপ ছিল। সে ফুঁসলিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেত আমার মেয়েকে। বিষয়টি টের পেয়ে আমি অনেক বাধা দিয়েছি। মেয়েকে বাঁচাতে ছয় মাস স্কুলে পর্যন্ত যেতে দিইনি, ঘরে আটকে রেখেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই বান্ধবীই তাকে ভুলিয়ে কক্সবাজারে নিয়ে গেল।
কক্সবাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথেই যে তাজমীনের জীবনের শেষ যাত্রা লেখা ছিল, তা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন- ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাকে ফোনে বলেছিলাম—তুই কোথায় আছিস বল, আমি নিজে গিয়ে তোকে নিয়ে আসব। মেয়ে আমার কুমিল্লা পর্যন্ত ফিরে এলো, কিন্তু আর ঘরে ফিরতে পারল না। হায়েনার দল পথ থেকেই তাকে তুলে নিয়ে গেল। তারপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে আমার কলিজার ধনটাকে মেরে ফেলল। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব?
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বুধবার রাতে কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ বাসে করে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে নামে তাজমীন। রাত পৌনে ১২টার দিকে সেখানকার হোটেল নুরজাহানে প্রবেশ এবং সোয়া ১২টার দিকে বেরিয়ে পশ্চিম পাশের সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ডের দিকে যাওয়ার দৃশ্য সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। এরপরই সে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়।
পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি নির্জন ধানখেত থেকে তার নিথর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলের পাশেই একটি সিএনজি অটোরিকশাও পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড ও এর আশপাশের এলাকায় রাতে কিছু সিএনজিচালকের সঙ্গে স্থানীয় অপরাধী ও ছিনতাইকারী চক্রের যোগসাজশ থাকে। গভীর রাতে সাধারণ যাত্রীদের ফাঁদে ফেলে সর্বস্ব লুটে নেওয়া কিংবা নির্জন স্থানে নিয়ে অপরাধ সংঘটিত করা যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাজমীনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কোনো নারকীয় ঘটনা ঘটেছে কিনা, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে ইতোমধ্যে সুমন নামে এক সিএনজিচালককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস জানান, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রযুক্তিগত প্রমাণের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এ ঘটনার পেছনে অন্য কোনো চক্র জড়িত আছে কিনা এবং ওই রাতে ঠিক কী ঘটেছিল, তা উদঘাটনে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
তবে পুলিশি তৎপরতা কিংবা গ্রেফতারের খবরে কোনো সান্ত্বনা নেই মা কেয়া আক্তারের। বুক চাপড়ে তিনি একটাই প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন—কৈশোরের গণ্ডি না পেরোনো একটি শিশুও কি এ সমাজে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে না?
