সাংবাদিক আলিফ হত্যা
দুই আসামির জবানবন্দিতে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
Advertisement
নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:২০ এএম
লুৎফুজ্জামান আলিফ। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ হত্যা মামলায় গ্রেফতার দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী তাজুল ইসলাম। এতে সরাসরি অংশ নেন পাঁচজন। তাদের মধ্যে তাজুল নিজেই পিস্তল দিয়ে আলিফকে গুলি করেন।
রোববার (১ নভেম্বর) বিকালে দুর্গাপুর চৌকি আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আমিন ভূঁইয়ার কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন ইমরান ইসলাম ওরফে ইমন (২৪) ও সাব্বির আহম্মেদ (২৫)। বিকাল পৌনে ৪টায় শুরু হওয়া জবানবন্দি গ্রহণ শেষ হয় সন্ধ্যা ৭টায়। পরে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ রোববার রাতে বলেন, জবানবন্দিতে দুই আসামি জানিয়েছেন, তাজুল ইসলামের সঙ্গে সাংবাদিক আলিফের আগে থেকেই বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরেই তাকে হত্যা করা হয়। আসামিরা তাজুলের সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন কাজ করতেন। সীমান্ত এলাকায় তাদের বিভিন্ন ব্যবসা ছিল। এসব ব্যবসায় আলিফ বাধা দিতেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দিতেন। এ কারণে আলিফের ওপর তাদেরও ক্ষোভ ছিল।
ওসি আরও বলেন, দুই আসামির ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি পাঁচজন অংশ নেন। তাজুল পিস্তল দিয়ে আলিফকে গুলি করেন। তার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর লোকজন ঘটনাস্থলে আসতে শুরু করলে তারা সেখান থেকে পালিয়ে যান।
জবানবন্দিতে তাজুল ছাড়াও আরও কয়েকজনের নাম এসেছে বলে জানান ওসি। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে গ্রেফতারের স্বার্থেই আপাতত তাদের নাম গোপন রাখা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, তাজুলের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, অস্ত্র, মাদক, বিস্ফোরক, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ডাকাতি ও চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধে অন্তত ১৩টি মামলা রয়েছে। সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালানের সঙ্গেও তার বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এলাকায় নিজ নামে একটি সন্ত্রাসী বাহিনীও পরিচালনা করেন তিনি।
সাংবাদিক আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা (খাদিজা আক্তার) এর আগে জানিয়েছিলেন, তাজুলের চোরাচালান ও অস্ত্রের বিষয়ে তথ্য পেয়ে তা র্যাবকে দিয়েছিলেন আলিফ। প্রায় চার বছর আগে তাজুলকে গ্রেফতার করেছিল র্যাব (বর্তমানে এসআরবি)।
দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ গত অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে জানিয়েছিলেন, তাজুলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন আলিফ। তাজুলের বাড়িঘরের ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তাজুলের ধারণা ছিল, তার কাছে থাকা অস্ত্রের তথ্যও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়েছেন আলিফ। এ নিয়ে ক্ষোভ থেকেই এর আগেও আলিফের ওপর হামলা হয়েছিল।
গত ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উত্রাইল বাজারসংলগ্ন তেলনজিয়া এলাকায় গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ। তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। ওই পেজে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধ ও অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন তিনি।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন আলিফের স্ত্রী বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় সাত থেকে আটজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
গত শনিবার ভোরে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর বাজার এলাকা থেকে ইমরান ও সাব্বিরকে গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল। তাদের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে এ মামলায় গ্রেফতারের সংখ্যা দাঁড়াল চারজনে। এর আগে ১৮ অক্টোবর সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব এবং ২০ অক্টোবর আশিকুর রহমান ওরফে প্রাঙ্গণকে গ্রেফতার করা হয়।
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলাম বলেন, মামলার তদন্ত অনেক দূর এগিয়েছে। হত্যাকাণ্ডে আর কারা জড়িত, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। আশা করছি, দ্রুত তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে পারব। এরপর সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানানো হবে।
ঢাকায় চাকরিতে যোগ দিয়েছেন আলিফের স্ত্রী
এদিকে নিহত সাংবাদিক আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা (খাদিজা আক্তার) রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল তার চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি কাজে যোগ দেন। দুই সন্তান ও মাকে নিয়ে ঢাকায় থাকছেন আনন্দিতা।
গারো সম্প্রদায়ের এই নারী আলিফের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে বিয়ে করেন। বিয়ের সময় তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। পরে তার নাম রাখা হয় খাদিজা আক্তার।
আনন্দিতা সাংমা বলেন, গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর একজন নারী আমাকে ফোন করে সহযোগিতার কথা বলেছেন। আমার ব্যাংক হিসাবের নম্বর চেয়েছেন। এরপর আরও অনেকে ফোন করে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। চাকরির ব্যবস্থা হওয়ায় আপাতত অন্য কারও আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন নেই।
তিনি আরও বলেন, আমি চাই, তাজুল ইসলাম, শুটার শামীমসহ এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেক আসামিকে দ্রুত গ্রেফতার করা হোক। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। স্বামীকে আর কখনো ফিরে পাব না; কিন্তু যারা তাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করেছে, আমার দুই সন্তানকে এতিম করেছে, আমাকে স্বামীহারা করেছে, তাদের শাস্তি দেখে যেতে চাই। আমি তাদের ফাঁসি চাই।
