পারমিট ৬৪, বাস শত শত, দুই প্রাণহানিতে সেলফি বন্ধ
Advertisement
মতিউর রহমান, মানিকগঞ্জ
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম
সেলফি পরিবহণ। ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সেলফি পরিবহণের রুট পারমিট আছে ৬৪টি বাসের, অথচ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) এক দিনের জরিপেই মিলেছে ১৭০টি। পরিবহণ সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে পাটুরিয়া থেকে গাবতলী-টেকনিক্যাল পর্যন্ত সেলফি পরিবহণের ব্যানারে চলছে তিন শতাধিক বাস।
অনুমোদিত বাসের সঙ্গে বাস্তবে চলাচলকারী বাসের এই বিশাল ব্যবধানের মধ্যেই একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির অভিযোগ উঠেছে পরিবহণটির বিরুদ্ধে।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকালে মানিকগঞ্জের বরংগাইল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সেলফির বাসের চাপায় অটোরিকশাচালক ও এক আরোহী নিহত হওয়ার পর ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা। বাস ভাঙচুর ও মহাসড়ক অবরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সেলফি পরিবহণের সব বাস চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
রুট পারমিটের তুলনায় এত বেশি বাস কিভাবে একই পরিবহণের ব্যানারে চলছে, অতিরিক্ত বাসগুলোর অনুমোদন আছে কিনা, আর থাকলে কোন কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে চলছে, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। একই সঙ্গে পরিবহণটির বিরুদ্ধে বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং চালকদের লাইসেন্স ও মাদক সেবন নিয়ে ওঠা অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিআরটিএ মানিকগঞ্জের সহকারী পরিচালক মাহবুব কামাল যুগান্তরকে জানান, ঢাকা বিভাগীয় ও ঢাকা জেলা বিআরটিএ কার্যালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে করা সরেজমিন জরিপে সেলফি পরিবহণ প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যানারে ১৭০টি বাস চলাচলের তথ্য পাওয়া গেছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটির রুট পারমিট রয়েছে মাত্র ৬৪টি বাসের। অর্থাৎ অনুমোদিত সংখ্যার চেয়ে ১০৬টি বেশি বাস চলাচল করছে।
তবে পরিবহণ-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি। তাদের হিসাবে, পাটুরিয়া থেকে গাবতলী-টেকনিক্যাল রুটে সেলফি পরিবহণের ব্যানারে তিন শতাধিক বাস চলাচল করছে। এই দাবি সত্য হলে বিআরটি-এর এক দিনের জরিপে পাওয়া সংখ্যার চেয়েও বাস্তব চিত্র অনেক বড়।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বরংগাইল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সেলফি পরিবহণের একটি বাসের চাপায় অটোরিকশা দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে অটোরিকশাচালক ও এক আরোহী নিহত হন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা বাসটি ভাঙচুর করেন এবং মহাসড়ক অবরোধ করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। একপর্যায়ে সব ধরনের বাস চলাচলও বন্ধ হয়ে পড়ে।
ঘটনার পর স্থানীয়দের ক্ষোভ ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সেলফি পরিবহণের বাস চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের যৌক্তিক দাবির মুখে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এর আগে পরিবহণটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে একাধিকবার কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গত ১৪ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার দিকে শিবালয় উপজেলার বরংগাইল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ‘নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে ঘেরাও, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, সেলফি পরিবহণের বাসগুলো অতিরিক্ত গতিতে ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলাচল করে। যাত্রী ওঠানো ও নামানো এবং আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় চালকেরা বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিং করেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। কয়েকজন চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি চালকদের কেউ কেউ মাদক সেবন করে গাড়ি চালান বলেও অভিযোগ করেন তারা। এসব অভিযোগ তদন্ত করে পরিবহণটির রুট পারমিট বাতিলের দাবি জানান আন্দোলনকারীরা। এর আগে ২৯ আগস্ট ঘিওর উপজেলার পুখুরিয়া এলাকায় একই দাবিতে মানববন্ধন করেন তারা। ৩১ আগস্ট জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনাকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি দুর্ঘটনার সঙ্গে মানুষের জীবন, পরিবারের স্বপ্ন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি জড়িয়ে থাকে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সেলফি পরিবহণের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও জনমনে তৈরি হওয়া নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা জানান, সেলফি পরিবহণ নিয়ে সম্প্রতি অংশীজনদের সঙ্গে সভা করেছেন তিনি। দ্রুত আবারও সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে সভা করা হবে। সেখানে যাত্রী নিরাপত্তা, সেবার মান এবং পরিবহণটির বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম-অসংগতির বিষয়গুলো চিহ্নিত করে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

