‘বিয়ের মেলায়’ এখন আর খোঁজা হয় না জীবনসঙ্গী
Advertisement
দিনাজপুর ও বীরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৬ পিএম
দিনাজপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের দুইশ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী মিলনমেলা
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কালের বিবর্তনে বদলেছে রীতিনীতি, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাল্টেছে আচার ও সংস্কৃতি। তবুও দিনাজপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের দুইশ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী মিলনমেলা।
এই মেলাকে ‘বিয়ের মেলা’ বা ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা’ বলা হলেও কালের বিবর্তনে এই মেলাটি এখন পরিণত হয়েছে সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উৎসব হিসেবে। এখন আর এই মেলায় খোঁজা হয় না জীবনসঙ্গী, হয় না বিয়ের অনুষ্ঠানও।
প্রতিবছর শারদীয় দুর্গোৎসবে বিজয়া দশমীর পরদিন এই মেলা বসলেও এবার এক দিন পিছিয়ে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) আয়োজন করা হয় দিনব্যাপী এই মিলনমেলার।
দুর্গাপূজায় দশমীর পরের দিন মেলায় একত্র হতেন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ। পরস্পরের খোঁজ নেওয়া, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগির পাশাপাশি সেখানে বিবাহযোগ্য ছেলেমেয়েদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হতো। নিজেদের মধ্যে ঠিকঠাক বোঝাপড়া হলে এগিয়ে আসতেন অভিভাবকরা। সিঁদুর পরিয়ে ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেওয়া হতো। পরে সামর্থ্য অনুযায়ী হতো বিয়ের আয়োজন। সেই থেকেই মেলাটি পরিচিতি লাভ করে ‘বিয়ের মেলা’ বা ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা’ হিসেবে। কিন্তু কালের বিবর্তনে বদলেছে সেই সংস্কৃতি।
দীর্ঘ দুইশ বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী এই মেলার আয়োজন করা হয় দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে। আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতি আয়োজিত এ মেলায় দিনাজপুর ও আশপাশের জেলা পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, জয়পুরহাট, নওগাঁ থেকে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ উপস্থিত হন।
প্রতিবছরের মতো এবারও শুক্রবার দিনব্যাপী এ মেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ ছাড়াও নানা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের উপচেপড়া ভিড় ছিল।
কয়েক বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে মেলাটিকে ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা’ কিংবা ‘বিয়ের মেলা’ হিসেবে উপস্থাপন করায় মানুষের উপস্থিতি বেড়েছে কয়েকগুণ। তবে আয়োজকরা বলছেন, মেলাটির নাম বিকৃত করা হয়েছে।
মেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক জয় মার্ডি বলেন, ‘আমরা সংখ্যায় কম। তার ওপর দূরদূরান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছি। নিজ গোত্রের মধ্যে ছেলেমেয়েদের বিয়েও দেওয়া হয় না। ফলে বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে আমরা পরিবারের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করতে এখানে আসতাম। সেখানে কারও বিবাহযোগ্য ছেলেমেয়ের মধ্যে বোঝাপড়া হলে সিঁদুর পরিয়ে বিয়ে দেওয়া হতো। এখন সেই বিয়ের রীতি আর নেই, এখানে আর কারও বিয়েও দেওয়া হয় না। তবু বংশপরম্পরায় ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে এ আয়োজন চলমান রেখেছি।’
তিনি বলেন, ‘এখনো অনেকেই এই মেলাকে ‘জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা’ কিংবা ‘বিয়ের মেলা’ হিসেবে প্রচার করেন, এ জন্য আমরা সাইনবোর্ডে ‘আদিবাসী মিলনমেলা’ নাম রেখেছি।’
ঠাকুরগাঁও থেকে স্বামী-সন্তান নিয়ে মেলায় এসেছেন উর্মা কিসকু (৩০)। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই মেলা বসে। মূলত এই মেলায় এসেছি দূরদূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে, সুখ-দুঃখের গল্প করতে।’
জয়পুরহাট থেকে আসা আর্জিয়ান মুর্মু বলেন, ‘এখানে এলে বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয়। ভালোই লাগে; কিন্তু গত বছর থেকে শুনছি, এই মেলা নাকি জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা। ঘটনাটা আসলে এমন না। এবার এসে দেখি লোক আর লোক। আমাদের সম্প্রদায়ের চেয়ে বাঙালির সংখ্যাই বেশি। এরপরও ভালো লাগছে অনেকে এসেছেন, আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারছেন।’
আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জোসেফ হেমব্রম বলেন, ‘মেলাটির ইতিহাস প্রায় দুইশ বছরের। প্রতিবছর মেলায় দূরদূরান্ত থেকে আদিবাসীরা আসেন। প্রায় ৩০ হাজারের বেশি মানুষের সমাগম হয়।’
